১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মানিলন্ডারিং শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক সমস্যা

  • সেমিনারে বক্তাদের অভিমত

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ বর্তমান সময়ে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন শুধুমাত্র কোন একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। এর মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে দেশে টাকা ঢুকে পড়ে ও বাইরেও পাচার হচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা সচেতন ভাবে প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ করলেই মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ করা সম্ভব। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রধান মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তাদের (ক্যামেলকো) সম্মেলনে বক্তারা একথা বলেন। শনিবার বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমিতে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএসআইইউ) এই সম্মেলনের আয়োজন করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গবর্নর ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এর প্রধান আবু হেনা মোহাঃ রাজী হাসান। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এবং বিএফআইইউ’র সহকারী প্রধান ম. মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিস এক্সচেঞ্জ কমিশনার মোঃ আমজাদ হোসেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান বিচারপতি ছিদ্দিকুর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির প্রিন্সিপাল কেএম জামশেদুজ্জামান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার বালা। শুরুতেই শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক ও বিএফআইইউ’র অপারেশনাল হেড মোঃ নাসিরুজ্জামান। রাজী হাসান বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির অগ্রগামিতার সঙ্গে সঙ্গে অপরাধী ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের অবৈধ কার্যক্রমের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিবেচনায় দেখা যায় যে, স্বল্পোন্নত বা নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশসমূহের কৌশলগত বা সিস্টেমগত দুর্বলতা এবং উদার অর্থনীতির সুযোগ নিয়ে অবৈধভাবে প্রাপ্ত অর্থ লন্ডারিংয়ের উদ্দেশে অতি সহজেই বিদেশী বিনিয়োগ হিসেবে দেশে বিনিয়োগের সুযোগ্য বিভিন্ন সংবেদনশীল সেক্টরসমূহে ঢুকে পড়ে। আবার দ্রুততম সময়ের মধ্যে অতি সহজেই এ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যায়।

এসব অর্থ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কোনরূপ ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে না বলেই মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ করা একান্ত প্রয়োজন বলে জানান ডেপুটি গবর্নর। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বিএফআইইউ দেশের কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। বিএফআইইউ রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা থেকে প্রাপ্ত রিপোর্ট পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ, সংরক্ষণ এবং বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তথ্যাদি প্রেরণ করে থাকে।

বিভিন্ন সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হতে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করাও বিএফআইইউ এর অন্যতম দায়িত্ব। উপস্থিত পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের উর্ধতন কর্মকর্তাবৃন্দের উদ্দেশে তিনি বলেন, গত কয়েক বৎসরে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে বাংলাদেশের আইনী ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু আইন প্রণয়ন বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উন্নয়নই শেষ কথা নয়। আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরী।

আইন প্রয়োগে বা বাস্তবায়নে রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মানদ- প্রণয়নকারী সংস্থা ফাইন্যান্সিয়াল এ্যাকশন টাস্কফোর্সয়ের প্রণীত ৪০ (চল্লিশ)টি নির্দেশনার আলোকে দেশসমূহকে নিজ নিজ অঞ্চলে মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হয়। ম্যানুপুলেটরেরা ও কিছু কিছু কোম্পানির অসৎ মালিক অথবা কর্মকর্তাগণ কোম্পানির সংবেদনশীল তথ্য কাজে লাগিয়ে বিপুল পরিমাণের অবৈধ অর্থের মালিক হয়ে যায় উল্লেখ করে রাজী হাসান বলেন, এই অর্থ রাষ্ট্র, সমাজ তথা ক্যাপিটাল মার্কেটের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে। গ্রাহকের পেশার বিবরণ বিস্তারিতভাবে গ্রহণ না করা ও অর্থের উৎস নিশ্চিত না হয়ে পুঁজি বাজারে বিনিয়োগ এর সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া মানিলন্ডারিং হতে পারে যা এ মার্কেটের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনার আমজাদ হোসেন বলেন, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে বিএফআইইউ’র নানা রকম উদ্যোগের ফলে আরও বেশি চতুর হচ্ছে মানিলন্ডারিংকারীরা। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে করতে আপনাদের আরও বেশি সচেতন হবে। এজন্য মার্কেট ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ করতে হবে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আইনের যথাযথ প্রয়োগই পারে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ করতে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ট্রেনিং একাডেমির অধ্যক্ষ কেএম জামশেদউজ্জামান বলেন, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে যেসব আইন আছে। তার যথাযথ প্রয়োগ করাই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ড. স্বপন কুমার বালা বলেন, মানিলন্ডারিং আইন না মানলে শুধু অর্থ পাচারই হবে না। নানা রকম বিপদেও পড়তে হবে। বিপদ থেকে বাঁচতে আপনাদের সচেতন হতে হবে। সকলের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক বাড়লেই এটি সম্ভব। স্বাগত বক্তব্যে বিএফআইইউ মহাব্যবস্থাপক নাসিরুজ্জামান বলেন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে বিএফআইইউ’র নির্দেশনা, পরিপত্র যথাযথভাবে পালন করতে হবে। মানিলন্ডারিং তদন্তকালে ঝুঁকি আসবে। তা নিরূপণে আপনাদেরই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও বিএফআইইউ’র উপ-প্রধান ম. মাহফুজুর রহমান বলেন, বিএফআইইউ যত আইন ও নির্দেশনাই জারি করুক। আপনারা সচেতনভাবে তার প্রযোগ না করলে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সম্ভব না। দিনব্যাপী সম্মেলনে পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্ট ১৬০টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০০ কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেন।

নির্বাচিত সংবাদ