২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাসের কলঙ্কমোচন

ইতিহাসের আরও এক কলঙ্ক থেকে জাতিকে দায়মুক্ত করা হলো। যে দায় ছিল সমগ্র জাতির, অবশেষে সে দায়বদ্ধতায় দায়িত্ব পালন করলেন উচ্চ আদালত। ঐতিহাসিক এই রায়ের মাধ্যমে বিবেকের জাগরণ ঘটানো হয়েছে। এই রায় নির্দেশনামূলক, যা অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে গ্রহণ করছে দেশবাসী। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সার্বভৌমত্বে বিশ্বাসীরা উচ্চ আদালতের রায়কে অবশ্যই গভীর শ্রদ্ধা জানায়। এ দেশের আগামী প্রজন্ম রাজাকারের নামমুক্ত সড়কে স্বাধীনতার চেতনায় বুক ভরে নিশ্বাস নিয়ে চলাচল করতে পারবে। একইভাবে বিভিন্ন স্থাপনা বা অবকাঠামোসমূহেও তাদের যাওয়া-আসা হয়ে উঠবে স্বচ্ছন্দ।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যারা বাঙালী নিধন করেছে, দেশে-বিদেশে অপপ্রচার চালিয়েছে, তারা জাতির জন্য কলঙ্কস্বরূপ শুধু নয়, চিরশত্রুও। একটি জাতিকে ধ্বংস করতে তারা সশস্ত্রপন্থা অবলম্বন করে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটসহ নানাবিধ অপকর্ম চালিয়েছে। স্বাধীনতার পর এদের অনেকে পালিয়ে যায় পরাজয়ের গ্লানি ও কালিমা নিয়ে। যারা আটক হয়েছিল, সেই সব শীর্ষ রাজাকার ও শান্তি কমিটির নেতাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এদের অনেকের শাস্তি প্রদান করা হয় অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায়। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতা দখলকারী সামরিকজান্তা শাসকরা এদের মুক্ত করে দেয়। এদের রাজনীতিতেও পুনর্বাসন করা হয়। এমনকি সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগের নামে বিজয়ী করা হয়। শুধু তাই নয়, এদের মন্ত্রী বানিয়ে গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকাও ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী যাদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছিল, তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। রাজাকার পুনর্বাসনকারী জান্তাশাসক জিয়া তাদের নামে স্থাপনা, সড়কের নামকরণও করে। মহান জাতীয় সংসদের চত্বরে এদের কয়েকজনকে সমাধিস্থ করা হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারও ক্ষমতায় বসে যুদ্ধাপরাধীদের নামে ছাত্রাবাসসহ সড়কের নামকরণ করে।

শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে, তখন আশা করা হয় দেশের যেসব সড়ক, স্থাপনা বা অবকাঠামোসমূহে রাজাকারদের নামফলক এবং যেখানে কবর রয়েছে তাও দ্রুত সরিয়ে ফেলা হবে। কিন্তু সেসব এখনও উপেক্ষিত। জাতীয় সংসদ ভবনের সৌন্দর্য বিনষ্টকারী, স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারদের কবর ও স্থাপনাগুলোও সরানো জরুরী।

সামরিকজান্তা জিয়া-এরশাদ ও বিএনপি-জামায়াত জোটের এসব অপকর্মকে বদলে ফেলার দায়িত্ব ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সরকারের। কিন্তু তা এখনও হয়নি। অবশেষে এদেশের নাগরিকরাই সাহসী হয়ে ওঠে এবং দায়িত্ব পালন করে। সেই দায়িত্ব পালন করেছেন সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির ও শিক্ষাবিদ মুনতাসীর মামুন। যাদের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইনজীবী ও উচ্চ আদালত উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। অবশেষে কিছুটা হলেও রাজাকার নামকরণমুক্ত হলো। রায়ে খুলনার রাজাকার শিরোমণি খান এ সবুরের নামে সড়ক ও কুষ্টিয়ায় শাহ আজিজের নামে ছাত্রাবাসের নামকরণ বাতিল করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জানতে চাওয়া হয়েছে এই নামকরণের নেপথ্যে যারা জড়িত ছিল কেন তাদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে না। এই চাওয়াটা দেশবাসীরও। এরই পথ ধরে সারাদেশে এ রকম যত স্থাপনা, অবকাঠামো বা নিদর্শন রয়েছে তা দ্রুত অপসারণ হোকÑ জনগণ তাই চায়।