২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অবৈধ সাগর পথে মালয়েশিয়াগামী বহু যুবকের খোঁজ মেলেনি আজও

  • নিখোঁজ পাঁচ শতাধিক ;###;১২ শ’ জনের মৃত্যু ॥ ইউএনএইচসিআর;###;১২শ’ জনের মৃত্যু ॥ জাতিসংঘ

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার থেকে ॥ ভাগ্য গড়ার স্বপ্নে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে সাগর পথে যাত্রা করে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ১২শ’ লোক। মানবপাচারকারী চক্রের মিথ্যা প্রলোভনে পড়ে এরা সাগরে এবং বন্দীশিবিরে দালালের নির্যাতনে নির্মম মৃত্যুর শিকার হয়েছে। মালয়েশিয়াগামী বহু যুবকের খোঁজ নেই এখনও। জাতিসংঘ উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থার প্রকাশিত রিপোর্টে জাহাজ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় ডুবে মারা গেছে কেউ কেউ, অনেকে নিখোঁজ হয়েছে। জাতিসংঘ উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থার এপ্রিল- জুন প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এশিয়ার অভিবাসী সমস্যা পর্যবেক্ষণকারী মালয়েশিয়ায় অবস্থিত অঞ্চলভিত্তিক এনজিও ক্যারাম এশিয়া গত জুন মাসে অনুমান পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশী নিখোঁজ রয়েছে বলে জানিয়েছে। গত মে মাসে থাইল্যান্ড কর্তৃপক্ষ দেশটিতে অবৈধ অভিবাসিদের স্থান না দেয়ার সিদ্ধান্তে অভিযানে নামলে দালাল চক্র সাগরে ভাসমান জাহাজে মালয়েশিয়াগামীদের ওপর চরম অত্যাচার শুরু করে। থাইল্যান্ডের জঙ্গলে জাহাজভর্তি অভিবাসীদের ভিড়াতে না পেরে ক্ষোভে ফেটে পড়ে মানবপাচারকারী দালালরা। ওই সময় দালালচক্র নিজেদের রক্ষায় থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়া সাগরে লোকজন ভর্তি একাধিক ট্রলার ভাসমান অবস্থায় ফেলে সটকে পড়েছে। অনেকে বিকল জাহাজ নিয়ে কোন না কোন দেশের উপকূলে ভিড়তে পারলেও সলিলসমাধি ঘটেছে বহু লোকের। জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থা আরও বলেছে, মে মাসে সমুদ্রে ভাসমান থাকা প্রায় এক হাজার মানুষের কোন খবর পাওয়া যায়নি। সংস্থাটি মনে করছে, হয়ত ওই মানুষগুলো কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে সমুদ্রে ডুবে মারা গেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মানবপাচারকারীদের পরিত্যক্ত কিছু জাহাজ অভিবাসীসহ গভীর সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়া হলেও পরে অবশ্য ওই দেশগুলোর প্রশাসন প্রায় চার হাজার বাংলাদেশী এবং রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করেছে। উদ্ধার করা ওই বাংলাদেশীদের সরকার পর্যায়ক্রমে দেশে ফিরিয়ে আনছে। থাইল্যান্ড ছাড়াও মিয়ানমার উপকূলে উদ্ধার করা অভিবাসন প্রত্যাশীদের মধ্যে পাঁচ দফায় মিয়ানমার থেকে এ পর্যন্ত ৬২৬ জন বাংলাদেশীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডে উদ্ধার করা বাংলাদেশীদের স্বদেশে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক সংস্থার তথ্যে জানা যায়, গত ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময়ে প্রায় এক হাজার এক শ’ জনের বেশি বাংলাদেশী এবং রোহিঙ্গা মারা গেছে। এছাড়া চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত অনাহারে, পানি শূন্যতায়, রোগে এবং পাচারকারীদের নির্যাতনের শিকার হয়ে জাহাজ থেকে পালিয়ে সমুদ্রে ৭০ জনের মতো অভিবাসির মৃত্যু হয়েছে।

