২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মামলা তুলে না নেয়ায় গাছে বেঁধে গৃহবধূকে নির্যাতন

  • মুমূর্ষু অবস্থায় দিনাজপুর মেডিক্যালে ভর্তি

স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর ॥ থানা থেকে মামলা তুলে না নেয়ায় চিরিরবন্দরে এক গৃহবধূকে গাছের সঙ্গে বেঁধে শারীরিক নির্যাতন ও শ্লীলতাহানি করা হয়েছে। নির্যাতনের ফলে তাঁর শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নির্যাতিতা গৃহবধূ রেহেনা বেগম (২৩) চিরিরবন্দরের ৬নং আউলিয়াপুকুর ইউনিয়নের গালতৈড় কাঁচলডাঙ্গা গ্রামের এনামুল হকের মেয়ে। এর আগে গত ১০ জুলাই রেহেনা নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। ওই নির্যাতনের জন্য মামলা দায়ের করলেও পুলিশের উদাসীন ভূমিকার কারণে তাকে দ্বিতীয় দফা নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ মানবাধিকার কর্মীসহ সংশ্লিষ্টদের।

রেহেনা বেগমের আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ডিসেম্বরে রেহেনা বেগমকে একই গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে ওহেদুল ইসলাম কুপ্রস্তাব দেয়। রেহেনা তা প্রত্যাখ্যান করলে অন্য মেয়ের (ভারতীয়) অশ্লীল ছবি তার বলে এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া হয়। এই ঘটনায় গত ৩ জানুয়ারি সালিশের নামে আউলিয়াপুকুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার জামাল উদ্দিন ও আবুবক্কর সিদ্দিক তার পরিবারকে একঘরে করে রাখার ফতোয়া জারি করে। একঘরে করে রাখার ফতোয়া চলাকালীন ওই সালিশের বিরুদ্ধে কথা বলায়, গত ১০ জুলাই জুমার নামাজ পড়ে বাড়ি ফেরার পথে আবুবক্কর সিদ্দিকের হুকুমে তার তিন ছেলে রাশেদুল, সহিদুল ও ওহেদুলসহ ৬-৭ জন এনামুল হককে ধরে নিয়ে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে দুই পা ভেঙ্গে দেয়। এ সময় মেয়ে রেহেনা বেগম ও তার জামাই হোসেন আলী উদ্ধার করতে এলে তাদের বেদম মারপিট করা হয়। এ সময় রেহেনা বেগম তিন ঘণ্টা অজ্ঞান অবস্থায় সেখানে পড়ে থাকেন। জামাই হোসেন আলীরও পা ভেঙ্গে দেয় তারা।

এ বিষয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ ঘটনায় গত ২৭ জুলাই রেহেনা বেগমের পিতা এনামুল হক বাদী হয়ে নয়জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর থেকেই মামলা তুলে নেয়ার জন্য আসামিরা রেহেনা বেগম ও তার পরিবারকে হুমকি দিয়ে আসছিল। এই ঘটনার জের ধরেই শুক্রবার সন্ধ্যায় রেহেনা বেগমকে ধরে নিয়ে গিয়ে তিনজন নির্যাতন ও শ্লীলতাহানি করে।

দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গাইনী ওয়ার্ডের বি-৯নং বেডে শুয়ে থাকা রেহেনা বেগম বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি পার্শ্ববর্তী ভাইয়ের বাড়ি থেকে মোবাইল ফোন চার্জ দিয়ে বাড়িতে আসার পথে আবুবকর সিদ্দিকের ছেলে সহিদুল মাস্টার, মকবুল হোসেনের ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম ও মৃত খয়ের উদ্দিনের ছেলে রকিবুল ইসলাম তাকে আটক করে। এরপর তাকে একটি পুকুরের পাড়ে আমগাছে বাঁধে তারা। এরপর তারা তাঁকে উপর্যুপরি মারধর করে। এরপর তাঁর শরীরের কাপড়চোপড় ছিঁড়ে তিনজন ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। এ সময় তিনি চিৎকার দিলে তার মুখে কাপড় গুজে দেয়া হয়। উপর্যুপরি মারধরের পরে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে একটি সাদা কাগজে সই নিয়ে তারা মোটর সাইকেলযোগে পালিয়ে যায়। প্রচ- আঘাতের ফলে রেহেনা বেগম জ্ঞান হারিয়ে ফেললে, গ্রামের লোকজন দেখতে পেয়ে তার পরিবারকে খবর দেয়। গ্রামবাসী তাকে রাতেই দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে।

দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের গাইনী ওয়ার্ডের চিকিৎসক ডাঃ সীমা বসাক জানান, রোগীর বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করা হয়েছে ও সেসব স্থানে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। মারাত্মক আঘাতের ফলে তার শরীরে ব্যথা ও জ্বর এসেছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

রেহেনার পিতা এনামুল হক জানান, এর আগে তাদের মারধর ও মিথ্যা অপবাদ দিয়ে একঘরে করে রাখার বিরুদ্ধে চিরিরবন্দর থানায় মামলা করা হয়েছিল। কিন্তু ওসি তিন লাখ টাকার বিনিময়ে মামলার আরজি বদলে দেন। তিনি আসামিদের পক্ষ নিয়ে তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আসছিলেন। বিভিন্ন সমস্যায় পড়লেও ওসি তাদের কোন সহযোগিতা করেননি বলে তিনি জানান।

হাসপাতালে রেহেনাকে দেখতে আসা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ দিনাজপুর জেলা শাখার সভাপতি কানিজ রহমান জানান, উৎকোচের মাধ্যমে টাকা নিয়ে পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকার কারণে রেহেনাকে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। আমরা এর আগেও রেহেনা বেগমের বিষয়টিতে সুদৃষ্টি দেয়ার জন্য পুলিশের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। এরপরও এই ধরনের নির্যাতন, যার জন্য পুলিশই দায়ী। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান। না হলে রাস্তায় নামার ঘোষণা দেন।

এ ব্যাপারে চিরিরবন্দর থানার ওসি আনিছুর রহমান জানান, ঘটনা জানার পর রাতেই অভিযুক্তদের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। তবে কাউকেই পাওয়া যায়নি। তাদের পাওয়ামাত্রই গ্রেফতার করা হবে। এ ব্যাপারে রেহেনা বেগমের স্বামী হোসেন আলী বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে ওসি বলেন, এর আগের মামলাটির আসামিদের আটক করা হয়েছিল। কিন্তু তারা আদালতের মাধ্যমে জামিনে রয়েছেন। সেখানে পুলিশের কোন কিছু করার নেই। তবে নতুন এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

লক্ষ্মীপুরে ছাত্রী নির্যাতনকারীদের গ্রেফতার ॥ নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, লক্ষ্মীপুরে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী কামরুন নাহার সুমীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে ব্লেড দিয়ে কেটে ক্ষতবিক্ষতকারী সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেফতার দাবিতে মানববন্ধন করেছে শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। শনিবার দুপুরে হাসনাবাদ মহিলা দাখিল মাদ্রাসার সামনে এ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ঘণ্টাব্যাপী এ মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আ হ ম মোশতাকুর রহমান, দত্তপাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের উপাধ্যক্ষ নুরুল আলম বুলবুল, সমাজসেবী রফিকুল হায়দার চৌধুরী, অভিভাবক সদস্য মাওলানা তাফাজ্জল হক, ইউপি সদস্য আবুল কাশেম প-িত, নির্যাতিত ছাত্রীর পিতা নুরুল আমিন কামাল প্রমুখ। বক্তারা ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

গত বৃহস্পতিবার মাদ্রাসা যাওয়ার পথে কামরুন নাহার সুমীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে ব্লেড দিয়ে হাত-পা কেটে ক্ষতবিক্ষত করে সন্ত্রাসীরা। সুমী হাসনাবাদ দারুল উলুম মহিলা মাদ্রাসার ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী।

লক্ষ্মীপুর সদর থানার ওসি মোঃ গিয়াস উদ্দিন মিয়া জানান, এ ঘটনায় ছাত্রীর মা পারুল বেগম বাদী হয়ে ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করছেন। এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অপর আসামিদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।

নির্বাচিত সংবাদ