২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিমত ॥ বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী

  • ইফতেখার আহমেদ খান

বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় নিয়ে বাঙালী-বাংলাদেশী ঘটিত বিভ্রান্তিটি আসলে তাত্ত্বিক নয়, এটা অপশাসন দ্বারা সৃষ্ট একটি কৃত্রিম বিভ্রান্তি। এই বিভ্রান্তির বেড়াজাল জনমানসপটে এক ব্যাপক চিন্তা বাংলাদেশের সম্মানীয় নাগরিক শূন্যতা উৎপন্ন করে চলেছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক উন্নয়ন। বাংলাদেশে বসবাসরত বাঙালী ব্যতীত অন্য ছোট ছোট জাতিগোষ্ঠীকে আদিবাসী শব্দচয়নে প্রতিষ্ঠাকরণ। সম-সাময়িককালে যাদের আদিবাসী বলা হচ্ছে তারা প্রকৃত প্রস্তাবে বাংলাদেশে বাঙালী জনগোষ্ঠীর অভ্যুদয়ের বাস্তবতায় আদিবাসী নয়।

বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ পদটি একাধারে একটি সাম্প্রতিক আরোপন, একটি ভুল পারিভাষিক পদ প্রচারণা, একটি ক্রমশ বিস্তৃত বিভ্রান্তি, একটি খাপছাড়া ভাবাবেগ, পূর্বাপর সঙ্গতিবিহীন ‘উদারতাবাদী’ অভিধা লাভের অভিলাষ এবং দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে নানাবিধ মারাত্মক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। রাজনীতির সূক্ষ্ম-জটিল, কখনও ক্রুর-কঠিন ক্ষেত্রে বিজ্ঞান অমনস্ক যে কোন আবেগপ্রবণতার চড়া মূল্য অবধারিত। বাংলাদেশে ‘আদিবাসী ভুল প্রচারণায় যারা নির্বিকার অংশগ্রহণ করছেন তারা হয়তবা তাদের অজান্তেই জাতীয় স্বার্থবিরুদ্ধ অবস্থানে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। দুটি বিষয় স্পষ্ট যে, প্রথমত, দেশে শব্দটি প্রচলিত হচ্ছে, দ্বিতীয়ত, এর পেছনের উদ্দেশ্য ছোট-বড় নৃগোষ্ঠীভুক্ত সাধারণ জনগণের কাছে অজানা।

বাংলাদেশের ছোট ছোট নৃগোষ্ঠীভুক্ত নাগরিকগণ ‘আদিবাসী বা ভূমিজ’ নয়। ইতিহাসের আলোয় মানব প্রজাতির বহুধা জীবনবৈচিত্র্য নৃবিজ্ঞানিক অন্বিষ্ট হলেও জীবনের পরম মাঙ্গলিক পরিণতি রাজনৈতিক প্রয়াসসিদ্ধ বটে। বিভিন্ন গবেষণাসূত্রে এসব ক্ষুদ্র গোত্রসমূহ ২০০-৪০০ বছরে প্রধানত পার্শ্ববর্তী বার্মা, আরাকান, মিজোরাম অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিতাড়িত কিংবা চা শ্রমিক, রেল শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশে প্রবেশ করে বিভিন্ন স্থানে বসতি স্থাপন করে। বাংলাদেশে নৃগোষ্ঠীগত রাজনীতি উস্কে দেয়ার প্রবণতা অনুধাবনে নৃবিজ্ঞানের কিছু দেশী-বিদেশী গ্রন্থ পাঠ ও পর্যালোচনায় মনে হয়েছে, বেশিরভাগ আলোচনায় পারিভাষিক যে দুটি শব্দ প্রায়ই জড়িয়ে গিয়েছে তা আদিম/আদি মানুষ ও আদিবাসী। প্রথমটি রক্ত-উৎসভিত্তিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রাচীন পরিচিতি, দ্বিতীয়টি কোন অঞ্চলে অধিবাসকালিক পরিচিতি। খুব সংক্ষেপে, পৃথিবীর ভূ-প্রকৃতির বহুরূপ ওলট-পালট এবং মানবপ্রজাতির নানা আবর্তন-পরিবর্তন-বিবর্তনের ধারায় মানুষের মধ্যে রক্তমিলন/মিশ্রণ যেমন ঘটেছে তেমনি বসবাসের স্থানও পরিবর্তন হয়েছে।

