২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে পাচ্ছে না বিএনপি

  • সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে

শরীফুল ইসলাম ॥ ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে পাচ্ছে না বিএনপি। আন্দোলন ও দল গোছানোর কাজে ব্যর্থ হওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে চরম সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। দল প্রতিষ্ঠার ৩৭ বছরের মধ্যে বিএনপি আর কখনও এমন বেকায়দায় পড়েনি। পরিস্থিতি উত্তরণে শত চেষ্টা করেও কোন কাজ হচ্ছে না। তাই দলের সর্বস্তরে চরম হতাশা বিরাজ করছে। অনেক নেতাকর্মী বিএনপি ছেড়ে অন্য দলে চলে যাচ্ছে। জানা যায়, সঙ্কট উত্তরণে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও দলের থিঙ্কট্যাংক বলে পরিচিত কিছু বুদ্ধিজীবী বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু কোন চেষ্টাই কাজে আসছে না। দলের অন্য সিনিয়র নেতারাও সঙ্কট উত্তরণে খালেদা জিয়াকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসছেন না। বরং সিনিয়র নেতাদের মধ্যে অনেকে দলীয় কর্মকা- থেকে দূরত্ব বজায় রেখে নিজ নিজ ব্যবসাবাণিজ্যসহ পেশাগত কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের পর থেকেই দৃশ্যত বড় ধরনের সঙ্কটের মুখে পড়ে বিএনপি। এর পর চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ প্রভাবশালী নেতারা মামলায় জড়িয়ে পড়া, টানা ৯২ দিনের নেতিবাচক আন্দোলন, ৩ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বর্জন ও দফায় দফায় চেষ্টা করেও দলের সাংগঠনিক দুরবস্থা কাটিয়ে তুলতে না পেরে সঙ্কট উত্তরণের পথ খুঁজে পাচ্ছে না দলটি। এ কারণে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। ইতোমধ্যেই রাজশাহী, পাবনা, কুমিল্লা, সাভার, বরিশাল ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার অনেক নেতাকর্মী বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে।

টানা ৯২দিন আন্দোলন চলাকালে গাড়ি পোড়ানো হত্যা মামলা এবং জিয়া চ্যারিটেবল ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলাসহ বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে বিএনপিকে বড় ধরনের সঙ্কটের মুখে ফেলেছেন চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলের অন্য নেতারাও গাড়ি পোড়ানোসহ বিভিন্ন মামলার আসামি। বেশ ক’জন নেতা কারাগারেও রয়েছেন। শীঘ্রই এসব মামলার চূড়ান্ত রায় হয়ে যাবে বলে সরকারী দলের নেতারা বলে আসছেন। আর তা হলে খালেদা জিয়াসহ দলের আরও ক’জন সিনিয়র নেতা গ্রেফতার হতে পারেন। মামলার কারণে কারাগারে যেতে হলে তারা আপাতত রাজনীতিও করতে পারবেন না। খালেদা জিয়া গ্রেফতার হলে তার ছেলে লন্ডন প্রবাসী তারেক রহমানও একাধিক মামলার ফেরারি আসামি হওয়ায় দেশে আসতে চাইবেন না। কেউ কেউ তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানকে রাজনীতিতে আনার চেষ্টা করলেও ডা. জোবাইদার এ ব্যাপারে কোন আগ্রহ নেই বলে জানা গেছে। তাই চলমান পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না পারলে ভবিষ্যতে বিএনপিকে আরও কঠিন সময় অতিক্রম করতে হবে।

বড় ধরনের আন্দোলনে বিএনপি প্রথমবার ব্যর্থ হয় ২০১৩ সালে। ওই বছর শেষ দিকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দেশব্যাপী লাগাতার আন্দোলন করে বিএনপি। আন্দোলন চলাকালে সারাদেশে ব্যাপক নাশকতাও চালানো হয়। আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার পর নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালায় বিএনপি। এতেও সফল না হওয়ায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নির্বাচন বর্জন করে। কিন্তু বিএনপি জোট বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ সমমনা দলগুলোকে নিয়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে সরকার গঠন করে। বিএনপি হাইকমান্ড মনে করেছিলেন আওয়ামী লীগ হয়ত নির্বাচনের পর সংবিধান সংশোধন করে আরেকটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি পড়ায় এ বছর ৬ জানুয়ারি থেকে সারাদেশে টানা ৯২দিন অবরোধ ও দফায় দফায় হরতাল পালন করে তারা। এমনকি আন্দোলন চলাকালে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বাসা ছেড়ে দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান করেন।

সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চাঙ্গা করতে ৫ জানুয়ারি রাজধানীতে বড় ধরনের শোডাউন করার সিদ্ধান্ত নেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। এ জন্য প্রস্তুতি জোরদার করতে ৩ জানুয়ারি রাতে বাসা ছেড়ে গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করেন তিনি। তার সঙ্গে দলের আরও ক’জন নেতাকর্মীও গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করেন। খালেদা জিয়ার ডাকে ৬ জানুয়ারি থেকে সারাদেশে ২০ দলীয় জোটের টানা অবরোধ কর্মসূচী শুরু হয়। এ কর্মসূচী পালনকালে দলের নেতাকর্মীরা রাজপথে তেমন সক্রিয় না থাকলেও তা সফল করতে চোরাগোপ্তা নাশকতা চালিয়ে সারাদেশে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা হয়। বিশেষ করে পেট্রোল বোমার আঘাতে শতাধিক মানুষ মারা যাওয়া এবং আরও শতাধিক মানুষ আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার মতো নেতিবাচক দিকগুলো এখনও দেশের সাধারণ মানুষ ভুলতে পারেনি। আন্দোলনের কথা মনে হলেই মানুষ বিএনপির বিরুদ্ধে এই ধ্বংসাত্মক কর্মকা-ের অভিযোগ উত্থাপন করে। বিদেশী কূটনীতিকরাও বার বার এ বিষয়টির প্রতি দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এদিকে আন্দোলনের নামে নাশকতামূলক কর্মকা-ে জড়ানোর অভিযোগ এনে সরকারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধমে বিএনপি নেতাকর্মীদের কঠোর নজরদারির আওতায় আনে। বিভিন্ন মামলার আসামি হওয়ায় দলের অনেক নেতাকর্মী গ্রেফতার হন। আর পুলিশের চোখ এড়াতে দলের অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যান। এখনও নতুন করে বিএনপির আরও অনেক নেতাকর্মী বিভিন্ন মামলায় জড়াচ্ছেন। কেউ কেউ কারাগারে অবস্থান করছেন।

