২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রেম চিরন্তন ॥ আসে স্বর্গ হতে

  • বনলতা কি সোহাগে তরুরে জড়ায়...

আমি তোমাকে ভালবাসি- পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কথাটি সহজে কেউ বলতে পারে না! দীর্ঘ সময় লেগে যায়। শেষ পর্যন্ত বলা হয়। কখনও হয়ত বলা হয় না তবে হৃদয়ের গভীরে চিরন্তন লালিত হয়ে আজীবন রয়ে যায়। এরিক ফ্রমের প্রেমতত্ত্বের এই কথাটি রোমান্টিসিজম মানুষের চিরকালীন সত্তার প্রকৃত রূপ বহন করে। উদাহারণ দেয়া যায়- বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণ-তরুণী একে অপরকে খুবই পছন্দ করে। দু’জনার গ্রন্থিরসে (হরমোন) প্রণয়াসক্তির রসসুধা ঝর্ণাধারার মতো বইতে থাকে। এত কাছে তারা তবু যেন কত দূরে। ‘ভালবাসি’ কথাটি জিহ্বা অতিক্রম করে ঠোঁটের প্রান্তে এসেও বের হতে পারে না...! তিনটি শব্দের এই একটি বাক্য বলতে সময় নেয় দিন, মাস, হয়ত বছর, হয়ত যুগ। ভালবাসি কথাটি বলার জন্য প্রকৃতির কত উপমা, কত কাব্য, কত ছন্দ, কত গান... তবু কবিগুরুর ভাষায় সহজ কথা যায় না বলা সহজে, হৃদয় নিংড়ানো সবচেয়ে আবেগের কথাটি সহজে বলা যায় না। যখন বলা যায় তখনই প্রেমের মধুময়তার এক স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দেয়। স্বার্থকতা পায় স্বর্গ থেকে নেমে আসা প্রেমের। গভীর প্রণয়ের পর পরিণয়ের পালা শেষে বিশ্ব ভুবনকে আলোকিত করে মাতৃকোলে আসে শিশু। মাতৃদুগ্ধ পান করানোর সময় মা ও সন্তানের চাহনি নিবিড়ভাবে একে অপরের দিকে থাকে। তখন স্বর্গের সকল প্রেমময় সুধা নেমে আসে এই বসুধায়। মানবকুলের কাছে এই বিশ্বভুবনই তখন মা। সন্তানের প্রতি মায়ের মমত্বের ধারায় রচিত হয় মাতৃপ্রেম। এই প্রেমই সূচিত করে প্রকৃতির প্রতি এবং দেশের প্রতি প্রেম।

স্বর্গীয় এই প্রেম আসে নানাভাবে নানা বর্ণে। আপাত দৃষ্টিতে ‘প্রেম’ বলতে আমরা বুঝি কোন কপোত-কপোতীর প্রণয়। কথাটি গানের সুরে এসেছে এভাবেÑ ‘কপোতের বুকে ওই কত সুখে কপোতী ঘুমায় লীলাছলে বনলতা কি সোহাগে তরুরে জড়ায়...’ গানের কথায় প্রেমের সঙ্গে এসেছে প্রকৃতি। তারুণ্যের প্রণয়ের মতোই প্রকৃতির প্রেম, যে প্রেমকে আমরা কাছ থেকে দেখি। বুঝতে পারি না। অনুভবে যতটুকু বোঝা ততটুকুই। সকলের মধ্যে কি সেই অনুভূতি আছে? এ বিষয়ে প্যারাসেল সাস্ লিখেছেনÑ ‘যে জানে না কিছুই, সে ভালবাসে না কিছুই। যে কিছু করিতে অসমর্থ সে কিছু বুঝিতেও অসমর্থ। যে কিছুই বুঝিতে পারে না সে অপদার্থ। কিন্তু যে বোঝে, সে ভালবাসে নিরীক্ষণ করে দেখে...। যেখানে জ্ঞানের গভীরতা, ব্যক্তিত্বের মর্যাদা, হৃদয়ের গভীরে বুঝে ওঠার ক্ষমতা তথা একে অপরকে পড়ার (মনকে জানার কথাটিকে এখন পড়া বলা হয়) ক্ষমতা বেশি সেখানে ‘ভালবাসার’ মাত্রাও তত বেশি, যা হৃদয়ের প্রেম।’ নিরীক্ষণ করে দেখার অর্থ যদি হয় ভালবাসা বা প্রেমের মাপকাঠি দেখতে গভীরে প্রবেশ তাহলে এই কথাও বলা যায়, সত্যিকারের প্রেম খুব সহজে আসে না। যা শাশ্বত প্রেম তার পরীক্ষাও তত বেশি। কখনও নীরব প্রেম গভীরের অনন্ত প্রেম হয়ে যায়। মনীষীর এই কথা অঙ্কের মতো প্রমাণে একটি উদাহরণ (যৌক্তিক কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার)- দু’জন শিক্ষিত মানব-মানবী। দু’জনার চোখমুখে প্রগতির ধারা। লাবণ্য এ যুগের, অলক এই যুগকে সঙ্গে নিয়ে তারুণ্যদীপ্ত। জীবনের চলার পথের কোন এক বাঁকে দেখা হয় দু’জনার। অলক তাকিয়ে থাকে লাবণ্যের দিকে। মুগ্ধতায় পথচলা। লাবণ্যও শুরু করে নিরীক্ষণ। শুরু হয়ে যায় চোখে চোখে নীরব কথা। ব্যাকুলতায় ভরা মন। দেখা হয়, কথা হয়। কখনও নিবিড়ভাবে কোথাও বসে। এক টেবিলে জীবনের পেয়ালায় চা-কফিতে চুমুকের সঙ্গে জ্ঞানের গভীরতায় ডুবে গিয়ে ভয়ঙ্কর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে অলকের বিজয়ী ও লাবণ্যের অপরাজিতা হওয়ার লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হৃদয়ের অনন্ত গভীরে পৌঁছে যায় দু’জনই। তারপরের অঙ্কÑ একে অপরকে অনুভবে পাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতায় ভালবাসা ও ভাললাগার মাত্রা সমান্তরাল হয়ে চিরন্তনের পথে এগিয়ে যায়...। দু’জনার হৃদয়ের ডায়েরিতে লেখা হয় ‘দ্য ফাউন্ডেশন অব আওয়ার রিলেশন্স ইজ এটারনাল’ (আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি চিরন্তন)।

যুগে যুগে মানুষে মানুষের সকল প্রেম মধুছন্দেই এগিয়ে যায়। বিশ্বের দেশে দেশে ফাল্গুন মাসকে বসন্তের হাওয়ায় প্রেমের মধুময়তা দিয়েই বরণ করা হয়। প্রণয়ের মানব-মানবীরা একজন আরেকজনকে কাছে পেতে কতই না উদগ্রীব। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য ফুল দিয়েই প্রেমের শুভ্রতা তুলে ধরা হয়। প্রেমের এই উপাখ্যানে শারীরবৃত্তির ক্ষেত্রে এরিক ফ্রম লিখেছেনÑ প্রত্যেক নর-নারীর মধ্যে তাহার বিপরীত লিঙ্গের গ্রন্থিরস থাকে। মনোভূমিতেও নারী ও পুরুষের আদান ও বেধন দুই বিষয়েই ক্ষমতা ও তাহাদের মধ্যে জড়শক্তি ও চৈতন্যশক্তি আছে। কথাগুলো কঠিন তবে ভাবার্থ করলে সহজ।

দুই তরুণ-তরুণীর প্রেমপর্বÑ জুলফিকার রউফ ও রেজোয়ানা সাকী। মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। দু’জনার মনোভূমির গ্রন্থিরসের স্রোতধারায় জীবের মধ্যে জড়শক্তি ও চৈতন্যশক্তি একাকার হয়ে একে অপরের সম্পূরক হয়ে যায়। দু’জনার মনের আয়নায় একই ছবি। ছবিটি কথা কইতে থাকে সুরবিহীন হয়ে। এই কথাই প্রেমসুধায় সুর পেয়ে যায়। রোমান্টিসিজমে ওরা যখন নিরিবিলি যমুনায় মৃদু স্রোতে নৌকা করে যায় তখন প্রকৃতিও কাছে ডেকে নেয়। জুলফিকার ও সাকী নিজেকে জানে ও চেনে। সেই চেনা ও জানা কতটুকু অনুভবেই তার উত্তর মেলে। প্রেমের এই অনুভবতার মধ্যেই রয়েছে জাগতিক সকল প্রেম। বিজ্ঞানীদের কথায়Ñ সকল প্রেমেই আছে হরমোন। প্রত্যেক শিশু জন্মগ্রহণ করে এক শ’ বিলিয়ন নিউরণ নিয়ে, যা দিয়ে পরিপূর্ণতা পায় মেধা। তিন বছরে ৮০ শতাংশ, পাঁচ বছরে ৯০ শতাংশ ও আট বছরে ৯২ থেকে ৯৫ শতাংশ এবং বাকি জীবনে পাঁচ থেকে আট শতাংশ বিকশিত হয়। এই সময়কালে মা-বাবা ও স্বজনের সংস্পর্শে গ্রন্থিরসের স্রোতে শিশুমনে যা গেঁথে যায় তার প্রতিটি পর্বেই থাকে প্রেম। মানবিক এই প্রেম নিয়ে সে বড় হয়। তারপর হরমোন সিক্রেশনে প্রেমের প্রতিটি শাখা-প্রশাখায় সে বিচরণ করতে থাকে।

মনীষীগণের এসব তত্ত্বকথা ছাপিয়ে সহজে যা আসে তা হলোÑ মানব-মানবীর প্রণয় মধুময়তা যেমন স্বর্গীয় আবেগে উদ্ভাসিত তেমন-ই বিশ্ব ব্রহ্মা-ে প্রাণী-প্রকৃতিসহ যা কিছু আছে সবার মধ্যে থাকা প্রেম ধরণীকে বাসযোগ্য করেই এগিয়ে নিয়ে যায়। মানব জন্মের প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পরবর্তী অধ্যায়ে যা কিছু আছে তাই প্রেম। প্রকৃতিপ্রেম থেকেই চলে আসে দেশপ্রেম। এখানে একটি উদাহরণ দেয়া যায়Ñ যুদ্ধক্ষেত্রে এক সৈনিক শত্রুপক্ষের গোলার আঘাতে গুরুতর আহত হয়ে কোন রকমে আর্মি মেডিক্যাল ক্যাম্পে পৌঁছার পর অফিসার ছুটে গিয়ে তাকে জরুরী চিকিৎসাসেবা দিতে শুরু করেছে। তখন সৈনিকটি বলল, ‘স্যার আমার কিছুই হয়নি ওষুধ দেন সেরে ফিল্ডে যাব। মেজর স্যার গুরুতর আহত তার কমান্ড আরেকজনকে নিতে হবে। ওই সৈনিক তখনও বুঝতে পারছে না গোলার আঘাতে বিক্ষত পা কেটে ফেলতে হয়েছে। এমন দেশপ্রেম উৎসারিত হয় মানবপ্রেমের বন্ধনের বলয়ে। হৃদয়ের সকল প্রেমই চিরন্তন, যা আসে স্বর্গ হতে।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে