২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিদেশী বিনিয়োগ বেড়ে ছয় দশমিক ৯১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে

  • বিশ্ব পুঁজিবাজারে পতন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না

অপূর্ব কুমার ॥ দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ আগের তুলনায় বাড়ছেই। পাঁচ বছরের ব্যবধানে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগ ১ দশমিক ৫১ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৯১ শতাংশ। বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়লেও সাম্প্রতিককালে চীনসহ অন্য দেশে ধসের কারণে বাংলাদেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কম। কারণ বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ক্রমশ কমলেও বাংলাদেশে তেলের দাম কমেনি। উল্টো গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। ফলে বাজারে তালিকাভুক্ত তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার দরে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা কম। এছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মান আগের তুলনায় কিছুটা শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বাইরের অর্থনীতির ধাক্কা দেশের বাজারে লাগবে না।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ ওয়ালিউল মারুফ মতিন বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, টোকিওসহ বিভিন্ন বাজারের ধস আমাদের দেশে কোন নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি। গত এক মাস আগে গ্রীসের অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময়েও বাংলাদেশের বাজার ভাল অবস্থানে ছিল। এর আগে ভারতের পুঁজিবাজারের টানা পতনও বাংলাদেশকে প্রভাবিত করতে পারেনি। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণ ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে। এখানে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করলেও বিনিয়োগ প্রত্যাহারের আশঙ্কা কম থাকে। যার কারণে বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক সঙ্কটের কোন সমস্যা থাকে না। আর বাংলাদেশের ডলারে বিনিয়োগের পরিমাণও কম। একই সঙ্গে টাকার অবস্থানও ডলারের বিপরীতে ভাল তাই। বিশ্বের পুঁজিবাজারের পতন বাংলাদেশে কোন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করেন মারুফ মতিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বিশ্ব বাজারের পতনে বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কারণ আমাদের পুুঁজিবাজার বিশ্ব বাজার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। আমাদের বাজারে এখন এতটা তেজিভাব নেই। বাজার এখন স্থিতিশীল আচরণ করছে। চীনের বাজারের পতন প্রত্যাশিত ছিল। যদিও সরকার বাজারকে টিকিয়ে রাখতে প্রচেষ্টা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাজার ধরে রাখতে পারেনি। চীনের অর্থনীতির সঙ্গে বাজার সামঞ্জস্যহীন হয়ে উঠেছিল। ফলে ধস নেমেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে পুঁজিবাজার সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই বাইরের ধাক্কা লাগবে না। এমনকি ভারতের বাজারও এখন অতিমূল্যায়িত সেখানে যে কোন সময় মূল্য সংশোধন আসতে পারে। এতে ভীত হওয়ার কিছু নেই। আমাদের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী এবং বিনিয়োগযোগ্য।

ডিএসই থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ২০১০ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসে বড় পতনের পরে থেকেই আস্তে আস্তে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়তে থাকে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ২০১০ সালের ধসের পর থেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের মালিকানা পৃথক থেকে ব্যবস্থাপনা পর্ষদ পৃথককরণসহ (ডিমিউচুয়ালাইজেশন) নিজস্ব সার্ভিলেন্স সফটওয়্যার চালু এবং কারসাজি চক্রের বিচার করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল চালুসহ বেশ কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়। এছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতির সব সূচক ইতিবাচক থাকার কারণেও বিদেশী বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে প্রতি আকৃষ্ট হয়। এছাড়া পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো, বার্জার পেইন্টস, বাটা স্যু, ম্যারিকো, গ্লাক্সোমিথক্লাইন, রেনেটা, রেকিট বেনকিজার, হিডেলবার্গ সিমেন্ট ও লাফার্জ সুরমা সিমেন্টের প্রবৃদ্ধি প্রতি বছরই বাড়ছে। এই কারণেই বিদেশীরা বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠে। সব মিলে দেশের পুঁজিবাজার সম্পর্কে আগের তুলনায় বিদেশীদের কৌতূহল কয়েকগুণ বেড়েছে। যার কারণে নিজ দেশের বড় ধরনের সঙ্কট ছাড়া পুঁজিবাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই। এছাড়া অর্ধবার্ষিকীতে তালিকাভুক্ত দুই তৃতীয়াংশ ব্যাংকের আগের তুলনায় মুনাফা বেড়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে।