খালেদা জিয়াসহ দলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনের আগে জোরেশোরে প্রচার চালালেও ২৮ এপ্রিল ৩ সিটির নির্বাচনের দিন ভোট শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। কিন্তু এর আগে প্রার্থী ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতামত না নেয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দেয়। দলীয় হাইকমান্ডের প্রতি ক্ষব্ধ হয়ে কেউ কেউ আর রাজনীতি না করারও ঘোষণা দেন। এদিকে নির্বাচনে কোন ধরনের কারচুপি হলে কঠোর আন্দোনে যাওয়ার আগাম ঘোষণা দিলেও নেতাকর্মীদের সায় না থাকায় নির্বাচনের পর আর আন্দোলন কর্মসূচী ঘোষণা করেনি বিএনপি। উপরন্তু নির্বাচনের পর বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আবারও নতুন করে মামলার খড়গ নেমে আসে। এ পরিস্থিতিতে অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েন দলীয় হাইকমান্ড। তাই বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে হতাশা আরও বেড়ে যায় এবং অনেকে দল ছেড়ে চলে যেতে থাকে।

এদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে বার বার চেষ্টা করেও যেখানে বিএনপি ব্যর্থ হচ্ছে সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তৎপরতায় নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন সরকার স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন করায় ছিটমহলবাসীদের দীর্ঘ ৪০ বছরের সমস্যা সমাধান হয়। অথচ বিএনপি ৫ বার ক্ষমতায় গিয়েও এ সমস্যার সমাধান করতে পারেননি। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ঠিকই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করে এ সমস্যার সমাধান করতে পারায় রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ আগের চেয়ে আরও শক্ত অবস্থানে চলে এসেছে মনে করে বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা আর ও বেড়ে যায়। এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে লেবার পার্টির মনোনয়নে একটি আসন থেকে নির্বাচিত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ। এতে প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক আরও বাড়বে বলে অনেকেই মনে করছে। চীন ও জাপানসহ আরও ক’টি প্রভাবশালী দেশের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সম্পর্ক উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছে।

নির্বাচন বর্জন ও আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার পর বিএনপি হাইকমান্ড সর্বস্তরে দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। খালেদা জিয়ার নির্দেশে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দফায় দফায় সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের তাগাদা দেয়া হয় কমিটি পুনর্গঠনের ব্যাপারে। কিন্তু দলের নেতাকর্মীরা দল পুনর্গঠন কার্যক্রমে সহযোগিতা না করায় এখানেও সফলতা অর্জন করতে পারেনি বিএনপি। জানা যায়, বিএনপিতে এখন কেন্দ্র থেকে শুরু করে সর্বস্তরের দলীয় অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। আন্দোলন কিংবা দলীয় কর্মকা-­ না থাকায় নেতাকর্মীরাও দলবিমুখ হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থার অবসানে সাংগঠনিক দুরবস্থা কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কোন পথও খুঁজছেন না বিএনপি হাইকমান্ড। সাড়ে ৫ বছর ধরে জাতীয় কাউন্সিল হচ্ছে না। এ কারণে দলের নির্বাহী কমিটিও পুনর্গঠন করা যাচ্ছে না।

বিএনপির ৭৫ সাংগঠনিক জেলার মধ্যে সব কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা মহানগরেও বিএনপির কোন তৎপরতা নেই। তা ছাড়া সর্বস্তরে রয়েছে দলীয় নেতাকর্মীদের কোন্দল। দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াও কার্যত একা হয়ে পড়েছেন। বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

গত ক’বছর ধরে বার কাউন্সিলে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ও দলীয় আইনজীবীরা। কিন্তু অতি সম্প্রতি এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের কাছে তাদের শোচনীয় পরাজয় হয়। এটিও বিএনপির জন্য একটি দুঃসংবাদ বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান রাবেয়া চৌধুরী জনকণ্ঠকে বলেন, অনেক দিন হলো আমরা কোন সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে পারছি না। মামলাসহ বিভিন্ন কারণে নেতাকর্মীরা দলীয় কর্মকা-ে সক্রিয় না থাকায় আমরা দল পুনর্গঠন করতে পারছি না। কবে আমরা আবার সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের নিয়ে দলীয় কাজে সক্রিয় হতে পারব তাও বলতে পারছি না।

এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, বিএনপি এখন দুঃসময় অতিক্রম করছে। সরকারের আচরণের কারণে আমরা নানামুখী সঙ্কটে পড়েছি। নেতাকর্মীদের নামে অসংখ্য মামলা। মামলা-হামলা করে বিএনপিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। তবে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদেরও ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে।