১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জামিন নিয়ে কারসাজি ॥ প্রতারক চক্রের খপ্পরে উচ্চ আদালত

  • প্রতিবছর সুপ্রীমকোর্টের অবকাশকালীন ছুটির আগে সক্রিয় হয় এই চক্র

আরাফাত মুন্না ॥ উচ্চ আদালতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে জালিয়াত চক্র। মামলার প্রকৃত তথ্য গোপন রেখে, ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে জামিন নিয়ে আদালতকে বিভ্রান্ত করছে প্রতারক চক্রটি। দেখা গেছে কোন জামিনের আবেদন না করেই চক্রটি জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করছে হাইকোর্টের জামিন আদেশ। সম্প্রতি একের পর এক জামিন জালিয়াতির ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে ভয়ঙ্কর এসব তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই উদ্যোগ না নিলে এর মাধ্যমে ভয়ঙ্কর অপরাধীরাও কারাগার থেকে বেরিয়ে পড়তে পারে।

জালিয়াত চক্রের সহযোগিতায় সম্প্রতি মাদক ব্যবসায়ী, স্বর্ণ চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত অনেক অপরাধী কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে চম্পট দিচ্ছে। সম্প্রতি এ ধরনের তিনটি ঘটনার নথিপত্র জনকণ্ঠের

হাতে এসেছে। এর মধ্যে দুটির কোন জামিন আবেদনই জমা পড়েনি হাইকোর্টে। আর অন্যটিতে আবেদন জমা পড়লেও প্রকৃত তথ্য গোপন করে আবেদনের সঙ্গে দেয়া হয়েছে জাল কাগজপত্র।

ইতোমধ্যে মঙ্গলবার প্রকৃত তথ্য গোপনকারীর জামিন বাতিলও করেছে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে জড়িত আইনজীবীকে কারণ দর্শানোর নোটিসও দেয়া হয়েছে। এছাড়া ঢাকা জেলার চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। বাকি দুটি রয়েছে তদন্ত পর্যায়ে। প্রতিবছরই সুপ্রীমকোর্টের অবকশকালীন ছুটির আগে সক্রিয় হয়ে ওঠে জালিয়াতচক্র। গত বছর এ ধরনের বেশ কয়েকটি খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে জামিন বাতিলের ঘটনাও ঘটেছে।

ঘটনা এক ॥ মোহাম্মদ রশিদ। বয়স ৩৭। চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৪টি স্বর্ণের বার ও ৭৭টি স্বর্ণের চেনসহ আটক হয়েছিলেন গত বছরের ২ ডিসেম্বর। একাধিকবার জামিন আবেদন করেও বিচারিক আদালতে তার জামিন হয়নি। এর পরেও তিনি হাইকোর্টের জাল জামিন আদেশ দিয়েই কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছেন। কারাগার থেকে ছাড়া পেতে রশিদের পক্ষে যে জামিন আদেশ দাখিল করা হয়েছে এতে দেখানো হয়, গত ২১ জুন বিচারপতি মোঃ রেজাউল হক ও বিচারপতি মোঃ খসরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ থেকে জামিন নিয়েছেন। তবে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার কোন জামিন আবেদনই জমা পড়েনি উচ্চ আদালতে। রশিদের জাল জামিন আদেশে জামিন আবেদনের যে নম্বর দেয়া হয়েছে (২০৪৪৪/২০১৫) সেটিও অন্য একটি মামলার।

ঘটনা দুই ॥ সুখলাল দাস। বয়স ৩০ বছর। তিনি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সুইপার। কর্মরত ছিলেন চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। গত বছরের ২০ মার্চ ৩০টি স্বর্ণের বারসহ আটক হন। বিচারিক আদালতে তারও জামিন হয়নি। তিনিও রশিদের মতোই ভুয়া জামিন আদেশ দিয়েই কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছেন। কারাগার থেকে ছাড়া পেতে সুখলাল যে জামিন আদেশ দাখিল করেছেন, এতে দেখা যায়, রশিদ হাইকোর্টের যে কোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন তিনিও একই কোর্ট থেকে জামিন পেয়েছেন গত ২৮ জুন। তার পক্ষেও হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় কোন জামিন আবেদন পাওয়া যায়নি। সুখলালের জাল জামিন আদেশেও আবেদনের যে নম্বর দেয়া হয়েছে (২১৮৮৭/২০১৫) সেটিও ভিন্ন একটি মামলার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাইকোর্টে কোন আসামির জামিন হলে সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে টেলিফোনে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোন আসামি ছাড়া পায় না। তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মোহাম্মদ রশিদ ও সুখলাল দাসের জামিন জালিয়াতির ঘটনায় হাইকোর্টের কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত কি-না? রশিদ ও সুখলালের জামিন জালিয়াতির নথিপত্র বর্তমানে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

