১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রকৃতিপ্রেমী শিল্পী আলমের স্বর্গদ্বীপ

প্রকৃতিকে ভালবাসুন, প্রকৃতি আপনাকে উজাড় করে দেবে। প্রকৃতির মাঝেই খুঁজে পাবেন স্বর্গসুখ। এমন ধারণা বুকে নিয়ে চিত্রশিল্পী শাহআলম গাঁয়ের ছোট্ট এক টুকরা জমির বুকে গড়ে তুলেছেন ‘স্বর্গদ্বীপ’। যেখানে গেলে দেখা মিলবে মাটি ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মেলবন্ধনের নানা প্রতীকী শিল্পকর্ম। দেখা মিলবে দ্বীপ-গাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্যের স্মারকচিহ্ন। রয়েছে রূদ্র প্রকৃতিকে জয় করে এ অঞ্চলের মানুষের টিকে থাকার প্রতিকৃতি। আছে সহজ-সরল জীবনধারণের বিভিন্ন উপকরণ। তিল তিল করে গড়ে তোলা এ স্বর্গদ্বীপ এলাকার অনেকের কাছে এখন গর্বের ঠিকানা। তারা এটিকে ‘প্রকৃতির জাদুঘর’ বলে মনে করেন।

গাঁয়ের নাম তক্তাবুনিয়া। বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে অবস্থান। পটুয়াখালীর উত্তাল আগুনমুখা নদী পাড়ি দিয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলার বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রান্তের প্রত্যন্ত এ গাঁয়ে পেঁৗঁছতে কম করে হলেও ৭/৮ ঘণ্টা সময়ের প্রয়োজন।

পুরো নাম শাহআলম হাওলাদার হলেও এ নামে তাকে এলাকার কেউই চেনে না। সবার কাছে শিল্পী আলম নামেই পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে বেরুনো সহপাঠীরা যেখানে শহুরে জীবন বেছে নিয়েছে, সেখানে আলম ফিরে এসেছেন মাটি ও প্রকৃতির কাছে। কথায় কথায় জানালেন, ‘বড়বাইশদিয়ার এ মাটি আমার মা। প্রকৃতি আমার শিক্ষক। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে লাঙল নিয়ে ক্ষেতে গিয়েছি। ধান লাগিয়েছি। মানুষের অভাব-অনটন, অশিক্ষা-কুশিক্ষা দেখে বড় হয়েছি। প্রকৃতির রূদ্ররোষে মানুষের অসহায়ত্ব দেখেছি। তখন থেকেই মনের গভীরে এই মাটি আর প্রকৃতি স্থান করে নিয়েছে। তাই তো মাটির টানে ফিরে এসেছি গাঁয়ে।’

২০০০ সালে তক্তাবুনিয়া গ্রামে বাবার রেখে যাওয়া ৩৫ শতাংশ জমির বুকে নিজের স্বপ্নের এ স্বর্গদ্বীপ গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। অর্থাভাবে এখনও অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তারপরও শিল্পী আলমের ছোট এ পৃথিবীতে এরই মধ্যে স্থান পেয়েছে চর-দ্বীপের মানুষ ও প্রকৃতির দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানা বিমূর্ত শিল্পকর্ম। বাঁশের ছোট্ট দরজা পেরিয়ে স্বর্গদ্বীপের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত এবড়ো-থেবড়ো ইট দিয়ে বানানো শিল্পকর্ম। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আলম বলেন, ‘ক্ষুধার্ত জনসংখ্যার ভারে প্রকৃতি তার স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলছে। পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ ভোগ করছে গুটিকয়েক মানুষ। বাকিরা সবাই অভাবী। প্রতিদিন বাড়ছে বঞ্চিতদের সংখ্যা। ওরা ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। বরং একে অন্যকে জড়িয়ে কেবল সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে।’

স্বর্গদ্বীপের ভেতরে এমন অনেক শিল্পকর্মের পাশাপাশি আছে ঝাঁকিজাল, লাঙল-জোয়াল, ছনের ছাউনি দেয়া তক্তার পাটাতনের ছোট্ট ঘর, ঢেঁকি, বঁড়শি, কাঠের নৌকা, বৈঠা, কলাগাছের ভেলা, নৌকার মাস্তুল, গরুর গাড়ির চাকা, কাপড় বোনার চরকা, পাটের শিকা, গোবরের ঘুটেসহ এক সময়ের দ্বীপজীবনের নানা উপকরণ, যার অনেক কিছু এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

শিল্পী আলম দ্বীপাঞ্চলের প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত বানর, কাঠবিড়ালী, খরগোশ, শূকর, টিয়া, বক, তিতমোরগ, বনমোরগ, দেশী হাঁস, রাজহাঁস, ডাহুক, শালিকসহ বহু প্রাণী এনে লালনপালন করে আবার তা বনে ছেড়ে দিচ্ছেন। ফিরে পাওয়া যাবে না এমন প্রাণীদের অবয়ব কাঠ দিয়ে তৈরি করে সংরক্ষণ করছেন। দ্বীপাঞ্চল থেকে বিলুপ্ত লক্ষ্মীবিলাস, সাক্ষরকোড়া, কালিজিরা, দুধকলম, মোথামোটা, সাদামোটা, কালাফোড়া, ডিঙ্গামণি, আইট্টা, ঘড়ি, কলাবতী, বিন্নি, ফুলমতিসহ ৩৩ প্রজাতির ধান সংরক্ষণ করেছেন। আরও বিলুপ্তপ্রায় ধান সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। বিষমুক্ত শাকসবজি উৎপাদনের জন্য এক টুকরা জমিতে গড়ে তুলেছেন খামার।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে শিল্পী আলম বলেন, ‘স্বর্গদ্বীপকে শিশুদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চাই। কারণ আজকের শিশুরাই আগামীতে গড়ে তুলবে নিরাপদ পৃথিবী। তাই তারা যাতে প্রকৃতিপ্রেমিক হয়ে গড়ে ওঠে, এর প্রাথমিক পাঠ এখান থেকে শুরু করতে চাই।

Ñশংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে