২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমুদ্র সম্পদের অধিকাংশই থাকছে অব্যবহৃত

  • সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির অভাব

মোখলেছুর রহমান, নিজস্ব সংবাদদাতা, পটুয়াখালী ॥ পটুয়াখালীর উপকূল সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের যে বিশাল সমুদ্র এলাকা রয়েছে এতে আছে মৎস্য সম্পদসহ নানা ধরনের সামুদ্রিক সম্পদের সম্ভাবনা। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির অভাব ও বছরের অধিকাংশ সময়ে সাগর উত্তাল থাকা এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্র এলাকা থেকে কাক্সিক্ষত মৎস্য সম্পদ আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে অব্যবহৃত থাকছে বিশাল এই মৎস্য ভা-ার।

বঙ্গোপসাগরে মৎস্য ভা-ার কিংবা অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে সর্বশেষ জরিপ চালানো হয় ১৯৯০ সালে ‘ফাও’ এর সহায়তায়। ওই গবেষণার সূত্র বলছে, বঙ্গোপসাগরে ৭০ প্রজাতির বাণিজ্যিক গুরুত্বপূর্ণ মাছ ও ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি রয়েছে। আর এসব মাছ ও চিংড়ি ধরার জন্য সরকারী হিসাবে দেশে সমুদ্রগামী ১৭০টি ট্রলার ছাড়া আছে প্রায় ৫০ হাজার মাছধরা ট্রলার ও নৌকা। এগুলো মূলত গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করে। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার গবেষণায় অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের ২২ শতাংশ আসে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ থেকে। আর ১৪ লাখ মৎস্যজীবী সরাসরি মৎস্য আহরণে জড়িত। তাছাড়া বর্তমানে জিডিপির বড় একটি অংশ আসে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদ থেকে। লাইসেন্সধারী ট্রলারগুলো ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত মাছ আহরণের অনুমতি থাকলেও সেগুলো ১০০ মিটারের বেশি যায় না। যার ফলে বেশি মৎস্য আহরণ ও সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে সমুদ্রের অফুরন্ত সম্ভাবনার কথা বলে প্রতিদিন হাজার হাজার টন সামুদ্রিক মাছ আহরণ করা হচ্ছে। সমুদ্র এলাকায় ঘুড়ে বেড়াচ্ছে হাজারো বৈধ অবৈধ ফিসিং বোড। এসব ফিসিং বোর্ড নিয়ন্ত্রণে সরকারের নেই তেমন কোন উদ্যোগ। বছরে কি পরিমাণ সামুদ্রিক মাছ আহরণ করা হচ্ছে তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই বললেই চলে।

তবে সরকারী হিসাবে পটুয়াখালী জেলার প্রায় ৪২ হাজার জেলে সরাসরি সাগরে মাছ শিকারের সঙ্গে জড়িত। আর বেসরকারী হিসেবে এর সংখ্যা আরও কয়েকগুণ। এছাড়া জাল তৈরি, নৌকা তৈরি, বরফ কল, মাছ পরিবহনসহ সার্বিক কাজে আরও কয়েক লাখ মানুষ এর সঙ্গে জড়িত। তবে এই মৎস্য খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকয় যে কোন সময়ে এই কয়েক লাখ পরিবারের রুটি রুজির ওপর হুমকি আসতে পারে। ফলে বিপর্য়যের মুখে পড়তে হতে পারে দেশের মৎস্য শিল্পকে।

উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে মৎস্য খাতে নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য নির্দিষ্ট সময় পর পর সমুদ্র এলাকায় মৎস্য সম্পদের শুমারি করা হয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে সর্বশেষ জরিপ ১৯৯০ সালের পর আর কোন জরিপ চালানো হয়নি। ফলে বর্তমানে কি পরিমাণ সম্পদ আছে, আর কি পরিমাণে ট্রলার সমুদ্রে মাছ শিকার করতে যাচ্ছে তা অনির্ধারিতই থেকে যাচ্ছে। এদিকে যেসব ট্রলার সাগরে মাছ শিকারে যাচ্ছে তাদের অধিকাংশরই নেই প্রয়োজনীয় সরকারী অনুমোদন কিংবা লাইসেন্স। এ ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা তৈরি ও লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া সহজ করলে সবাইকেই নিবন্ধনের আওতায় আনা সম্ভব বলেও মনে করেন জেলেরা।

অপরদিকে পটুয়াখালীর মহিপুর তথা আলিপুর মৎস্য বন্দরে উপকূলীয় এলাকার সিংহভাগ মাছ বিক্রি ও রফতানির কাজ সম্পাদিত হয়ে থাকে। কিন্তু কোন নিয়মনীতি ছাড়াই এই বন্দরে নিজেদের মতো করে মাছ বেচা বিক্রি করায় অনেক ক্ষেত্রেই সরকার মাছের বাজারে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এর ফলে মাছের ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হবার পাশাপাশি জেলেরা মহাজনদের কাছে দাদনের জালেও বন্দী হচ্ছেন।

এছাড়া স্থানীয় মহাজনরা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মাছ কেনা বেচা করায় মৎস্য ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ হারানোর পাশাপাশি বছরের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মহিপুর-আলীপুর মৎস্য বন্দরকে পূর্ণাঙ্গ মৎস্য বন্দর হিসেবে ঘোষণা দিয়ে একটি ফিশ ল্যান্ডিং স্টেশন করলে অনেক ক্ষেত্রেই মৎস্য সেক্টরে সরকার তার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কোটি কোটি টাকার রাজস্ব অর্জনে সামর্থ্য হবে।

এ বিষয়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ডীন ড. লোকমান আলী বলেন, ‘বর্তমান সময়ে সরকার যে গ্রীন ইকোনমির কথা বলছেন, তা বাস্তবায়ন করতে আমাদের সমুদ্র সম্পদের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এর পাশাপাশি সমুদ্র এলাকায় জেলেদের জন্য যেমন নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে তেমনি জেলেদের মাছ শিকারে আরও নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। এতে করে কম বিনিয়োগে অধিক পরিমাণ মৎস্য সম্পদ আহরণ করা সম্ভব হবে। আর এই প্রক্রিয়ায় দেশে বর্তমানে সমুদ্র এলাকা থেকে যে পরিমাণ মাছ আহরণ করা হয় এটি দ্বিগুণ করা সম্ভব হবে।