১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডিজিটাল ঢাকার এনালগ ট্রাফিক সিস্টেম

শর্মী চক্রবর্তী ॥ রাজধানী ঢাকার সড়কে এখনও ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায় চলছে গাড়ি। লাল-সবুজ আর হলুদ বাতিগুলো জ্বলুক আর না জ্বলুক গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হয় ট্রাফিক পুলিশের হাতের ইশারায়। ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্যে দেশ এগিয়ে গেলেও ট্রাফিক সিস্টেম এখনও এনালক পদ্ধতিতে চলছে। মানা হচ্ছে না কোন সিগন্যাল।

কয়েক দিন আগের কথা। সকাল নয়টা। মগবাজার মোড়। সিগন্যাল বাতি, টাইম কাউন্টডাউন যন্ত্র চলছে। সঙ্কেত বাতিতে লাল আলো জ্বলে থাকলেও এগিয়ে চলেছে গাড়ির সারি। আর এ গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে বৃষ্টির মধ্যেই ঘেমে ওঠেন ট্রাফিক পুলিশের সদস্য হাবিব।

শুধু মগবাজার মোড় নয়, রাজধানীর অধিকাংশ স্থানে এমন দৃশ্য প্রতিদিনের। কয়েক দিন ব্যস্ত সময়ে (সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা) রাজধানীর শাহবাগ, মালিবাগ, শিক্ষা ভবন ও জিরো পয়েন্ট মোড়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, লাল-হলুদ-সবুজ যে বাতিই জ্বলুক না কেন হাত উঁচিয়ে সঙ্কেত দিয়ে গাড়ি সামলাচ্ছেন রাস্তার মধ্যভাগে দাঁড়ানো ট্রাফিক সদস্যরা। গাড়িচালকরা লক্ষ্য করছেন কখন কাক্সিক্ষত সঙ্কেত আসবে। আর এ কারণে রাজধানীতে স্থাপিত সঙ্কেত বাতি কোন কাজেই আসছে না। এছাড়া বিভিন্ন সিগন্যালে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় যানবাহনগুলোর। বিশেষ করে ভিআইপি রোডের গাড়িগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সিগন্যাল ছাড়া হয়; কিন্তু অন্য লাইনের গাড়ি হলে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

ডিএমপির ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ থেকে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ২২ নবেম্বর পরীক্ষামূলকভাবে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক প্রকল্প শেষ হয় এবং রাস্তায় তা চালুও হয়। কিন্তু এখনও সেই পুরনো নিয়মেই চলছে রাজধানীতে ট্রাফিক ব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্টের আওতায় ২০০৫ সালে রাজধানীর ৫৯টি সড়কের মোড়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ শুরু হয়।

স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি স্থাপনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হলেও দু’বছরের মাথায় সব সিগন্যাল বাতি অকার্যকর হয়ে পড়ে। এছাড়া যানবাহনের চাপের ওপর ভিত্তি করে বাতি জ্বলা-নেভার সময় নির্ধারণ না করা, চালকদের সিগন্যাল বাতি মেনে চলায় অনীহা, বিদ্যুত না থাকাসহ নানা অজুহাতে তা মানা হচ্ছে না।

আইনটি চালুর সময় অমান্যকারী চালকদের জন্য এক হাজার টাকা জরিমানা, তিন মাসের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল এবং নকল লাইসেন্সধারী চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে বলে জানানো হয়েছিল।

সূত্র আরও জানায়, ২০০৫ সালে শুরু হওয়া স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক প্রকল্প শেষ হয় ২০০৯ সালের নবেম্বর মাসে। পিক-অফপিক সময় বিবেচনা করে বিভিন্ন রুটের ট্রাফিক সিগন্যালের সময়সূচী নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। সকাল, দুপুর এবং বিকেলে রাজধানীর একেক এলাকায় যানবাহনের চাপের ওপর নির্ভর করে ট্রাফিক সিগন্যালের সময় নির্ধারণ করা হয়।

২০১০ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ট্রাফিক আইন অমান্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন মোটরযানের চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে ৬০৩টি মামলা করেছে পুলিশ। এর মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে চালক-মালিকদের কাছ থেকে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা।

অভিযানে ট্রাফিক আইন অমান্য করার দায়ে ২১ জন চালকের লাইসেন্স তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়। গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় ২২টি গাড়ি জব্দ করা হয়। এর কিছুদিন পর সিগন্যাল অমান্যকারী চালকদের বিরুদ্ধে ই-ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তুলা হয়। এতে সিগন্যাল অমান্যকারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হলে মোবাইল ফোনে জানিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে এসবের কিছুই মানা হয় না।

এ বিষয়ে কাওরানবাজারের পান্থপথের সিগন্যালে কথা হয় আমির হোসেন নামে এক ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি জানান, রাস্তার মোড়ে এলে দেখি থামতে হলেও পুলিশ হাত দিয়ে ইশারা দেন, আবার চলতে হলেও হাতের ইশারা দেন। সিগন্যাল বাতি জ্বললেও সেটির দিকে কেউ নজর দেয় না। সিগন্যাল বাতি কার্যকর থাকলে যানজট অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি স্থাপনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হলেও বর্তমানে কয়েকটি স্থান বাদে রাজধানীর প্রায় সব সিগন্যাল বাতি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পুলিশ হাতের ইশারায় গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে বর্তমানে সিগন্যাল বাতি কার্যকর করার কোন পদক্ষেপ নেই।