এদিকে মে মাসে থাইল্যান্ডের পাহাড়ে একাধিক গণকবরের সন্ধান লাভ ও অসংখ্য লাশ-কঙ্কালের দেহাবশেষ উদ্ধারের ঘটনায় সারা বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ সরকার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে দেশের প্রত্যেক থানার পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মানবপাচারকারী গ্রেফতার এবং অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাত্রা রোধে কড়া নির্দেশ দেয়। পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা তখন সাঁড়াশি অভিযানে নামে। কক্সবাজারে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় এক গডফাদারসহ ৬ দালাল। গ্রেফতার করা হয় অন্তত ৬০ দালালকে। উখিয়া সোনাইছড়ির শামসুল আলম সোহাগ নামে এক গডফাদারকে চট্টগ্রামে পুলিশ গ্রেফতার করলেও পুলিশের গাফেলতিমূলক রিপোর্টে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে গেছে শীর্ষ এ গডফাদার। কক্সবাজারে উখিয়াসহ বিভিন্ন স্থানের শীর্ষ মানব পাচারকারীরা বর্তমানেও অধরা থেকে গেছে। ওইসব শীর্ষ মানব পাচারীকারীর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা এবং গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি থাকলেও তারা বর্তমানে পুলিশের খাতায় পলাতক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল মানব পাচাররোধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণসহ কাঠোর কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য সকল আইনশৃঙ্খলারক্ষা বাহিনীকে নির্দেশ দিলেও উখিয়ায় এ নির্দেশ উপেক্ষিত। মানব পাচারের নিরাপদ পয়েন্ট হিসেবে কক্সবাজার সাগর চ্যানেল দিয়ে গত কয়েক বছরে হাজার হাজার লোক সাগর পথে মালয়েশিয়ায় পাচারের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রসা পড়ুয়া ছাত্র এবং কিশোররাও রক্ষা পায়নি দালালের খপ্পর থেকে। পুলিশ কিছু কিছু মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা টুকে দিলেও বেশির ভাগ গডফাদার এখনও অধরা রয়ে গেছে। যার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ঐ নির্দেশ আলোর মুখ দেখেনি।

জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থা তাদের রিপোর্ট আরও বলেছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত প্রায় ৯৪ হাজার উদ্বাস্তু বা অভিবাসী বাংলাদেশ বা মিয়ানমার ত্যাগ করেছে। তার মধ্যে চলতি বছরের গত ছয় মাসে ৩১ হাজার জন দেশ ত্যাগ করেছে। গত মে মাসের ২৯ তারিখে আঞ্চলিক দেশগুলো, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থাইল্যান্ডে মানবপাচার রোধের জন্য এবং এর মূল কারণ খুঁজে বের করার জন্য আলোচনায় মিলিত হয়েছিল। তবে জাতিসংঘের উদ্বাস্তু সংস্থা জানিয়েছে, একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনসহ সম্মেলনে গৃহীত বেশিরভাগ প্রস্তাব বাস্তবায়নের কাজ এখনও শুরু হয়নি।

আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে, গত কয়েক বছরের ব্যবধানে সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারীরা সাগর পথে মালয়েশিয়া মানব পাচার করে সুরম্য অট্টালিকা নির্মাণ, নামে বেনামে সহায় সম্পত্তি ও বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যাংকে জমা করেছে। পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মানব পাচারকারীদের অবৈধ সম্পদ জব্দ করে সরকারী কোষাগারে নেয়ার দাবি এখন গণদাবিতে পরিণত হয়েছে। মানব পাচারকারীরা পলাতক থাকলেও তাদের নিযুক্ত কিছু লোক তাদের অবৈধ সম্পদ দেখাশুনা করে পাচারকারীদের নিকট সঠিক সময়ে টাকা পাঠাচ্ছে। উক্ত টাকা দিয়ে পাচারকারীরা স্বচ্ছন্দে জীবনযাপন করে চলেছে। অপরদিকে স্বজনহারা পরিবারগুলোতে অসহায় স্ত্রী-সন্তানরা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে।

গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, ফয়েজ সিকদার, বেলাল মেম্বার, শামসুল আলম সোহাগ, নুরুল কবির, রেজিয়া আক্তার রেবি, ছানা উল্লাহ, আবুল কালাম ওরফে কালা কালাম, মাহাবুব আলম, কালা জমির, জালাল আহমদ, বেলাল ওরফে লাল বেলাল, বার্মাইয়া হাশেম মাঝি, রোস্তম আলী, কাউছার আহম্মদ জনি, আলমগীর হোসেন রানা ও হুমায়ুন রশিদ বাপ্পু এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় প্রশাসনের কাছে সংবাদ দেয়া লোকজনকে হুমকি দিয়ে চলেছে। ওই শীর্ষ মানব পাচারবারীদের ধরতে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে স্পেশাল টিম গঠনের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

নির্বাচিত সংবাদ