বাংলাদেশে নানাভাবে আদিবাসী পদের সংজ্ঞা এসেছে। যেমন আদিবাসী হচ্ছে কোন অঞ্চলের প্রাচীনতম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বংশধর; অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতার শিকার জনগোষ্ঠীই আদিবাসী; ‘আলাদা সংস্কৃতি ও আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্যের (যারা) অধিকারী’ ইত্যাদি। প্রত্যেকটি সংজ্ঞার নানারূপ ব্যাখ্যা সম্ভব। যেমন : ১নং সূত্রে ফরিদপুরের প্রাচীনতম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী বিষয়ে ঐতিহাসিক বা নৃবিজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফলের ওপর ঐকমত্যের ভিত্তিতে বলা আবশ্যক যে কোন প্রাচীন সংখ্যালঘুর বংশধর আদিবাসী। সুতরাং ফরিদপুরের ভূখ-Ñ পদ্মা মধুমতি তাদের। ২নং সূত্রে অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতার শিকার জনগোষ্ঠী বলতে যদি শোষণ, অপশাসন বোঝায় তা হলে বাংলা দেশের ছোটবড় নৃগোষ্ঠী নির্বিশেষে কোটি কোটি জনগণের বৃহদাংশই আদিবাসী। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোন্ ভূখ- কে পাবে, সেটা একটা সংঘাতঘন প্রশ্ন বটে! ৩নং সূত্রে আলাদা সংস্কৃতি ও আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারীগণ যদি আদিবাসী হয়, তা হলে বাংলাদেশে অভিবাসনকারী অবাঙালীগণ (চলিত ভাষায় বিহারী) আদিবাসী, সে ক্ষেত্রে ঢাকার মীরপুর, মোহাম্মদপুরসহ দেশের ৮১টি (১৯৭২-এর হিসেবে) ক্যাম্পের ভূমি/ভূখ- তাদের। পাশাপাশি ৫০টি ছোট গোত্রজ নৃগোষ্ঠীর নাগরিকগণ যদি আদিবাসী হয় তাহলে তাদের বসবাস স্থলের ভূমি ভূখ-, সম্পদ তাদের মালিকানা/স্বায়ত্তশাসনে ছেড়ে দেয়া সমীচীন!

২০০৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬১তম অধিবেশনের টহরঃবফ ঘধঃরড়হং উবপষধৎধঃরড়হ ড়হ ঃযব জরমযঃং ড়ভ ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষবং, বাংলায় যা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র যা বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও বর্তমান বিশ্বের রাষ্ট্র ব্যবস্থার বাস্তবতায় ঘোষণাপত্রটি পাঠপূর্বক প্রতীয়মান হয় যে, এর উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এটি অনেক ক্ষেত্রে সঙ্গতিপূর্ণ নয় এবং রাষ্ট্রের চরম ক্ষমতা বা সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে এর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নসাপেক্ষ। সর্বোপরি, এই ঘোষণাপত্রটি একপেশে বক্তব্যে আকীর্ণ এবং নির্বিঘœ শান্তির সঙ্কেত দেয় না। ইতিহাসের বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য অপ্রযোজ্য এই ঘোষণাপত্রটি পার্বত্য ছোট নৃগোষ্ঠীসমূহের ক্ষুদ্র একটি অংশের আদিবাসী পদের প্রতি আকর্ষণের মূল কারণ। এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য বাংলাদেশের কোন কোন ভূখ-, অরণ্য, নদী, প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ছোট গোত্রজ নৃগোষ্ঠীর মালিকানা প্রতিষ্ঠা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, প্রশাসন ইত্যাদিও তাদের হাতে থাকতে হবে।

বাংলাদেশে মিলে-মিশে পাশাপাশি বাস করছে ছোটবড় নৃগোষ্ঠীভুক্ত জনগণ। বাংলাদেশে অপ্রযোজ্য আদিবাসী তত্ত্ব দ্বারা এবং ইতিহাস বিকৃত করে এই শান্তিপূর্ণ মিলিত জীবনস্রোতকে বিভাজিত করার পরিণাম ভয়াবহ। এ বিষয়ে বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, গণমাধ্যম প্রত্যেকের সতর্কতা আবশ্যক। পরম নাগরিক সচেতনতায় ছোটবড় সকল নৃগোষ্ঠীর সবাই নিজ মাতৃভূমির রাষ্ট্রীয় বিধি-বিধান এমনভাবে বিন্যস্ত করে নিতে মিলিত পদক্ষেপ রাখুক যেন ‘একদানা ভাত’ কেউ কারও চেয়ে বেশি না খায়। বাংলাদেশের ছোটবড় সকল নৃগোষ্ঠীর যৌথ কর্মযজ্ঞের প্রণোদনায় এই রাজনৈতিক শিক্ষা ও দীক্ষা প্রতিভাসিত হবে, সেটাই প্রত্যাশা এবং সেটাই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ‘বাংলাদেশ’ নামক অসাধারণ রাজনৈতিক সর্বজনীনতা।

লেখক : গবেষক