২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক কোন্ দিকে

  • এ কে মোহাম্মাদ আলী শিকদার

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নয়নের আরেকটি উদ্যোগ সম্প্রতি ব্যর্থ হয়ে গেল। দু’দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের জন্য ২৪ আগস্ট নির্ধারিত দিল্লী বৈঠকটি মাত্র ১২ ঘণ্টা আগে পাকিস্তান কর্তৃক পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এর জন্য উভয় দেশ একে অপরকে দোষারোপ করছে। ১৯৪৭ সালে যখন দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে উপমহাদেশ দ্বিখ-িত হয়, তখন থেকে বিগত ৬৮ বছর ধরে ভারত-পাকিস্তান চিরবৈরী প্রতিবেশী হিসেবে অবস্থান করছে। তখন উপমহাদেশের সব রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরম ব্যর্থতার কারণে ভারতবর্ষের প্রায় অর্ধশত কোটি হিন্দু-মুসলমানের মনে চিরশত্রুতার বীজ রোপিত হয় এই ধারণায় যে, হিন্দু ও মুসলমান আলাদা জাতি, এরা একসঙ্গে এক রাষ্ট্রে বসবাস করতে পারবে না। সাতচল্লিশের দেশভাগ ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ককে প্রধানত তিনিটি কারণে চিরশত্রুতায় পরিণত করেছে। এক. দেশভাগের ফলে হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের প্রায় দেড় কোটি মানুষ শত শত বছরের ভিটেমাটি ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়। এর ফলে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের মনে যে ভয়ানক ক্ষতের সৃষ্টি হয়, সেটি এখনও প্রবাহিত হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। দুই. ১৯৪৮ সালে হঠাৎ অপ্রত্যাশিত যুদ্ধে মুসলমানপ্রধান অঞ্চল কাশ্মীর দুই ভাগ হয়ে যায়। একটি অংশ পাকিস্তানের দখলে, অন্য অংশ জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের দখলে চলে আসে। সেই থেকে পুরো কাশ্মীর পাকিস্তান দাবি করে আসছে আর ভারত বলছে, কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিন. ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরাসরি সহায়তা করায় প্রতিশোধপরায়ণ স্পৃহায় পাকিস্তান ভারত ও বাংলাদেশ উভয়কে এখন শত্রু রাষ্ট্র মনে করছে। গত ৬৮ বছরে ভারতের গণতান্ত্রিক সরকারের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু কোন উদ্যোগই সফল হয়নি। বলা হয়ে থাকে, ১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশের চেয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারত অনেক বেশি চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল, প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পাকিস্তানের সামরিক শাসকগণ ভারতের সঙ্গে শত্রুতার সম্পর্ককে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বে থাকার অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করেছে। ভারত পাকিস্তানের চিরশত্রু, এটিকে পাকিস্তানের বিদেশনীতির মূল দর্শন হিসেবে প্রবর্তন করেন প্রথম সামরিক শাসক আইয়ুব খান, যা এখনও বহাল আছে।

এই মন্ত্রের মূল কথা হলোÑ হিন্দু ভারতের আক্রমণ থেকে ইসলাম ও পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য সামরিকবাহিনীই একমাত্র রক্ষাকর্তা। জেনারেল জিয়াউল হকের মৃত্যুর পর দু’বার ক্ষমতায় আসা প্রয়াত বেনজীর ভুট্টো এবং বর্তমান মেয়াদ নিয়ে তিনবার ক্ষমতায় আসা নওয়াজ শরিফ, দু’জনই প্রতিবার ক্ষমতায় এসে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য আন্তরিক পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবার ব্যর্থ হয়েছেন দু’জনেই। শুধু ব্যর্থ নয়, বেনজীরকে দু’বার এবং নওয়াজ শরিফকেও দু’বার মেয়াদপূর্তির অনেক আগে মোল্লাদের সহায়তায় সামরিকবাহিনী ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচানা একটু পরে।

নওয়াজ শরিফ এখন তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী। পূর্বে দু’বারের অভিজ্ঞতাকে স্মরণে রেখে এবার তিনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটা ভারসাম্যমূলক অবস্থান বজায় রেখে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পথে হাঁটার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ইতোমধ্যে তিনটি উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে গেল। সম্প্রতি রাশিয়ার উফা শহরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফাঁকে নওয়াজ শরিফ ও নরেন্দ্র মোদি আলাদাভাবে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টাদ্বয় দিল্লীতে আলোচনায় বসবেন এবং উগ্র জঙ্গীবাদ দমনে করণীয় সম্পর্কে মত বিনিময় করবেন। কিন্তু সভাটি হলো না, যা লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছি। এর আগে ২০১৪ সালের আগস্ট মাসে দু’দেশের পররাষ্ট্র সচিবদের নির্ধারিত বৈঠকটিও বাতিল হয়ে যায়। কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী দলের নেতাদের মর্যাদা প্রসঙ্গে দু’দেশের মতপার্থক্যের কারণে উপরোক্ত দুটি আলোচনা শেষ মুহূর্তে এসে বাতিল হয়। গত বছরের মে মাসে নরেন্দ্র মোদির শপথ অনুষ্ঠানে নওয়াজ শরিফের উপস্থিতিতে দু’দেশের বন্ধ দুয়ার খোলার একটা আশা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তার পর পরই কাশ্মীর সীমান্তে ভারতীয় সেনা ফাঁড়ির ওপর আক্রমণ চালিয়ে ভারতীয় দু’জন সৈনিকের মাথা কেটে নিয়ে যেতে সক্ষম হয় পাকিস্তানী সেনারা। সেটি আবার মিডিয়ায় প্রদর্শন করে স্থানীয় পাকিস্তানী সেনা কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে পাকিস্তানে প্রশিক্ষিত মুজাহিদ বাহিনী কাশ্মীরের অভ্যন্তরে ঢুকে নাশকতামূলক তৎপরতা বৃদ্ধি করে। ভারতীয় সেনারাও পাল্টা জবাব দেয়। পাকিস্তানের পক্ষেও হতাহতের ঘটনা ঘটে। আলোচনার সমস্ত পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। এই ঘটনার বিরূপ প্রভাব পড়ে গত বছরের নবেম্বরে কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের ওপর।

উপরোক্ত ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নওয়াজ শরিফ ও বেনজীর ভুট্টো যতবারই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছেন, ততবারই পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং প্রবল পরাক্রমশালী গোয়েন্দা সংস্থা সেটিকে পেছন থেকে ছুরি মেরে নস্যাত করে দিয়েছে। একটু আগে উল্লিখিত সূত্র ধরে এ সম্পর্কে আরও দুটি বড় ঘটনার উদাহরণ দিই। ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে বেনজীর ভুট্টো প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর পরই ইসলামাবাদে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। দুই প্রধানমন্ত্রীই নতুন প্রজন্মের এবং তারুণ্যের উদ্দীপনায় উৎসাহিত। তারা পার্টিশনের বিভীষিকা দেখেননি এবং দু’জনই দু’দেশকে উন্নত ও আধুনিক রাষ্ট্র বানাতে চান। সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে রাজীব ও বেনজীর আলাদাভাবে আলোচনায় বসেন এবং তাতে অনেক দুর্ভেদ্য ইস্যুতে বরফ গলার আশাবাদ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সর্বনাশে মেতে ওঠে পাকিস্তানের উগ্র ইসলামপন্থীরা এবং তাতে ইন্ধন যোগায় সেনাবাহিনী।

