২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলাদেশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মিয়ানমারের সেনা ও বিজিপি এগোচ্ছে

  • বান্দরবান সিমান্তে কম্বিং অপারেশন

মোয়াজ্জেমুল হক/এইচএম এরশাদ/মোহাম্মদ আলী ॥ বান্দরবানের থানচি উপজেলার মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় বিজিবির ওপর সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী আরাকান আর্মির সশস্ত্র হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মিয়ানমারে সেনা ও বিজিপি সদস্যরা এগোচ্ছে। লক্ষ্য সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন। বিজিবির পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে সীমান্তের বাংলাদেশ অভ্যন্তর থেকে এদের বিতাড়নে যে অভিযান চলছে তাতে এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী যাতে সে দেশের অভ্যন্তরে অবস্থান নিতে না পারে সে লক্ষ্যে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এগিয়ে এলে এদের নির্মূল সম্ভব হবে। বিষয়টি অনুধাবনে এনে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে বলে সীমান্তের ওপারের কয়েকটি সূত্রে জানানো হয়েছে।

গত বুধবার থানচির বড়মদকে বিজিবির নৌকা টহল ও বিওপি লক্ষ্য করে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী আরাকান আর্মি সদস্যদের সশস্ত্র হামলার তাৎক্ষণিক জবাব দেয়ার পর ওইদিন সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়েছে অভিযান। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়ে বিজিবির কম্বিং অপারেশন শুরু করা হয়েছে। এদিকে, বাংলাদেশের পক্ষে বিজিবি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কাছে সীমান্ত এলাকায় এদের দমনে যে আহ্বান জানানো হয় সে আহ্বানে সাড়া দিয়েছে সে দেশের সরকার। সীমান্ত এলাকা থেকে শুক্রবার প্রাপ্ত সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, সংঘর্ষের ঘটনাস্থলসংলগ্ন সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের মিলিটারি ও বিজিপি (বর্ডার গার্ড পুলিশ) মোতায়েন শুরু হয়েছে।

বিজিবি সূত্র জানায়, বাংলাদেশের পক্ষে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে এপারে যৌথ অভিযানে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সে দেশের অভ্যন্তর এলাকায় যাতে নিরাপদে অবস্থান নিতে না পারে সে লক্ষ্যে সেদিক থেকে অভিযান পরিচালনা করার। এতে সম্মত হয়েছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবং সে কারণেই তাদের সেনা সদস্য ও বিজিপি সদস্যদের অগ্রসর হওয়ার ঘটনা।

এদিকে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন স্থানে মিয়ানমারের একাধিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের তৎপরতা বিদ্যমান রয়েছে। যা বর্তমানে এটি একটি বড় ধরনের আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। গত ২৭ আগস্ট বান্দরবানের সীমান্তসংলগ্ন দুর্গম এলাকা থানচির বড়মদকে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বিজিবির সদস্যদের নৌকা টহল ও বিওপি লক্ষ্য করে আরাকান আর্মির সশস্ত্র সদস্যদের দুঃসাহসিক হামলার ঘটনা এদেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে বড় ধরনের নাড়া দিয়েছে। সরকার এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে থানচির তিন্দু, রেমাক্রী, ছোটমদক, বড়মদক ও আন্ধারমানিকসংলগ্ন সীমান্তের গহীন অরণ্যজুড়ে বুধবার বিকেল থেকে শুরু হয়ে যায় সেনাবাহিনী ও বিজিবির যৌথ অভিযান। পরদিন বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে কম্বিং অপারেশন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণাই দিয়েছেন, মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নির্মূলে এ অভিযান চলবে। আর বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ জানিয়ে দিয়েছেন, আমাদের পাহাড়কে ভিন্ন দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।