বিশ্ব বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত এক মাসে টোকিওর নিক্কি সূচক কমেছে ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ, সাংহাই সূচক কমেছে ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ, হংকং সূচক কমেছে ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ, ভারতের সেনসেক্স কমেছে ৬ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং করাচী সূচক কমেছে ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। অর্থাৎ এশিয়া প্যাসিফিক দেশগুলোর সব সূচকই কমেছে। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডো-জোন্স সূচক এক মাসে কমেছে ৫ দশমিক ৯২ শতাংশ ও ন্যাসডাক কম্পোজিট সূচক কমেছে ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

গত এক মাসের বিশ্বের সব বাজারেই সূচক কমেছে। কিন্তু বিপরীত ছিল বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। প্রধান বাজার ডিএসইর সার্বিক সূচক ডিএসইএক্স বা সার্বিক সূচক গত ২ আগস্ট ছিল ৪ হাজার ৮শ’ পয়েন্টে। ২৭ আগস্ট পর্র্যন্ত উত্থান-পতন শেষে ডিএসইর সার্বিক সূচকটির অবস্থান দাঁড়ায় ৪ হাজার ৮শ’ ১২ পয়েন্ট। অর্থাৎ বাংলাদেশের পুুঁজিবাজার ছিল উর্ধমুখী। এতেই বোঝা যায়, বিদেশী বাজারের নেতিবাচক প্রবণতা বাংলাদেশে পড়বে না।

অন্যদিকে সম্প্রতি মোটামুটি চীনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা মন্থর হয়ে গেছে। এটি ভবিষ্যতে আরও কিছুদিন চলতে পারে বাজার সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। উপরন্তু গত জুনের মধ্যভাগে চীনের পুঁজিবাজারের সাংহাই কম্পোজিট সূচক এক বছরের মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। ঋণ করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ফলে এমনটি ঘটে। কিন্তু যখন বাজারে পতন শুরু হয় তখন অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। বিশেষ করে ঋণ পরিশোধের জন্য শেয়ার বিক্রি শুরু হলে বাজারের পতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। পুঁজিবাজারে কোম্পানির শেয়ারের দর কমে যাওয়ার পেছনে প্রায়ই কোন না কোন ঘটনা কাজ করত। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু করার থাকলেও তারা কোন কিছুই করেনি। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বেশি পরিমাণে অর্থ ঋণ নেয়ার সুযোগ করে দিতে কোন পদক্ষেপ নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানা গেছে, কম দরের শেয়ারের ওপর সরাসরি অর্থায়নের তেমন বড় ধরনের প্রভাব নেই চীনে। চীনের পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগের পরিমাণও খুব বেশি নয়, যাতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের মতে, চীনের পুঁজিবাজারে মাত্র ২ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগ রয়েছে।

তবে সবচেয়ে যে ইস্যুটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তা হচ্ছে চীনের মুদ্রার অবমূল্যায়ন। দেশটির অর্থনীতিতে মন্থর গতি দেখা দেয়ায় চলতি আগস্ট মাসে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক দু’দফায় ডলারের বিপরীতে প্রায় ৩ শতাংশ দর কমানো হয় ইয়েনের। দর কমানোর ফলে চীনের আর্থিক বাজারে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে গত সোমবার বিশ্বের সবগুলো স্টক এক্সচেঞ্জে বড় ধরনের পতনের কারণে কালো সোমবার (ব্লাক সানডে) ঘোষণা করা হয়। এরপরে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমিয়ে দেয়। ফলে পুঁজিবাজারে কিছুটা আশার আলো দেখা দেয়। একই সঙ্গে ভারতে বাজারে একদিনে ১ হাজার ৬২৪ পয়েন্ট কমে যাওয়ার পরদিনই সূচক ঘুঁরে দাঁড়ায়। পাকিস্তানের স্টক এক্সচেঞ্জেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আর বাংলাদেশের বাজারেও সূচক উর্ধমুখী।