ইসলামাবাদে বেনজীর ও রাজীব গান্ধীর শীর্ষ বৈঠকের দিন পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সরদার আব্দুল কাইয়ুম শীর্ষ বৈঠকের অদূরে কয়েক লাখ মাদ্রাসা ছাত্রের সমাবেশ ঘটান এবং ভয়ানক জঙ্গী মিছিল বের করেন। মিছিল থেকে সেøাগান দেয়া হয়Ñ বেনজীর বিশ্বাসঘাতক, ভারতের কাছে কাশ্মীর বিক্রি করে দিয়েছে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টোর অজ্ঞাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে কয়েক হাজার প্রশিক্ষিত মুজাহিদ ঢুকিয়ে দেয়। মুজাহিদরা কাশ্মীরের অভ্যন্তরে গেরিলাযুদ্ধ শুরু করে। কাশ্মীর আবার ভয়ানক অশান্ত হয়ে ওঠে। বেনজীর ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ১৯৯০ সালের শুরুতে পাকিস্তান-ভারত সম্পর্ক আবার চলে যায় তলানিতে।

১৯৯৯ সালে আবার একবার নতুন উদ্যোগ দেখা যায়। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী আর নওয়াজ শরিফ দ্বিতীয়বার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। এবারও শ্রীলঙ্কায় সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে দুই প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে মিলিত হন এবং সীমান্তে উত্তেজনা কমানো ও সম্পর্ক উন্নয়নে একমত হন। দু’দেশের মধ্যে প্যাসেঞ্জার বাস চলাচলের সিদ্ধান্ত হয় ওই বৈঠকে। শুভেচ্ছা ও সদিচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী প্রথম বাসে চড়ে লাহোরে যান। নওয়াজ শরিফ বাজপেয়ীকে উষ্ণ অভিনন্দন ও স্বাগত জানান। কিন্তু পূর্বের মতো এবারও পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও ইসলামপন্থী দলগুলো নাখোশ হয় এবং শুরু করে ষড়যন্ত্র। পাকিস্তানের জামায়াত-ই-ইসলাম রাস্তায় মিছিল সমাবেশ করে এবং বাজপেয়ীর বাসের যাত্রা পথ বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেয়। জামায়াত ভারতীয় নেতাকে জাতীয় শত্রু হিসেবে অবিহিত করে। দুই নেতার শীর্ষ সভার দিন জামায়াত লাহারে হরতালের ডাক দেয়। বাজপেয়ী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা করে ফিরে যান। কিন্তু আর কিছু এগোয় না। শান্তি আলোচনা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ কিছুই জানতেন না।

