২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিপাশার স্মৃতিতে অবগাহন

  • খুরশীদ আলম পাটওয়ারী

জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছিলেন, “কিছু একটা বুঝাইবার জন্য কেহ তো কবিতা লেখে না। হৃদয়ের অনুভূতি কবিতার ভিতর দিয়া আকার ধারণ করিতে চেষ্টা করে। এজন্য কবিতা শুনিয়া কেহ যখন বলে ‘বুঝিলাম না’, তখন বিষম মুশকিলে পড়িতে হয়। কেহ যদি ফুলের গন্ধ শুকিয়ে বলে ‘কিছু বুঝিলাম না’ তাহাকে এই কথা বলিতে হয় ‘ইহাতে বুঝিবার কিছু নাই, এ যে কেবল গন্ধ।” কবিতার মতোই চিত্রকলার ক্ষেত্রেও উল্লিখিত অনুভব মিলে যায়। ছবির ক্ষেত্রেও বোধগম্যতা তথা বুঝতে পারার বিষয়টা ততটা মুখ্য নয় যতটা হলো ছবি দেখে আনন্দের বিচ্ছুরণ অনুভব করা।

গুলশানের বেঙ্গল আর্ট লাউঞ্জে সম্প্রতি শুরু হয়েছে বিপাশা হায়াতের চতুর্থ একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘স্মৃতির রাজ্যে’। শ্রাবণের মেঘমেদুর এক বিকেলে প্রদর্শনী কক্ষ ঘুরে দেখা গেল ছবির রাজ্যে পরিভ্রমণরত একদল পিপাসু। এর মাঝেই তরুণ কয়েকজন দর্শক বিপাশাকে ঘিরে এক একটা ছবির ব্যাখ্যা জানতে চাইছিলেন। শিল্পীও স্বভাবসুলভ আগ্রহ আর আন্তরিকতায় বলছিলেন ছবির বিষয়বস্তু, প্রেক্ষাপট আর করণকৌশল। তখনি মনে হলো ছবির মূলত বিমূর্ত ছবির ক্ষেত্রে শিল্পীর সঙ্গে ক্যানভাসের থাকে নাড়ির সম্পর্ক। শিল্পী করণকৌশল নিয়ে যতটা উদগ্রীব তার চেয়ে বেশি সচেষ্ট থাকেন দর্শক তথা কলা রসিকের চিত্তে কিভাবে আলোড়ন তোলা যায় সে চেষ্টায়। এক্ষেত্রে পূর্বাহ্নেই শিল্পী নিজে তাঁর শিল্পকর্মে আকণ্ঠ পান করেন সংবেদনশীল সুধা।

আলোচ্য প্রদর্শনীতে ৩৬টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে যার মধ্যে ২৮টি পেইন্টিং, আর রয়েছে ড্রয়িং ৮টি। স্মৃতির রাজ্যে অবগাহনে মত্ত শিল্পী তাঁর যাপিত জীবনে অর্জিত অসংখ্য স্মৃতি সঞ্জীবনীতে পরিণত করে ক্যানভাসে উদ্গীরণ করেছেন নানা বর্ণিলতায়। টুকরো টুকরো স্মৃতি অনেকগুলো প্রকষ্ঠে স্থাপিত হয়ে নানা রং, ফর্ম আর লাইনে রূপান্তরিত হয়ে সৃষ্টি করেছে একটি পৃথক চিত্রকর্মের। আবার স্মৃতি কণিকাগুলো একত্রে একটি সামগ্রিক রূপ পরিগ্রহ করে কোন একটি বিষয়ে আশ্রিত হয়েছে। পিতার কার্যব্যপদেশে দেশে বিদেশে অবস্থানের কারণে প্রাচীন অনেক ঐতিহ্য, স্থাপত্যরীতি আর অভিক্ততায় সিক্ত শিল্পী বিপাশা তাঁর সাম্প্রতিক বেশকিছু ছবিতে অর্জিত স্মৃতির প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।