ঘটনা তিন ॥ লাকী আক্তার মুক্তা। বয়স ২২ বছর। তিনি গত ১২ এপ্রিল কুয়ালালামপুর থেকে দেশে ফেরার সময় ১০০ গ্রাম ওজনের ১০টি স্বর্ণের বারসহ আটক হয়েছিলেন হযরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। বিচারিক আদালতে জামিন না পাওয়ায় ছিলেন কারাগারে। হঠাত করেই গত ৯ জুলাই আইনজীবী নাসিমা আক্তার শানু আসামি লাকী আক্তার মুক্তার পক্ষে জামিন আবেদন করেন। কিন্তু আবেদনে ১০টি স্বর্ণের বারের পরিবর্তে ২৫ বোতল ফেন্সিডিলসহ আটক করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়। ওই দিনটি সুপ্রীমকোর্টের অবকাশকালীন ছুটির আগের দিন হওয়ায় খুব ব্যস্ততম দিন ছিল। এ কারণেই প্রকৃত তথ্য গোপনের বিষয়টি বিচারপতি একেএম আবদুল হাকিম ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাসের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের নজর এড়িয়ে যায়। আর আসামি লাকী আক্তার জামিন পেয়ে কারাগার থেকে ছাড়াও পান।

সম্প্রতি বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয় সহকারী এ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর। পরে তিনি গত বৃহস্পতিবার বিষয়টি বিচারপতি একেএম আবদুল হাকিম ও বিচারপতি আশিস রঞ্জন দাসের বেঞ্চের নজরে আনলে মামলার নথি তলব করেন আদালত। এরপর নথি পর্যালোচনা করে মঙ্গলবার আদেশের জন্য দিন ধার্য্য করা হয়। মঙ্গলবার আদেশে, আসামি লাকী আক্তার মুক্তার জামিন বাতিল করে বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন আদালত। একই সঙ্গে আইনজীবী নাসিমা আক্তার শানুর বিরুদ্ধেও কারণ দর্শানোর নোটিস জারি করা হয়। এছাড়া ঢাকার চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটকে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

ঘটনা ১ এবং ঘটনা ২ যেভাবে ধরা পড়ল ॥ গত ২২ জুলাই সহকারী এ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে চট্টগ্রাম থেকে একজন আইনজীবী বিষয়টি অবহিত করেন। ওই আইনজীবী এএজিকে বলেন, আপনাদের কোর্টে নাকি স্বর্ণের কোন মামলার জামিন হয় না, তাহলে দুই জন কিভাবে জামিন পেলেন? পরে এএজি জিন্নাহ, ওই আইনজীবীকে ওই দুই জনের মামলার কাগজপত্র পাঠাতে বলেন। চট্টগ্রামের ওই আইনজীবী কাগজপত্র পাঠালে এএজি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দেখতে পান বিচারপতি মোঃ রেজাউল হক ও বিচারপতি মোঃ খসরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চের নাম উল্লেখ করে দুটি জাল জামিন আদেশ তৈরি করা হয়েছে (মোঃ আলী জিন্নাহ এই বেঞ্চেই দায়িত্বরত)। এরপর গত ২৬ জুলাই অবকশকালীন ছুটি শেষে সুপ্রীমকোর্ট খোলার পর তিনি ওই ভুয়া জামিন আদেশ দুটি বিচারপতি মোঃ রেজাউল হক ও বিচারপতি মোঃ খসরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে আনেন। পরে আদালত দুটি জাল জামিন আদেশসহ নথিপত্র প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বরাবরে প্রেরণ করেন বলে জনকণ্ঠকে জানান এএজি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, এ ভুয়া আদেশ দেখিয়ে আসামিরা চট্টগ্রাম কারাগার থেকে ইতোমধ্যে মুক্তি নিয়ে চম্পট দিয়েছেন। হাইকোর্টের যে দফতর টেলিফোনে কারাগার কর্তৃপক্ষকে জামিন আদেশের বিষয়ে নিশ্চিত করেন সে দফতরের লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সরকারের এ আইন কর্মকর্তা বলেন, অনেক সময় তারা টেলিফোন থেকে ফোন না দিয়ে মোবাইল ফোন থেকে ফোন দিয়ে আদেশের বিষয়ে কনফার্ম করেন। এটা ঠিক নয়। তিনি আরও বলেন, এভাবে চলতে থাকলে ভয়ঙ্কর অপরাধীরাও কারাগার থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হবে। এখনই এসব জামিন জালিয়াতি রোধে সুপ্রীমকোর্ট প্রশাসনের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

ঘটনা ৩ যেভাবে ধরা পড়ে ॥ ঘটনা ১ ও ঘটনা ২ যেভাবে ধরা পড়ে ঠিক একই ভাবেই ধরা পড়ে ঘটনা ৩। তবে এবার আসামি ঢাকার কারাগারে থাকায় এএজি মোহাম্মদ আলী জিন্নাকে ফোন করেন ঢাকা জেলা আদালতের এক আইনজীবী। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানান, ওই আইনজীবী আমাকে ফোন করে জানতে চান স্বর্ণের মামলায় জামিন হয় কি-না? আমি জামিন হয় না বলে জবাব দিলে তিনি বলেন, কেন এইযে ১৫ নম্বর কোর্ট থেকে (একেএম আবদুল হাকিম ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস) জামিন হয়েছে। জিন্নাহ বলেন, পড়ে আমি তার কাছ থেকে মামলার কাগজপত্র সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে দেখি জাল কাগজপত্র দিয়ে জামিন নিয়েছে। স্বর্ণের মামলা থাকলেও হাইকোর্টে যে জামিন আবেদন করা হয়েছে এখানে দেখান হয়েছে ২৫ বোতল ফেন্সিডিলের মামলা।

জনকণ্ঠের অনুসন্ধান ॥ তিনটি ঘটনার নথিপত্র হাতে আসার পর বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামে জনকণ্ঠ। গত বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট সহকারী রেজিস্ট্রার এবং রেকর্ড শাখার সুপারের সঙ্গে দেখা করে তিনটি জামিন আদেশই দেখানো হয়। এই তিনটি আদেশেই সহকারী রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর করার যায়গায় এক জনেরই স্বাক্ষর ছিল। যার মধ্যে একটি আসল জামিন আদেশ (তথ্য গোপন করে নেয়া) এবং বাকি দুটি জাল। ওই সহকারী রেজিস্ট্রার (নাম প্রকাশে অনিুচ্ছুক) প্রথমে জামিন আদেশগুলো দেখে হতবাক হয়ে যান। তিনি বলেন, জাল জামিন আদেশ দুটোতে যে স্বাক্ষর রয়েছে তার সঙ্গে আমার স্বাক্ষরের সঙ্গে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ মিল রয়েছে। যারা জালিয়াতির কাজ করে তারা খুব স্টাডি করেছে বলেই মনে হয় বলে মুচকি হাসেন তিনি। পরে সংশ্লিষ্ট রেকর্ড শাখায় জামিন আদেশের কপিগুলো নিয়ে গেলে শাখার সুপার জাল আদেশ দুটো দেখেই বলেন এ গুলো ভুয়া। ওখানে যে মামলা নম্বর দেয়া হয়েছে সেই দুটি মামলার নথি আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানান শাখা সুপার। মোহাম্মদ রশিদ ও সুখলাল দাসের জাল জামিন আদেশে জামিন আবেদনের দুটি নম্বর দেয়া রয়েছে। জনকণ্ঠ সুপ্রীমকোর্টের ওয়েবসাইটে গিয়ে কেস সার্চে ওই নম্বরগুলো দিলে ওই নম্বরগুলোর আসল তথ্য বেরিয়ে আসে। মোহাম্মদ রশিদের জামিন আবেদনের নম্বর দেয়া হয়েছে, ক্রিমিনাল মিস কেস নম্বর ২০৪৪৪/ ২০১৫। এই নম্বরটি ওয়েবসাইটে সার্চ দিয়ে দেখা গেছে, এখানে আবেদনকারী হিসেবে রয়েছে আবুল কালাম নামের এক ব্যক্তি। আর সুখলাল দাসের জামিন আবেদনের নম্বর দেয়া হয়েছে, ক্রিমিনাল মিস কেস নম্বর ২১৮৮৭/ ২০১৫। এই নম্বরটি ওয়েবসাইটে সার্চ দিয়ে দেখা যায় আবেদনকারী হিসেবে লেখা রয়েছে বদরুল আলমের নাম।

এসব বিষয়ে সুপ্রীমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, জামিন জালিয়াতির বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আমরা এসব জামিন জালিয়াতি রোধ করতে কাজ করছি। ভবিষ্যতে টেলিফোনে কনফার্মেশনের পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে এ কাজটি করার বিষয়ে কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।