ফার্মগেট, শেরাটন ক্রসিং, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনের সড়কের মোড়সহ দু’-একটি স্থানে লাল বাতি দেখে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করছে ট্রাফিক পুলিশ। বেশির ভাগ এলাকায় লাইটগুলো না থাকায় অধিক কষ্ট করে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে পুলিশ। যদিও সম্ভব হয়ে উঠেছে না। অথচ এ নিয়ে নেই কোন উদ্যোগ ট্রাফিক বিভাগের। বছরের পর বছর বিকল হয়ে আছে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল লাইটগুলো।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল লাইটের সার্বিকভাবে দেখাশোনার দায়িত্ব ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের। ঢাকা মহানগর উত্তরের কয়েকটি স্থানে সচল এবং দক্ষিণের প্রায় সব বিকল থাকলেও নামমাত্র লাল লাইট জ্বলছে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

এ বিষয়ে কাকরাইল সিগন্যালের দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল পদ্ধতি শত চেষ্টা করেও মানা সম্ভব নয়। বাসচালক, পথচারী কেউই এ পদ্ধতি মানছে না। যে রাস্তায় রিক্সা আছে, সেই রাস্তায় এটা আরও সম্ভব নয়। সিগন্যাল দেয়ার আগেই রিক্সা রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করে। একটা রিক্সাকে থামাতে গেলে ওই সুযোগে অন্য ৫টা রিক্সা চলে যায়। তাহলে সিগন্যাল মানাব কিভাবে। এ দেশে এটাই স্বাভাবিক। এখানে কেউ নিয়ম মানতে চায় না। শান্তিনগর মোড়, পল্টন মোড়, দৈনিক বাংলা মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও একই কথা বলেন।

তবে রাজধানীর কোন জায়গায় সিগন্যাল বাতি না মানা হলেও ক্যান্টনমেন্টে এই সিগন্যাল বাতির হিসেবে গাড়ি চলাচল করে। টাইমিং সিগন্যাল বাতি ব্যবহার করে সবাই; কেউ এই নিয়মের বাইরে যায় না। এতে সেখানে যানজটও কম থাকে।

সিগন্যাল বাতি চালু হওয়ার পর বেশ কয়েকবার অনেক আটঘাট বেঁধে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল পদ্ধতি মেনে চলার জন্য সচেতনতা সৃষ্টিসহ কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিলেও কিছুদিন পরই আবার তা শিথিল হয়ে যায়। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সিগন্যাল বাতি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তার উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত আশার আলো দেখেনি।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ট্রাফিক সিগন্যালগুলো সাইন্টিফিক হয়নি। তাই এটা আমরা চালু করতে পারছি না। এটা চালু করলে ঢাকা শহর পুরোটাই যানজটে স্থবির হয়ে যায়। ইতোমধ্যে আমরা তিন দিনের জন্য এটা চালু করে দেখেছি এতে রাজধানীতে যানজট আরও বেড়ে গিয়েছে। এখন যদি ঢাকার গাড়ির চাপ বুঝে এই সিগন্যাল আবার তৈরি করা হয়, তাহলে এই সিগন্যাল বাতি ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এ জন্য আমরা তাদের বলেছি এটিকে সাইন্টিফিক করে দেয়ার জন্য। অনেক সময় দেখা যায় লাল সিগন্যালে গাড়ির লম্বা লাইন। তাই রাস্তা সচল রাখার স্বার্থে আমরা সিগন্যাল বাতি ব্যবহার না করে হাতের ইশারায় গাড়ি ছাড়ি।

গত ১৭ মে রাজধানীর ১২টি মোড়ের সঙ্কেত বাতি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার পর শাহবাগ থেকে বনানী পর্যন্ত মূল সড়কটি প্রচ- যানজটে স্থবির হয়ে পড়ে। এরপর সঙ্কেত বাতি আর চালু করা হয়নি।

এগুলো চালু হলে যানজট বেড়ে যাবেÑ এ আশঙ্কায় পুলিশ আগেভাগেই চিন্তিত ছিলেন। আর এর ব্যবহারের পর তাদের চিন্তা সঠিক প্রমাণিত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, যানজটের সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে নিয়ম না মানার অভ্যাস। সিগন্যালের যন্ত্র তো যন্ত্রের মতোই কাজ করে। কিন্তু কার আগে কে যেতে পারেÑ সেটা নিয়ে সবার প্রতিযোগিতা। এছাড়া ভিভিআইপি, ভিআইপি আর সাংবাদিকদের গাড়ি সবচেয়ে বেশি সিগন্যাল বাতি অমান্য করে। ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ভেঙ্গে পড়ে। ডিসিসি ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয় করাসহ সবাইকে নিয়ম মানার পরামর্শ দেন তারা। সিগন্যাল বাতি কিংবা টাইমার কাউন্টডাউন পুরোপুরি চালু হলেও যানজট নিরসন সম্ভব নয়। তারা মনে করেন, এখনই পূর্ব-পশ্চিমে সড়ক তৈরি, মেট্রোরেল ও বাসের বিশেষ লেনের মতো গণপরিবহন চালু না করা গেলে, ঢাকার যানজট নিরসন হবে না।