প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত ব্রোশিওরে চিত্র সমালোচক মইনুদ্দীন খালেদ উল্লেখ করেছেনÑ ‘চোখচেনা উপরিতলের বাস্তবতা বিপাশাকে আকর্ষণ করেনি। এবার বিপাশা হায়াত পুরু বর্ণপ্রস্থে মোটা ও সরু রেখার আঁচড়ে বিমূর্ত শিল্পভাষার অনুসরণে মনোলোকের মানচিত্র প্রণীত করতে চেয়েছেন। তাঁর চিত্রতলে জ্যামিতি স্পষ্ট; কন্ট্যুর বা প্রান্তরেখা ধরে রঙের ক্বাথ উজিয়ে প্রকাশমান। চৌখুপির মতো গড়নের মধ্যে প্রাচীন দালানের দেয়ালের মতো ক্ষতবিক্ষত অভিব্যক্তি আছে। কখনো বা সেসব জ্যামিতির মধ্যপরিসরে আছে বর্ণের ললিত বিহার। একদিকে ইমপ্রেশনিস্ট বর্ণজোটের উজ্জ্বল উষ্ণতা, আবার অন্যদিকে ক্ষয়াটে দেয়ালের ছেঁড়াখোঁড়া রূঢ়-রূপ। এভাবে কড়ি-কোমলের সমীকরণে সৌন্দর্যভাবনা ও জীবন-ভাবনাকে বিপাশা পরস্পরিত করে রেখেছেন। আমরা যখন তাঁর ছবির দিকে তাকাই তখন মনে হয় কোন পুরাতাত্ত্বিক দালানের বিশাল বিশাল দেয়াল নতুন তুলির ছোঁয়ায় তার পূর্বরূপ ফিরে পেয়েছে।’

বর্ণ প্রক্ষেপণে শিল্পী বিপাশা খুব চিক্কন লেপনের চেয়ে বরং মোটা ব্রাশের আঁচড় ব্যবহার করেছেন বেশি। খ- খ- স্মৃতির প্রলেপের মাঝে বর্তমানে ফিরে এসেছেন শিল্পী মাঝামাঝি বা আড়াআড়ি নানারকম মোটা রেখার বিভাজনে। শিল্পীর মনসিজ বর্তমানটি যেন সাদা আর বর্ণিল রঙয়ের বিভাজনে প্রতীকায়িত হয়েছে। ছবিতে মূর্ত হয়েছে আনন্দের স্মৃতিকণা, নানা সময়ের গল্প, বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণের চিত্র, স্বপ্ন, ভুলে যাওয়া কোন স্মৃতিতাড়না, অবলুপ্ত কোন স্মৃতি, স্মৃতির সঙ্গে নিয়ত খেলা করা ইত্যাদি। আবার প্রকৃতির সঙ্গে শিল্পীর সখ্য ও অনবদ্যভাবে উঠে এসেছে অনেকগুলো চিত্রকর্মে। বাগানে গ্ল্যাডিওলাস, নক্ষত্রবাড়ির প্রকৃতি, প্রকৃতির সঙ্গে শিল্পীর আলাপচারিতা সমুদ্রতলের পরিবেশ, প্রতিবেশ নিয়ে শিল্পীর সৃজনশীল ক্রীড়া ইত্যাদি সুষমাম-িত হয়েছে শিল্পীর ক্যানভাসে।

শিল্পীর এ্যাক্রিলিক মাধ্যমে সৃজিত একাধিক চিত্রকর্মে ছোপ ছোপ ফর্মে স্মৃতি খ-গুলো যেন জ্বলছে। কালো, বাদামি, নীলাভ নানা জ্যামিতিক ফর্মের আশ্রয়ে যেন বা স্মৃতির কাহিনীগুলো লিখিত হয়েছে। এই ছবিগুলো নান্দনিক সৌন্দর্যম-িত এবং রঙের ব্যবহারের কুশলতায় আর জমিনের বুনটের কারণে সাধারণ দর্শককে স্মৃতিতাড়িত জ্বরে আক্রান্ত না করে ছাড়ে না। এখানেই শিল্পীর সার্থকতা, যা নিজের অনুভূতির অনুরণন উপ্ত করে দর্শকের হৃদয়ে। ‘আমার গল্প’ শীর্ষক ছবিগুলো বর্ণিল রঙের মূলত কালো, সবুজাভ, বাদামি, লালের ব্যবহারে এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। এখানেও নানাকৃতির অসম সব ফর্ম ব্যবহৃত হয়েছে।

‘গবসড়ৎু ড়ভ গবফরঃবৎৎধহবধহ ঝশু’ শীর্ষক ছবিটির চিত্রকল্পে দেখা যায়Ñ আকাশের প্রতীক নীল রঙয়ে সৃষ্ট অনেকগুলো ফর্ম। এখানেও স্মৃতির কবিতা যেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো ক্যানভাসজুড়ে। স্পেসের ব্যবহার এখানে অনবদ্য। অনেক ফর্ম জড়াজড়ি করে থাকলেও একধরনের শৃঙ্খলা লক্ষ করার মতো।

শিল্পী বিপাশা হায়াতের এটি চতুর্থ একক হলেও অনেকগুলো যৌথ প্রদর্শনীতে রয়েছে তাঁর অংশগ্রহণ। লেখা-লেখিতেও পিছিয়ে নেই স্বনামধন্য এই অভিনয় শিল্পী এবং কারুশিল্পী।