২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একে একে উদ্ঘাটিত হচ্ছে ব্লগার হত্যা রহস্য

  • নীলাদ্রি হত্যায় গ্রেফতার চার

গাফফার খান চৌধুরী ॥ একে একে ব্লগার হত্যার রহস্য উদঘাটিত হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যেই নীলাদ্রি হত্যায় গ্রেফতারকৃত ৪ জনের মধ্যে একজনকে প্রত্যক্ষদর্শীরা শনাক্ত করেছেন। গ্রেফতারকৃতদের অনেককেই টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাদের কাছে অভিজিত, নীলাদ্রি, ওয়াশিকুর রহমান বাবু ও সিলেটে অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার বিষয়ে জানতে চাওয়া হবে।

পবিত্র ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর লেখালেখির কারণেই ব্লগার হত্যার ঘটনা ঘটে বলে এখন পর্যন্ত তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। যে কয়েকজন ব্লগার খুন হয়েছে তাদের সবাইকে হত্যার আগে মুরতাদ ঘোষণা করা হয়েছিল। হত্যার সঙ্গে স্বাধীনতাবিরোধী, উগ্র মৌলবাদী ও জঙ্গী গোষ্ঠীগুলো নানাভাবে জড়িত। হত্যাকা-ে জড়িতরা নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। প্রসঙ্গত, গত ৭ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে রাজাধানীর খিলগাঁও থানাধীন পূর্ব গোড়ানের ৮ নম্বর সড়কের ১৬৭ নম্বরের পাঁচতলা বাড়ির পঞ্চমতলার পূর্বদিকের নিজ বাসায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় ব্লগার নীলাদ্রি চ্যাটার্জী নিলয়কে।

গত ২৭ আগস্ট রাতে রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ কাউছার হোসাইন খান (২৯) ও শ্যামপুর থানাধীন দলিপাড়া থেকে কামাল হোসেন সর্দারকে (২৯) গ্রেফতার করে। তাদের ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ডিবি সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পরপরই নিলয়ের স্ত্রী আশা মনি ও শ্যালিকা তন্বীর জবানবন্দী নেয়া হয়। জবানবন্দীতে চার খুনীর চেহারা ও আকার-আকৃতি সর্ম্পকে ধারণা পাওয়া যায়।

ডিবি সূত্র বলছে, সেই ধারণার সূত্র ধরেই গত ১৩ আগস্ট সাদ আল নাহিন ও মাসুদ রানাকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের ৮ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। নাহিন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব) আব্দুল মতিনের ভাতিজা। নাহিন উত্তরায় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিন হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার হয়ে আদালতে নিজেকে নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য পরিচয় দিয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। শনিবার ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, নীলাদ্রি হত্যায় গ্রেফতারকৃত ৪ জনের মধ্যে একজনকে প্রত্যক্ষদর্শীরা শনাক্ত করেছে। তদন্তের স্বার্থে তিনি শনাক্ত হওয়া ওই আসামির নাম প্রকাশ করেননি। নীলাদ্রি হত্যায় গ্রেফতারকৃতদের শনাক্ত করতে টিআই প্যারেডের জন্য আদালতের অনুমতি চাওয়া হবে। আদালত অনুমতি দিলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দিয়ে আসামিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হবে। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শীরা আসামিদের দেখতে পারলেও আসামিরা শনাক্তকারীদের দেখতে পারবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যক্ষদর্শীরা হত্যাকা-ে যে চারজন অংশ নিয়েছিল তাদের মধ্যে নাহিন ছিল বলে দাবি করেছেন। তবে ডিবি পুলিশ বলছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একজনকে শনাক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও নাহিনকে শনাক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেননি ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম। তিনি আরও জানান, নীলাদ্রি ও লেখক অভিজিত রায় হত্যা মামলার আসামিদের কাউকে কাউকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য টিএফআই সেলে পাঠানো হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ব্লগার হত্যার নেপথ্য কারণ অনেক গভীরে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে অনেক অজানা তথ্য। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদ- হয়। কাদের মোল্লাসহ সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের সৃষ্টি হয়। সেই মঞ্চে যোগ দেন মুক্তমনা, প্রগতিশীল লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পক্ষের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ। যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে এত মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘটনায় স্বাধীনতাবিরোধী ও জঙ্গী সংগঠনগুলো নিজেদের অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ার আশঙ্কা করে। এমন পরিস্থিতিতে সারাদেশে ভীতি সঞ্চার করতেই ব্লগার হত্যা শুরু করে।

তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরায় ব্লগার আসিফ মহিউদ্দিনকে হত্যাচেষ্টা হয়। এ মামলায় ৬ জনকে আসামি করে চার্জশীট দেয়া হয়েছে। এরপর ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক প্রকৌশলী আহমেদ রাজীব হায়দার শোভনকে ঢাকার পলœবী থানাধীন পলাশনগরের ৫৬/৩ নম্বর নিজ বাড়ির সামনেই ছুরিকাঘাতে ও জবাই করে হত্যা করা হয়। রাজীব হত্যায় রাজধানীর বনানীস্থ বেসরকারী নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দ্বীপ (২২), এহসান রেজা ওরফে রম্মন (২৩), মাকসুদুল হাসান ওরফে অনিক (২৩), নাঈম শিকদার ওরফে ইরাদ (১৯), নাফিজ ইমতিয়াজ (২২) ও সাদমান ইয়াছির মাহমুদ (২০) গ্রেফতার হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে প্রথম ৫ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়। রাজীব হত্যা মামলায় রেদোয়ানুল আজাদ রানা (৩০) পলাতক। ৭ ছাত্র ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের জঙ্গী নেতা মুফতি জসীমউদ্দিন রাহমানিকে আসামি করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করে ডিবি।

এরপর ২০১৩ সালের ৯ মে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা ও ব্লগার আরিফ রায়হান দ্বীপকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হল থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে বুয়েটেরই আরেক ছাত্র মেজবাহ উদ্দিন। পরবর্তীতে মেজবাহ আদালতে ইমানী দায়িত্ব পালন করতেই হত্যাকা-টি ঘটিয়েছে বলে জবানবন্দী দেন।

চলতি বছরের ৩০ মার্চ রাজধানীর রমনা মডেল থানাধীন হাতিরঝিল বেগুনবাড়িতে দিনের বেলায় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যার পর পালানোর সময় দুই মাদ্রাসার ছাত্র আরিফুল ইসলাম ও জিরুল্লাহ এবং পরে সাইফুল ইসলাম গ্রেফতার হয়। আরও দুইজন পলাতক। গ্রেফতারকৃতরা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে সাইফুল ইমানী দায়িত্ব পালন করতেই বাবুকে হত্যা করেছে বলে আদালতে স্বীকার করে।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় রাত ৯টায় দুই যুবক চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে লেখক অভিজিত রায়কে হত্যা করে। বাধা দিতে গিয়ে আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। এ হত্যা মামলায় ছাত্র শিবির ও নিষিদ্ধ হিযবুত তাহরীরের সাবেক সক্রিয় কর্মী বর্তমানে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য শফিউর রহমান ফারাবী গ্রেফতার হয়। এছাড়া গত ১৭ আগস্ট র‌্যাব সাদেক আলী মিঠুৃ ওরফে সাদিক (২৮), তৌহিদুর রহমান (৫৮) ও মোঃ আমিনুল মল্লিক (৩৫) নামে তিনজনকে গ্রেফতার করে।

এদিকে গত ১২ মে সিলেটের সুবিদবাজারে ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪ জন গ্রেফতার হয়েছে। প্রথমে গ্রেফতার হয় ইদ্রিস আলী। এরপর সিলেট থেকে মান্নান ইয়াহিয়া (২৪) ও মোহাইমিন নোমান (২১) গ্রেফতার হয়। তাদের ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানান, এখন পর্যন্ত ব্লগার হত্যায় যারা গ্রেফতার হয়েছে তারা সবাই আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ইতোপূর্বে ব্লগার হত্যায় গ্রেফতার হয়ে অনেকেই আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দী দিয়েছে। তারা ইমানী দায়িত্ব পালন করতেই হত্যাকা- ঘটিয়েছে বলে জানিয়েছে। তাদের সবার জবানবন্দী একই। তাই স্বাভাবিক কারণেই ব্লগার হত্যার সঙ্গে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম জড়িত বলে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ব্লগার খুন হওয়ার আগে ও পরে অনেকেই হামলার শিকার হয়েছেন। অনেককেই হত্যার জন্য হামলাও করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে এবং নিরাপত্তার কারণে তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। হেফাজতে ইসলামের দেয়া ৮৪ জন ব্লগারের বাইরেও অনেকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।