২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বরূপ অন্বেষায় অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়

  • জাফর ওয়াজেদ

যেখানেই রেখেছেন কর্মের হাত, সেখানেই তুলে এনেছেন সফলতার নিদর্শন। একজীবনে অনেক ব্যপ্তিকে মেলে ধরেছেন শ্রমে ও নিষ্ঠায়, মেধায় ও মননে। গুরুভার নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছেন। সৃষ্টিশীলতা আর সৃজনশীলতায় নিরত নিরলস সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন আজীবন। জীবন ছিল বহতা নদীর মতোই। কোথাও থেমে থাকেননি। জাতিসত্তার বিকাশে অবদান রেখেছেন প্রাগ্রসরতায়। বাঙালীর ইতিহাস পুনর্গঠনের আয়োজনে- আন্দোলনে-প্রচেষ্টায় ছিলেন তিনি পথিকৃৎ। আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের অগ্রদূত হিসেবে সাধ্যাতীত দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগঠক হিসেবেও সাফল্য ছিল। শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য সর্বক্ষেত্রেই রেখেছেন অনন্য স্বাক্ষর। ইতিহাস বিকৃতির বিপরীতে সত্যসন্ধ অনুসন্ধান, পর্যবেক্ষণ ও বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। পশ্চাৎপদ বাঙালী জাতির ভেতর জ্ঞান ও শিক্ষার আলো জ্বেলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেনও ‘...বাঙ্গালার ইতিহাসে তিনি যে স্বাধীনতার যুগ প্রবর্তন করিয়াছেন সে জন্য তিনি বঙ্গসাহিত্যে ধন্য হইয়া থাকিবেন।’ ধন্য অবশ্যই তিনি হয়েছিলেন। কারণ বাঙালীর ইতিহাস বিদেশীদের হাতে যেভাবে বা অবমাননাকরভাবে বিধৃত হয়ে আসছিল, সেখানে তিনি বিজ্ঞানসম্মত প্রণালীতে ইতিহাস চর্চার দিগন্ত তুলে ধরেছিলেন।

কবি নজরুল তাঁর অন্তিম সময়ে সাক্ষাৎ করে বলেছিলেন, ‘যিনি অভিশপ্ত ও কলঙ্কিত ইতিহাসকে পুনর্জীবিত করতে পারেন তিনি মরতে পারেন না।’ মানুষ হিসেবে ছিলেন যিনি অত্যন্ত নিরহংকার, সৎ এবং সরল, সেই তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমকালে খ্যাতিমান সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। অভিযোগ এনেছিলেন ইতিহাস বিকৃতির। সমকালে বঙ্কিমচন্দ্রের লেখার বিরুদ্ধে কলম শাণিত করে দুঃসাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন বৈকি। মূল দলিল দস্তাবেজের সহায়তায় প্রকৃত ইতিহাস উদ্ধারে ছিলেন নিবেদিত। প্রচলিত অনেক ধারণা ভ্রান্ত বলে তিনি প্রমাণ করেছিলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর পক্ষে কলম ধরেছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের বক্তব্যের জবাবও দিয়েছিলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে মাস দুয়েকের বড় অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় জন্মেছিলেন ১৮৬১ সালের ১ মার্চ। নদীয়া জেলার নওয়াপাড়া থানার শিমলা গ্রামে পিতামহের বাড়িতে জন্ম হলেও শৈশব থেকেই মাতামহের বাড়ি রাজশাহীতেই জীবন শুরু। সংস্কৃত ও ফারসী ভাষার প-িত পিতা মথুরানাথ মৈত্র বিএল পরীক্ষা দেয়ার জন্য ১৮৬২ সালে রাজশাহীতে আসেন। কিন্তু সে বছর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় তিনি সরকারী চাকরিতে ঢুকে পড়েন এবং রাজশাহীতে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ১৮৭১ সালে অক্ষয় কুমার ইংরেজী শিক্ষালাভের জন্য ব্রিটিশ পরিচালিত রাজশাহীর বোয়ালিয়া স্কুলে পাঠ শুরু করেন। একই সঙ্গে গৃহে সংস্কৃত প-িতদের কাছে সংস্কৃতচর্চা করেন। ১৮৭৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তিসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন, যা ছিল রাজশাহী বিভাগে প্রথম স্থান। ১৮৮০ সালে অনুষ্ঠিত এফএ পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং সেবারও রাজশাহী বিভাগে বৃত্তিসহ প্রথম স্থান লাভ করেন। এরপর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এসময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে মেধাবী ছাত্রটি তৃতীয় বিভাগে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এমএতে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন শুরু করেও দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। কলকাতা থেকে রাজশাহী ফিরে বিএল পরীক্ষা দেন এবং ১৮৮৫ সালে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। রাজশাহীতেই আইন পেশায় যোগ দেন। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের যখন ছাত্র অক্ষয় কুমার, তখন থেকেই তার লেখালেখির চর্চা শুরু। রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘হিন্দু রঞ্জিকা’ এবং কুমারখালী থেকে প্রকাশিত কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ‘গ্রামবার্তা’য় বিভিন্ন বিষয়ে লেখা ছাপা হতে থাকে। প্রতিশ্রুতির ছাপ তখনই তার লেখায় ফুটে ওঠে। কলেজ অধ্যক্ষ এফটি ডাওডিংয়ের সঙ্গে বাংলার ইতিহাস পর্যালোচনা নিয়ে বিতর্ক হতো। এই বিতর্কের সূত্রপাত ধরেই ইতিহাস চর্চায় মনোনিবেশ করেন। কলেজ শিক্ষক এবং সহপাঠীরা তাকে উদ্বুদ্ধ করাসহ অনুপ্রেরণা যোগাতেন।

রানী ভবানীর ওপর গবেষণা চালিয়ে জীবন চরিত প্রথম খ- লিখে ফেলেন। এর পরপরই তিনি নবাব সিরাজদ্দৌলাহর ওপর ঐতিহাসিক চিত্র রচনা করেন। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পাদিত ‘সাধনা’ সাময়িকীতে ধারাবাহিক ছাপা হতে থাকে। কিন্তু ‘সাধনা’ বিলুপ্ত হলে পরবর্তী সময়ে বাকি অংশ ‘ভারতী’ পত্রিকায় ছাপা হয়। একই সময় রাজা সীতারাম রায়ের ওপর ঐতিহাসিক চিত্র ‘সাহিত্য’ পত্রিকা ছাপা হয়। এর রানী ভবানির জীবন চরিতের প্রথম খ- ‘সাহিত্য’ এবং মীর কাসিম ‘ভারতী’ পত্রিকায় ছাপা হয়। মীর কাসিমের কিছু অংশ ‘মীরজাফর’ শিরোনামে ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় প্রকাশ হয়। লর্ড কার্জন যখন গৌড় পরিদর্শনে আসেন তখন তিনি হিন্দু শাসনামলে গৌড়ের ইতিহাস জানার আগ্রহ প্রকাশ করেন। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তৎকালীন মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য অধিকারীর বিশেষ অনুরোধে ইতিহাস লেখেন। লর্ড কার্জনের জন্য তিনি লেখেনÑ ‘গৌড় আন্ডার দ্য হিন্দুস’ (রাজশাহী, ফেব্রুয়ারি ১৯০২) গ্রন্থটি। ১৯০৩ সালে এশিয়াটিকে সোসাইটি জার্নালে তার গবেষণাকর্ম ‘সিলভার ইনসক্রিপশন অব লক্ষণ সেন’ শীর্ষক ইংরেজী রচনা প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে তিনি এই জার্নালের সম্পাদনা পরিষদের সদস্যও হন।

অক্ষয় কুমার মৈত্রয়ের আলোচিত গবেষণামূলক ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘সিরাজদ্দৌলাহ’ প্রকাশিত হয় ১৮৯৮ সালের জানুুয়ারিতে। প্রকাশের পরপরই গ্রন্থটি আলোড়ন তৈরি করে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৮ সালের মে মাসে গ্রন্থের আলোচনা করেন। গ্রন্থের বিরুদ্ধে এ্যাংলো ইন্ডিয়ান একজন লেখক তীব্র বিষোদ্গার করেন। রবীন্দ্রনাথ একই বছরের জুলাই মাসে এর বিরুদ্ধে কলম তুলে ধরেন। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৮ সালের মে মাসে ভারতী পত্রিকায় লিখেন ‘...সিরাজদ্দৌলা’ গ্রন্থে ঐতিহাসিক রহস্যের যেখানে যবনিকা উত্তোলন করিয়াছেন সেখানে মোগল সাম্রাজ্যের পতনোন্মুখ প্রাসাদ দ্বারে ইংরাজ বণিক সম্প্রদায় অত্যন্ত দীনভাবে দ-ায়মান। তখন ভারতক্ষেত্রে সংহার শক্তি যত প্রকার বিচিত্র বেশে সঞ্চরণ করিয়া ফিরিতেছিল তন্মধ্যে সর্বাপেক্ষা সাধু শান্ত ও দরিদ্রবেশে ছিল ইংরাজের। মারাঠি অশ্বপৃষ্ঠে দিগ্দিগন্তরে কালানল জ্বালাইয়া ফিরিতেছিল, শিখ ভারতের পশ্চিমপ্রান্তে আপন দুর্জয় শক্তিকে পুঞ্জীভূত করিয়া তুলিতেছিল, মোগল সম্রাটের রাজ প্রতিনিধিগণ সেই যুগান্তরের সন্ধ্যাকালে ক্ষণে ক্ষণে বিদ্রোহের রক্ত ধ্বজা আন্দোলন করিতেছিল, কেবল কয়েকজন ইংরাজ সওদাগর বাণিজ্যের বস্তা মাথায় করিয়া সম্রাটের প্রাসাদ সোপানে প্রসাদচ্ছায়ায় অত্যন্ত বিনম্রভাবে আশ্রয় লইয়াছিল।’ সিরাজদ্দৌলা গ্রন্থে অক্ষয় কুমার সিরাজদ্দৌলাহর চরিত্রে ইংরেজরা যে কালিমা লেপন করেছিল, তা খ-ন করেছেন। অন্ধকূপ হত্যার বিপরীতে ইংরেজদের হত্যাযজ্ঞের উদাহরণ তুলে এনেছেন।

রবীন্দ্রনাথ লেখার প্রশংসা করে উল্লেখ করেন, ‘নিপুণ সারথি যেমন এককালে বহু অশ্বযোজনা করিয়া রথ চালনা করিতে পারে; অক্ষয় বাবু তেমনি প্রতিভাবলে এই বহুনায়ক সংকুল জটিল দ্বন্দ্ব বিবরকে আরম্ভ হইতে পরিণাম পর্যন্ত সবলে অনিবার্য বেগে ছুটাইয়া লইয়া গিয়াছেন।’ ইতিপূর্বে রচিত বিকৃত ইতিহাসের বিপরীতে অক্ষয় কুমারের সত্যসন্ধ অনুসন্ধান রবীন্দ্রনাথ নিজেও সমর্থন করেন সর্বাংশে, সর্বাগ্রে। লিখলেন- ‘তাঁহার ভাষা যে রূপ উজ্জ্বল ও সরস, ঘটনা বিন্যাসও সেইরূপ সুসংগতা, প্রমাণ বিশ্লেষণও সেইরূপ সুনিপুণ; যেখানে ঘটনাসকল বিচিত্র এবং নানাভিমুখী; প্রমাণ সকল বিক্ষিপ্ত এবং পদে পদে তর্ক বিচারের অবতারণা আবশ্যক হইয়া পড়ে; সেখানে বিষয়টির সমগ্রত সর্বত্র রক্ষা করিয়া তাহাকে ক্ষিপ্রগতিতে বহন করিয়া লইয়া যাওয়া ক্ষমতাশালী লেখকের কাজ। বিশেষজ্ঞ প্রমাণের বিচার গল্পের সূত্রকে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেয়। কিন্তু সেই সকল অনিবার্য বাধা সত্ত্বেও লেখক তাঁহার ইতিবৃত্তকে কাহিনীর ন্যায় মনোরম করিয়া তুলিয়াছেন এবং ইতিহাসের চিরাপরাধী অপবাদগ্রস্ত দুর্ভাগা সিরাজদ্দৌলার জন্য পাঠকের করুণা উদ্দীপন করিয়া তবে ক্ষান্ত হইয়াছেন।’ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র গ্রন্থপাঠ করে কলকাতার একজন এ্যাংলো ইন্ডিয়ান পত্রক্রোধ প্রকাশ করেন। যাতে উল্লেখ করেন, মুসলিম শাসনামল হইলে লেখক এ রচনা লিখিতে পারিতেন না। গ্রন্থটিকে একপেশে এবং ইংরেজ বিদ্বেষপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৮ সালের জুলাই মাসে ‘ভারতী’ পত্রিকায় এর প্রত্যুত্তরে কঠোর ভাষাই ব্যবহার করেছেন। লিখেছেন, ‘স্বজাতি সম্বন্ধে পরের নিকট হইতে নিন্দোক্তি শুনিলে ক্রোধ হইতেই পারে। সমূলক হইলেও।’ রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ রচনায় পত্রকারের সমালোচনা করেন, বিশ্লেষণ করেন অক্ষয় কুমারের রচনার সারবত্তা। লিখলেন, ‘অবশ্য ইহাও স্বভাবের নিয়ম যে, সবল দুর্বলকে যেমন স্বচ্ছন্দে নিশ্চিন্ত চিত্তে বিচার করিয়া থাকে, দুর্বল সবলকে তেমন করিয়া বিচার করিতে গেলে সবলের ভ্রুযুগল কুটিল এবং মুষ্টিযুগল উদ্যত হইয়া উঠিতে পারে। অক্ষয়বাবু হয়তো আদিম প্রকৃতির সেই রূঢ় নিয়মের অধীনে আসিয়াছেন, কিন্তু বাংলা ইতিহাসে তিনি যে স্বাধীনতার যুগ প্রবর্তন করিয়াছেন সেজন্য তিনি বঙ্গসাহিত্যে ধন্য হইয়া থাকিবেন।’ অক্ষয় কুমারের ইতিহাস বা সাহিত্যচর্চা শুধু যে বিজ্ঞানভিত্তিক ছিল তাই নয়, এর সঙ্গে পরিস্ফূট হয়েছে সাহসিকতা এবং মেধার পরিচয়। ইংরেজ শাসনাধীন কঠোর নিয়ন্ত্রণে বসবাস করেও ‘সিরাজদ্দৌলাহ’ গ্রন্থে বেনিয়া ইংরেজ সম্পর্কে যেসব মতামত রেখেছেন, তা শাসক ভালো চোখে দেখেনি। তবে গ্রন্থটি নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত করেনি। ‘নব্য ভারত’ পত্রিকার সম্পাদক দেবীপ্রসন্ন রায় চৌধুরী তাঁর এই সাহসিকতাকে সম্মান দেখিয়ে লিখেছিলেন, ১৩০৫, বৈশাখ-চৈত্র সংখ্যায়, ‘অক্ষয় কুমার যে সাহসের সহিত ইংরেজ কলংক ঘোষণা করিয়াছেন, তাহা এদেশে দুর্লভ। আমরা ভীরু বাঙালী, সত্য কথা বলিবার সাহস আমাদের নাই বলিলেই হয়। অক্ষয় কুমার অসীম সাহসে; ধীরতা এবং বিজ্ঞতার সহিত, সংযত লেখনীর সাহায্যে সিরাজের জীবনী বিবৃত করিয়াছেন। তিনি এই গ্রন্থ প্রণয়নে সে সহৃদয়তা এবং স্বদেশানুরাগের পরিচয় দিয়াছেন, তাহা স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়া রাখিবার যোগ্য।’ অক্ষয় কুমার সম্পর্কে সমকালে এবং পরবর্তীকালেরও মূল্যায়ন হচ্ছে, তাঁর সবচেয়ে বড় কীর্তি হলো, বিজ্ঞানসম্মতভাবে বাংলা ভাষায় বাংলার ইতিহাসচর্চা, গবেষণা এবং বিভিন্ন গ্রন্থলিখন।

ইতিহাস বিষয়ক তাঁর গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, সমরসিংহ, সীতারাম রায়, মীর কাশিম, ফিরিঙ্গি বণিক, গৌড়লেখ মালা, অজ্ঞেয়বাদ, নাটোর রাজার ইতিহাস ইত্যাদি। এছাড়া গ্রন্থিত হয়নি এমন প্রচুর নিবন্ধ-প্রবন্ধ পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে। অক্ষয় কুমার সত্যনিষ্ঠতাকে ঊর্ধ্বে রেখেছেন। কোন প্রলোভন, লোভ, মোহ তাকে কাবু করতে পারেনি। তার সহযোগী কর্মপুরুষ ইতিহাসবিদ ক্ষিতীশচন্দ্র সরকার ১৩৩৬ সালের চৈত্র সংখ্যা প্রবাসী পত্রিকায় ‘আচার্য্য অক্ষয় কুমারের স্মৃতিপূজা’ শীর্ষক স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন, ‘স্বার্থ-প্রণোদিত হইয়া একবার কোনো বিখ্যাত পুস্তক প্রকাশক এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থীকে কৃত্রিম পণ্যে পরিণত করিয়া দিবার জন্য দেশের ইতিহাসের মর্যাদা অপেক্ষা কাহারও স্বার্থের মর্যাদা রক্ষা করিয়া একখানি স্কুল পাঠ্য ভারত ইতিহাস প্রণয়ন করিতে অনুরোধ জানাইলে, তদুত্তরে দরিদ্র অক্ষয় কুমার তেজস্বিতার সহিত জানাইয়াছিলেন, আত্মবিক্রয় করিয়া স্বদেশের অসত্য ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করা তাঁহার অসাধ্য। ঐতিহাসিক সত্য উদ্ঘাটন করাই তাঁহার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।’ অক্ষয় কুমার আত্মবিক্রয় দূরে যাক প্রভাবশালীর কাছেও মাথা নত করেননি। স্বয়ং সাহিত্য সম্রাট সমকালে জনপ্রিয় আলোচিত বঙ্কিমচন্দ্রের ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে কলম ধরে অক্ষয় কুমার সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এতে বঙ্কিম অনুরাগী পাঠক ক্ষুব্ধ হয়ে অক্ষয় কুমারের কঠোর সমালোচনা করেন। রবীন্দ্রনাথ আবার অক্ষয় কুমারের পক্ষে কলম ধরেন। বঙ্কিমচন্দ্রের সীতারাম, আনন্দমঠÑ এ ইতিহাস বিকৃতি ঘটেছে বলে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অক্ষয় কুমার সমালোচনা করে বঙ্কিমকে অভিযুক্ত করেন ইতিহাস বিকৃতির জন্য। এতে ক্ষুব্ধ বঙ্কিম অনুরাগী এক পাঠক ১৩০৫ সালের শ্রাবণ সংখ্যা সাময়িকী পত্রিকা ‘পূর্ণিমা’য় লিখলেন, বঙ্কিমচন্দ্র ও মুসলমান সম্প্রদায়’ শীর্ষক প্রবন্ধ। যাতে লেখক বঙ্কিম সমালোচকদের ‘মূর্খের ধৃষ্টতা’ বলে কটাক্ষ করেন। এর প্রত্যুত্তরে ‘ভারতী’ পত্রিকায় শ্রাবণ, ১৩০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, “...‘মীর কাসিম’ লেখকের প্রতি, মতবিরোধ লইয়া, অবজ্ঞা প্রকাশের অধিকার কাহারও নাই। বঙ্কিমবাবুর প্রতি ভক্তি সম্বন্ধে আমরা সমালোচ্য প্রবন্ধ লেখকের অপেক্ষা ন্যূনতা স্বীকার করিতে পারি না, তাই বলিয়া মীর কাশিম লেখক শ্রীযুক্ত অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় মহাশয়ের প্রতি অবমাননা আমরা উচিত বোধ করি না। কারণ, ক্ষমতা বলে তিনিও বঙ্গসাহিত্য হিতষীগণের সম্মানজনক হইয়া উঠিতেছেন।” (চলবে)

নির্বাচিত সংবাদ