বিজিবি সূত্র জানায়, মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে এসব বিচ্ছিন্নতাবাদীর কর্মকা- সেটা তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। কিন্তু এ প্রক্রিয়ায় এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী বাংলাদেশ সীমান্তের অরক্ষিত (আনগার্ডেড) এলাকা ব্যবহার নিয়ে মাথাব্যথা। মূলত, বাংলাদেশ অভ্যন্তরে এদের কোন ক্যাম্প বা স্থায়ী আস্তানা নেই। এদের জরুরী প্রয়োজনে এরা আমাদের সীমানা অভ্যন্তর এলাকায় এসে তাদের কার্যক্রমকে এগিয়ে নেয়। এ প্রক্রিয়ায় বর্তমানে এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের সদস্য আমাদের জন্য এক ধরনের হুমকি হয়ে যে দাঁড়িয়েছে তা প্রমাণিত। বিজিবির নৌকা টহল ও বিওপি লক্ষ্য করে হামলা চালানোর যে দুঃসাহস তারা দেখিয়েছে তার পাল্টা জবাব সঙ্গে সঙ্গে দেয়া হয়েছে। আর এতেই বিচ্ছিন্নতাবাদীর সদস্যরা মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার অভ্যন্তরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।

বিজিবি সূত্র জানায়, শুক্রবার তৃতীয় দিনের মতো যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ সীমানা অভ্যন্তর থেকে এদের নির্মূল না করা পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশের মাটি কোন দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যবহার করতে দেয়া হবে নাÑ এটাই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে বিজিবি সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, রাঙ্গামাটির দুর্গম উপজেলা রাজস্থলী সদরের তাইন্দং কলেজপাড়া এলাকা থেকে বিপুল সামরিক সরঞ্জামসহ যৌথবাহিনীর হাতে গ্রেফতার আরাকান আর্মির সদস্য অং ক্রউ রাখাইনকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে তাকে রাঙ্গামাটি জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সোপর্দ করার পর ১৯৪৬ সালের বিদেশী নাগরিকের অবৈধ অনুপ্রবেশ সংক্রান্ত মামলায় আদালত জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। যে ভবনটি থেকে আরাকান আর্মির এ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে সে ভবনের মালিক নেদারল্যান্ডস প্রবাসী। তার নাম রেনাইজু। তার বিরুদ্ধে পৃথক একটি মামলা হয়েছে। রাজস্থলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অহিদউল্লাহ সরকার, রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শহীদ উল্লাহ জানান, গ্রেফতারকৃত আরাকান আর্মি সদস্য মিয়ানমারের নাগরিক। তার কাছ থেকে পাসপোর্ট পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে আরও একটি মামলার প্রস্তুতি চলছে। অভিযানকালে বাড়ির মালিক রেনাইজুকে পাওয়া যায়নি। সীমান্তের ওপারের বিভিন্ন সূত্র খবর দিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমার সরকারের ধারণা ছিল আরকান আর্মিসহ সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সদস্যরা বাংলাদেশ অভ্যন্তরে থেকে ট্রেনিং নেয় এবং মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে পুনরায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরে চলে আসে। উল্লেখ্য, গত ২৬ আগস্ট থানচি উপজেলার রেমাক্রী এলাকার বড়মদক বিওপিতে আরাকান আর্মির হামলার নেপথ্যে রয়েছে তাদের ১৩টি মাউন্টেন হর্স বিজিবি সদস্যরা আটকের ঘটনার পর গোলাগুলিতে দুটি ঘোড়া মারা যায়। ১০টি ঘোড়া বিজিবি কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে হস্তান্তর করেছে বলে বিজিবি সূত্রে জানা গেছে। অপরদিকে, সীমান্তসংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে, বিজিবির পক্ষে পাল্টা গোলাগুলির ঘটনায় জলপাই রঙের ইউফর্ম পরিহিত গুলিবিদ্ধ ১০ বিচ্ছিন্নতাবাদী সদস্যকে সরিয়ে নিতে তারা দেখেছে। এর মধ্যে কয়েকজন মৃত বলেও তাদের ধারণা। তবে এ বিষয়টি বিজিবি বা সরকারী কোন সূত্র এখনও নিশ্চিত করেনি।

এই মাত্রা পাওয়া