১৯৯৯ সালের গ্রীষ্মকালে দুই দেশ স্থানীয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যেটি এখন কারগিল যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই কারগিল যুদ্ধের জের ধরে পরবর্তীতে নওয়াজ শরিফ ক্ষমতাচ্যুত হন এবং ক্ষমতা দখল করেন কারগিল যুদ্ধের প্রধান হোতা ও তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশারফ। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিনির্ধারণে, বিশেষ করে ভারত বিষয়ক যে কোন বিষয়ে সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই সব সময় শেষ কথা বলে। আইএসআইয়ের ওপর পাকিস্তানের কোন বেসামরিক সরকার আজ পর্যন্ত কখনও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। মোশারফের বিদায়ের পর নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হয়ে আসা আসিফ আলী জারদারি (বেনজীরের স্বামী) এই মর্মে প্রজ্ঞাপন জারি করেন যে, এখন থেকে আইএসআই সরাসরি প্রেসিডেন্টের সচিবালয়ের অধীনে কাজ করবে। কিন্তু মাত্র সাত দিনের মাথায় আসিফ আলী জারদারি নীরবে ওই প্রজ্ঞাপন বাতিল করতে বাধ্য হন। এবার নওয়াজ শরিফ তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়ে ঘোষণা দেন, সেনাবাহিনী বেসামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণে ও অধীনে কাজ করবে। দেখা গেল, নওয়াজ শরিফ শপথ নেয়ার ছয় মাসের মাথায় কট্টরপন্থী ইমরান খানের তেহরিক-ই-পাকিস্তান ইসলামাবাদে বিশাল সমাবেশ করে তুচ্ছ অজুহাতে নওয়াজ শরিফের পদত্যাগ দাবি করেন এবং পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অনবরত বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এমতাবস্থায় নওয়াজ শরিফ সেনা সদরে গিয়ে সেনাপ্রধান রাহিল শরিফের সঙ্গে দেখা করার পর সবকিছু শান্ত হয়ে যায়।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী ইসলামিস্ট ও একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধপরায়ণ স্পৃহায় উদ্বুদ্ধ সেনাবাহিনী পাকিস্তানের জনগণকে বিভ্রান্ত করার অতিরিক্ত সুযোগ পাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের অভ্যন্তরে উগ্রবাদী হিন্দুত্ববাদের উত্থানের কারণে। ভারতে প্রায় ১৮ কোটি মুসলমানের বাস। ১৯৭৯-১৯৮৯ সময়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জিহাদে অংশ নেয়ার জন্য বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে মুসলমানরা পাকিস্তান-আফগানিস্তান যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভারতীয় কোন মুসলমান ওই জিহাদে যোগ দিয়েছে এই মর্মে কোন খবর এখনও পাওয়া যায়নি। সাতচল্লিশের পর ভারতের অভ্যন্তরেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। তবে উগ্র জঙ্গীবাদ কখনও জায়গা পায়নি। কিন্তু ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে উগ্র হিন্দুবাদী গোষ্ঠী ঐতিহাসিক বাবরী মসজিদ ধ্বংসের পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গী সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা, হরকত-উল-মুজাহেদীন, হরকত-উল-জিহাদ (হুজি), জঈশ-ই-মুহম্মদ এবং আরও কিছু জঙ্গী সংগঠন ভারতের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ার সুযোগ পায় এবং তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে ভারতীয় মুসলমান যুবকরা। ১৯৯৩ সালে মুম্বাইয়ে ভয়াবহ বোমা হামলা চালায় জঙ্গীরা, মারা যায় ২৩৫ জন নিরীহ মানুষ। ২০০১ সালের ডিসেম্বর মাসে লস্কর-ই-তৈয়বার দ্বারা দিল্লীতে ভারতের পার্লামেন্ট ভবন আক্রান্ত হয়। ২০০৮ সালের শেষের দিকে লস্কর-ই-তৈয়বা ভয়াবহ হামলা চালায় মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে। এতে ১৬৬ জন প্রাণ হারায়। ২০০২ সালের গুজরাটে দাঙ্গায় প্রায় এক হাজার মুসলমানকে হত্যা করে উগ্রবাদী হিন্দুরা। ১৯৯২ সালে বাবরী মসজিদ ধ্বংস এবং ২০০২ সালে গুজরাটের দাঙ্গার বিরূপ প্রভাব পড়ে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে।

ভারতের অভ্যন্তরে সংঘটিত উপরোক্ত ঘটনাবলী ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নয়নে এখন ভয়ানক অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। দ্বিতীয়ত, কাশ্মীর সমস্যার সমাধান ভারত এ পর্যন্ত করতে পারেনি। কাশ্মীর সমস্যা জিইয়ে রেখে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের দ্বার উন্মোচন করা কঠিন। তবে এ কথা ঠিক, সাতচল্লিশের পর থেকে এ পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে বহু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু ভারত পাকিস্তানের চিরশত্রু, এই অভিধা থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং মোল্লাতন্ত্র বের হতে পারছে না বিধায় সকল উদ্যোগ অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে। ধর্মের অপব্যবহারে জন্য পাকিস্তান ভেঙ্গে গেল, বিপুল সম্ভাবনাময় একটি রাষ্ট্র এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তার পরেও ধর্মীয় উন্মাদনা শেষ হচ্ছে না, কোন পক্ষেরই হুঁশ ফিরছে না। পাকিস্তান উগ্র ধর্মীয়বাদ ও একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধপরায়ণ স্পৃহা থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত এবং ভারতের অভ্যন্তরে উগ্র হিন্দুত্ববাদের উত্থান ও আস্ফালন ঠেকাতে না পারলে, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের উন্নয়ন সুদূরপরাহত হয়ে থাকবে। এর বিরূপ প্রভাব পড়বে সমগ্র উপমহাদেশে।

লেখক : ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক