১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাপুরুষ সৃষ্টি করেনি কখনও

  • মুনতাসীর মামুন

শিক্ষকদের যোগ্যতার একটি মাপকাঠি ছিল নিজ বিষয়ে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং গবেষণা। ঐ সময় বিভিন্ন পদে নিয়োগের ব্যাপারে সাম্প্রদায়িক প্রশ্নও উঠতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্টের মুসলমান সভ্যরা চাইতেন মুসলমান প্রার্থী যদি তুলনামূলকভাবে কম যোগ্যও হয় তবুও যেন পদটি তারই হয়। গতকালের পর আজ পড়ুন চতুর্থ কিস্তি...

সেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদদের সংখ্যা বাড়তে থকে। পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক আমলে ১৯৫২ সালে শহীদ বরকত, তারপর ইতিহাসের ছাত্র আসাদ থেকে এ পর্যন্ত শহীদের সংখ্যা হ্রাস পায়নি। ১৯৭১ সালের কথা বাদ-ই দিলাম। ১৯৬৯ সাল থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা এসব আন্দোলনে ভূমিকা গ্রহণ করতে থাকেন। তারপর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহীর অধ্যাপক ড. জোহা শহীদ হলে গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়। ১৯৭১ সালে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক শহীদ হন বা নির্যাতিত হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রেফতার শুরু হয় ভাষা আন্দোলনের সময় থেকে, শেষ গ্রেফতার দেখি এ শতকে ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রেফতারে।

একটি রাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে, বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের যে অবদান তা আর কারও নেই, গরিব জনসাধারণ ছাড়া। আমলাতন্ত্রের এই ঐতিহ্য নেই। তারা যে ঐতিহ্য বহন করছে ঔপনিবেশিক আমল থেকে, তা’হলো নিপীড়ন, প্রতিক্রিয়া ও অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখল এবং দায়িত্বহীন ভোগের। রাষ্ট্রের জন্য আমলাতন্ত্রের কোন সদস্য জেল খাটেনি ও গ্রেফতারও হয়নি। সে জন্য ঢাকা [ও অন্যান্য] বিশ্ববিদ্যালয় সমাজে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। আর এ কারণেই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি। ঔপনিবেশিক আমলে দ্বন্দ্বের সৃষ্টির কারণ আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক শক্তির প্রতিভূ বা অংশ মনে করা হতো। যারা আমলাতন্ত্রে যোগ দিয়েছেন তখন তারাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছেন। কিন্তু আমলাতন্ত্রে আসার পর নিজেদের কর্তৃত্বের অধিকারী মনে করেছেন এবং সেই কর্তৃত্বের একমাত্র চ্যালেঞ্জ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দ্বন্দ্বটা সেখান থেকে। কিন্তু আমলাদের মধ্যে যথার্থ অর্থে যারা শিক্ষিত ছিলেন গত শতকের সেই ৫০ বা ৬০ দশকে তাদের অনেকে আমলা থেকে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয় ও বাঙালী রাজনৈতিক নেতাদের সংলগ্ন মনে করেছেন বেশি। এখনও যে ব্যতিক্রম নেই তা বলা যাবে না।

ঢাকা ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এ দেশের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজ সৃষ্টি করেছে, এ দেশের শিক্ষা, আইন, শাসন সর্বক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই অধিকার করেছেন। এ দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি থেকে শীর্ষ আমলা সব বিশ্ববিদ্যালয়েরই, বিশেষ করে ঢাকারই।

বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয় তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ কথাটি মনে রেখেছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশেষ আইন করে একে স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে একে বিশেষ মর্যাদা বা ‘স্পেশাল স্টেটাসে’ ভূষিত করার কথা ছিল তাঁর।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর, জিয়ার আমল থেকে আমলাতন্ত্রের সঙ্গে ঢাকা ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বন্দ্ব জোরালো হয়ে ওঠে, আমলাতন্ত্রের বিশেষ মর্যাদার জন্য। আজকে যারা ক্ষমতায় তারা নিশ্চয় ভুলে যাননি জিয়া থেকে খালেদা-নিজামীর আমল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কী ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং ছাত্ররাও। আজকে যারা আমলাতন্ত্রে আছেন তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে মৌলবাদ জঙ্গীবাদবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন ও গণতন্ত্রের জন্য লড়েছেন। এর জন্য কি ক্ষণিকের তরেও তারা গৌরব বোধ করেন না? তাদের জীবনে ঐটিইতো একমাত্র গৌরবের কাল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন কাঠামো নিয়ে শিক্ষকদের আন্দোলন বহুদিনের। পূর্ববর্তী আমলাতান্ত্রিক সরকারসমূহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা হ্রাস করার চেষ্টা করেছে। এ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসক বা আমলাতন্ত্র থেকেও খারাপ। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক ধরনের হীনম্মন্যতাবোধ ও পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক সঙ্কীর্ণ দৃষ্টি। আমরা যখন তরুণ শিক্ষক তখন এ আন্দোলন আরও জোরদার হয় এবং এক সময় সরকার এ দাবির যৌক্তিকতা মেনে নেয়। সেই আন্দোলনের সময় শিক্ষক নেতা অধ্যাপক সা’দউদ্দীনের সঙ্গে কেবিনেট সচিবের বৈঠক হয় বলে শুনেছি। সচিব পৃষ্ঠপোষকতার সুরে বললেন, ‘আপনাদের বেতন বাড়াবার যৌক্তিকতা কী?’ অধ্যাপক সা’দউদ্দীন নাকি উত্তর দিয়েছিলেন, আপনাদের বেতনে বরকত আছে। আমরা কাছাকাছি বেতনে হলেও ঢাকা শহরে আপনার বাড়ি আছে, ছেলেরা বিদেশে পড়ে, আমার বেতনে তেমন বরকত নেই। মেয়েরা এখানে পড়ে, বাড়িও নেই গাড়িও নেই। সপ্তম বেতন কমিশনে ঠিক হয়, সর্বোচ্চ স্কেলটি পাবেন সবধরনের সচিব ও অধ্যাপকবৃন্দ। এখানে একটি ফাঁক রাখা হয় যা শিক্ষকদের চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল বা ততটা মনোযোগী ছিলেন না তারা এ ক্ষেত্রে। অধ্যাপকদের বেতন অতিরিক্ত সচিবের কোঠায় রেখে, ২৫% ভাগ সিনিয়র অধ্যাপকদের সিলেকশন গ্রেড দিয়ে এক নম্বরে রাখা হয়েছিল। এর কারণ ছিল, অধ্যাপকরা যেন সচিবের সমমর্যাদা না পান। যেসব ভাতা দেয়া হয়েছিল সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের তা দেয়া হয়নি শিক্ষকদের, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা ছাড়া। পরে, শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ড থেকে বই বা অন্যান্য ক্ষেত্রে সামান্য ভাতার ব্যবস্থা করেন।

সপ্তম থেকে অষ্টম পে-স্কেলের মাঝে আরও কিছু ঘটনা ঘটে যা শিক্ষকরা নজরে আনেননি। কারণ, সামষ্টিকভাবে তারা সুযোগ-সুবিধা সেভাবে আদায় করে নিতে অভ্যস্ত নন। হঠাৎ দেখা গেল, তিন বাহিনী প্রধান, কেবিনেট ও প্রধানমন্ত্রীর প্রধান সচিবকে স্কেলের বাইরে নিয়ে আসা হয়। এতে অধ্যাপকরা দুই নম্বরে চলে যান (আদতে ৩ নম্বরে)। বর্তমান সরকারের আমলে আমলাদের তুষ্ট করার জন্য সিনিয়র সচিব পদ সৃষ্টি করা হয়। তাদেরও নিয়ে আসা হয় নিয়মিত স্কেলের বাইরে। অধ্যাপকরা চলে যান ৩ নম্বরে (আদতে চার নম্বরে)। অষ্টম বেতন কমিশনের এবং পরবর্তীকালে সচিব কমিটির সুপারিশে সচিবদেরও নিয়ে আসা হয় নিয়মিত স্কেলের বাইরে। আমরা চলে আসছি এখন ৪ নম্বরে (আদতে ৫ নম্বরে)। পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখেছি, সচিব কমিটি আরেকটি পদ [পদায়িত সচিব] স্কেলের বাইরে নিয়ে আসতে চান। তা যদি হয়, তাহলে আমরা চলে আসব ৫ নম্বরে (আদতে ৬ নম্বরে)। প্রতারণাটা হলো বলা হয়েছে, বেতন স্কেলের শীর্ষে থাকবেন অধ্যাপকরা। অর্থাৎ অধস্তন বেতন স্কেলের শীর্ষে। আসলে পে-স্কেল এখন দুটিÑ উর্ধতন ও অধস্তন। চলবে...