২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিচ্ছিন্নতাবাদের বিনাশে-

বিশ্ব মানচিত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করলে ঝাপসা হয়ে আসে চোখ। কোথাও না কোথাও বারুদের ধোঁয়া আর অস্ত্রের ঝনৎকার বাজে। কর্ণকুহরে তালা লাগিয়েও যেন শব্দ দূরীভূত হয় না। সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গীবাদের মূল উৎস বিচ্ছিন্নতাবাদের পুরনো ধারাটি এখনও সক্রিয় রয়ে গেছে দেশ-মহাদেশে। চোখ যদি আরও অবলোকন করি তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদের আলামতও দৃশ্যগ্রাহ্য হয়। আরও পর্যবেক্ষণে উপমহাদেশের পরিস্থিতিটাও আসে নজরে। বিচ্ছিন্নতাবাদের কখনও কখনও বিস্তার ঘটে মহামারীর মতো। এখনও অস্ত্র উৎপাদক, সরবরাহক, বাজারজাতকারীরা সচেষ্ট তাদের উপকরণের বিশাল বাজার তৈরিতে। আর সেজন্য অস্ত্রের উপযোগিতা তৈরি করা হয়। গণমাধ্যমজুড়ে এসবেরই প্রতিধ্বনি নির্গত হয়।

বিচ্ছিন্নতাবাদ সন্ত্রাসকে প্রাধান্য দিয়ে আসছে। প্রতিবেশী ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদ একদিকে হ্রাস পেলেও আরেকদিকে চাগাড় দেয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের ৫টি রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদের মারাত্মক অবস্থা দীর্ঘ সময় বিরাজ করছিল। ত্রিপুরা, মনিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, অসমজুড়ে অস্ত্র-বারুদের খেলায় কত যে প্রাণ হরণ হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কত সম্পদহানি, কত ঘরবাড়ি উজাড় হয়েছে তার হিসাব রাখে না কেউ। পাহাড়, নদী রক্তে ভেসেছে। অসমের উলফাদের অস্তিত্ব এখনও সশব্দিত। তাদের একটি অংশ এখনও সশস্ত্র। ত্রিপুরা লিবারেশন ফ্রন্ট বহু আগে বিলুপ্ত। সম্প্রতি নাগারা কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় এসেছে। মিজো জঙ্গীদের নিধনে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ঢুকে ভারতীয় সেনারা অভিযান চালিয়েছে সম্প্রতি। মনিপুরে সম্পূর্ণ স্তিমিত হয়নি। এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীর এক সময় ঘাঁটি ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এদের অর্থের যোগানদাতা প্রধানত পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। এর মধ্যে শক্তিশালী উলফারা, যারা এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য, সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে অর্থ যোগানদাতা হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গীপনায় উলফার সম্পৃক্ততার কথা প্রচারিত। এদের অস্ত্রের চালান যেত বাংলাদেশ হয়ে, যার মধ্যে ১০ ট্রাক অস্ত্র ধরা পড়ে চট্টগ্রামে। উলফাদের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াত জোটের শীর্ষ পর্যায়ে ঘনিষ্ঠতার কথা বিভিন্ন সময় প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদারদের পক্ষে মিজো বিচ্ছিন্নতাবাদীরা মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালিয়ে অনেককে হতাহত করেছিল। সেখানে আশ্রিত শরণার্থীদের ওপরও নির্যাতন চালানো হয়েছিল। আইউব আমলে নাগা ও মিজো সন্ত্রাসীদের নেতারা ঢাকায় বসবাস করতেন। একাত্তরের পর আইএসআইয়ের অর্থে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিবাহিনী গড়ে ওঠে। এরাও সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাত। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য শান্তিচুক্তি করেন। একই সঙ্গে সীমান্তজুড়ে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি উপড়ে ফেলেন। সীমান্তজুড়ে নেয়া হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ফলে উলফারা ঘাঁটি ভুটানে সরিয়ে নেয়।

পশ্চিমবঙ্গের গোর্খারা গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে রক্তক্ষয়ী লড়াই শেষে সমঝোতায় এলেও এখন স্বায়ত্তশাসন চায়। বড়কামতা নামক বিচ্ছিন্নতাবাদীরা স্তিমিত আজ। কিন্তু ভারতজুড়ে মাওবাদীদের সশস্ত্র তৎপরতা থেমে নেই। পশ্চিমবঙ্গে জঙ্গী সংগঠনগুলো ঘাঁটি গেড়ে বাংলাদেশে হামলা চালাচ্ছে ও মানুষ হত্যা করছে, যা ক্ষমাহীন অপরাধ। বাংলাদেশকে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ধকলও পোহাতে হয়। জিয়া-এরশাদ-খালেদা আমলে রোহিঙ্গাদের গোটাপাঁচেক বিদ্রোহী সংগঠনের ঘাঁটি ছিল বাংলাদেশে। এদের জন্য মধ্যপ্রাচ্য থেকে অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য আসত। জিয়াউর রহমান রোহিঙ্গাদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। এই রোহিঙ্গারা জঙ্গীদের হয়ে বর্তমানে এ দেশে সন্ত্রাসও চালাচ্ছে। আরাকান আর্মি নামক একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়েছে। এরা বিজিবির সীমান্ত চৌকি ও টহল দলের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণ করছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানেও তাদের তৎপরতার নেটওয়ার্ক রয়েছে।

ভুটান, ভারত ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের মোটরযান চলাচল চুক্তি অনুযায়ী শীঘ্রই সড়ক যোগাযোগ চালু হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ-চীন-ভারত ও মিয়ানারের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডর চালু হতে যাচ্ছে। এসব চালু হওয়ার আগে সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদকে নিশ্চিহ্ন-নির্মূল করা সঙ্গত। বিচ্ছিন্নতাবাদ নামক সন্ত্রাসবাদকে সব দেশের সম্মিলিত উদ্যোগে নির্মূল করতে হবে।