২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর কে কোথায় জানে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

শংকর কুমার দে ॥ বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের পুরস্কার ঘোষিত ভয়ঙ্কর সেই ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে এখন কে কোথায়? দীর্ঘ ১৪ বছর আগে ২০০১ সালে তাদের নামে অপরাধ জগতে বাঘে-মোষে এক ঘাটে পানি খেত। বাধ্য হয়ে তাদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে তখনকার বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। দীর্ঘ ১৪ বছর পর এসে পুরস্কার ঘোষিত এই ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর কে কোথায় আছে তা এখনও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অজানা। শীর্ষ সন্ত্রাসীদের কারও কারও নামে এখনও ফোনে চাঁদা দাবি করা হলেও বাস্তবে তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিএনপি-জামায়াত সরকারের শাসনামলের সেই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের খোঁজখবর নেয়া হয় এখনও। যখনই সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করা হয় তখনই তাদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু কাজীর গরু কেতাবে আছে, বাস্তবে নেই, এমন প্রবাদের মতোই পুরস্কার ঘোষিত সেই ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর হদিস মিলছে না। বিদেশে পলাতক অবস্থায় শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে খুন, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো দীর্ঘ ১৪ বছরেও থামেনি। এ কারণে আগের পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে ২০০১ সালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। অপারেশন ক্লিনহার্ট, র‌্যাব গঠন, ক্রসফায়ারের প্রচলন ইত্যাদির ধারাবাহিকতায় আসে শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা তৈরির কাজটি। এই প্রক্রিয়ায়ই জোট সরকার ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা তৈরি করে। বিগত ১৪ বছরে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কে কোথায় আছে তার সঠিক চিত্র তুলে ধরার জন্যই তাদের খোঁজ নেয়া হয় বলে জানা গেছে।

পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর মধ্যে ২ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে পিচ্চি হান্নান খুন হয়েছে ক্রসফায়ারে। আর আলাউদ্দিন নিহত হয়েছে গণপিটুনিতে। লিয়াকতের কোন হদিস নেই। তার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেছে তাকে। তারপর থেকেই তার আর কোন খোঁজখবর নেই। কালা জাহাঙ্গীর কি মারা গেছে নাকি বেঁচে আছে সেই ব্যাপারে কেউ কোন হদিস দিতে পারছে না।

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে পুরস্কার ঘোষণার পর দেশের ভেতরে গ্রেফতার হয়েছে পিচ্চি হেলাল, টিটন, ফ্রিডম সোহেল, খোরশেদ আলম ওরফে রাশু, কামাল পাশা ওরফে পাশা, মশিউর রহমান কচি, আব্বাস ওরফে কিলার আব্বাস। কারান্তরালেই জীবন কাটছে তাদের। বহু মামলার মধ্যে কোন কোন মামলায় জামিন হয়েছে, আবার কোন কোন মামলায় জামিন হয়নি এখনও, জামিনের চেষ্টা করা হচ্ছে এর মধ্যে জামিনে বের হয়ে গেছে প্রকাশ নামের এক শীর্ষ সন্ত্রাসী। জামিনে বের হয়ে সে ভারতে চলে গেছে। ভারতের মাটিতে গ্রেফতার হয়েছে ত্রিমতি সুব্রত বাইন। ভারত থেকে পালিয়ে নেপালে যাওয়ার সময় নেপাল পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।

পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে আমিন রসুল সাগর অবস্থান করছে আমেরিকায়। কানাডায় অবস্থান করছে ইমাম হোসেন। প্রকাশ কুমার বিশ্বাস অবস্থান করছে কলকাতায়। মোল্লা মাসুদ কলকাতায় অবস্থান করছে। শামিম আহমেদও অবস্থান করছে কলকাতায়। হারিস আহমেদ অবস্থান করছে পাকিস্তানে। তানভিরুল ইসলাম জয় অবস্থান করছে কলকাতায়। জাব্বার মুন্না, জাফর আহমেদ কোথায় অবস্থান করছে সেই ব্যাপারে কারও কাছে কোন তথ্য নেই।

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয় নগদ টাকা। বিগত ১৪ বছর পরও কেউ নগদ টাকা পুরস্কার পায়নি। চারদলীয় জোট সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ পুরস্কার হিসেবে নগদ টাকা দাবিদার হয়েছিল। কিন্তু কাউকেই এই পুরস্কার দেয়া হয়নি। দীর্ঘদিনের পুরনো শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকাটি নিয়ে মাঝেমধ্যেই জটিলতা দেখা দেয় বলে জানা গেছে।

১৪ বছর আগে ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে জোট সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব) আলতাফ হোসেন চৌধুরী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করার পর বলেছিলেন আরও ১৯ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করা হবে। ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামের তালিকা প্রকাশ করা হলেও পরবর্তীতে চাপের মুখে আর ১৯ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করেননি চারদলীয় জোট সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী।

’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন চারদলীয় জোট সরকারের ঘোষিত ২৩ ও অঘোষিত ১৯ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম একত্রিত করে ৪২ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামের তালিকাটি প্রকাশ করেন জাতীয় সংসদে।

পুলিশের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, জোট সরকার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষনা করার পর ১৪ বছর পার হয়ে গেছে। গত ১৪ বছরে সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকেই পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সবার নাম জানেনই না। এমনকি পুরস্কার ঘোষিত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পুলিশের নাকের ডগায় ঘুরে বেড়ালেও তারা চিনতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন নাম পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক পুলিশ কর্মকর্তাই।