২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্রহ্মপুত্র বিধৌত চর, শিক্ষা বিস্তারে অভাবনীয় উদ্যোগ

ব্রহ্মপুত্র বিধৌত চর, শিক্ষা বিস্তারে অভাবনীয় উদ্যোগ
  • খবরের বিচিত্র সংগ্রহশালা সানন্দবাড়ি

বাবু ইসলাম ॥ সানাইরচর থেকে সানন্দবাড়ি। সানাইরচর পুরনো নাম, হালে সানন্দবাড়ি- এ গ্রামেই ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে খবরের এক বিচিত্র সংগ্রহশালা। স্থানীয় এক শৌখিন ব্যক্তি, নাম তাঁর আনোয়ার হোসেন আকন্দ এই সংগ্রহশালার পৃষ্ঠপোষক। ব্রহ্মপুত্র নদ বিধৌত চরাঞ্চল, জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার এক জনপদের নাম সানন্দবাড়ি। কালের পরিচয়ে এটি এক সময় সমৃদ্ধ নদীবন্দর ছিল। স্মরণাতীত কালের নদীসমূহ যেমন গারো পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে প্রবাহিত জিনজিরা নদী এই বিস্তীর্ণ এলাকাকে বেষ্টন করে পশ্চিমে সোনাভরী নদীর মোহনায় মিলিত হয়ে মূল ব্রহ্মপুত্র নদে মিশে গেছে। অঞ্চলটির ইউনিয়ন ‘চরআমখাওয়া’ নামে কাগজে লিপিবদ্ধ থাকলেও এটি সানন্দবাড়ি নামে সমধিক পরিচিত। এককালের সুখী সমৃদ্ধ এই জনপদে বসবাসকারী মানুষ তাদের গ্রামের নাম ‘সানন্দবাড়ি’ নামকরণের মধ্য দিয়ে এক মাহেন্দ্রক্ষণের পরিচয় পায়। দূর চরাঞ্চল হলেও বর্তমানে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় উপজেলার দেওয়ানগঞ্জ পর্যন্ত ট্রেন এবং পরে বিভিন্ন যানবাহনে সড়ক পথে সানন্দবাড়ি এমনকি বাংলাদেশের সর্বউত্তর রৌমারী উপজেলা হয়ে ভারতের আসাম সীমান্ত পর্যন্ত যাওয়া যায়। বর্তমানের সানন্দবাড়ি মৃত নদীবন্দর হলেও প্রসিদ্ধ হাট-বাজার রয়েছে। এলাকা থেকে আসা উৎপাদিত বিভিন্ন ফসলের পাইকারি ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য বিখ্যাত এই এলাকা। এখানে বিভিন্ন গণমুখী শিক্ষাকেন্দ্র, স্কুল, ডিগ্রী কলেজ, মাদ্রাসা, এনজিও, ব্যাংক বীমা অফিস, পুলিশ ফাঁড়িসহ বিদ্যুতের ব্যবস্থাও রয়েছে।

শতবর্ষ আগের এই জনপদের ভৌগোলিক দৃৃশ্য ছিল ভিন্নতর। তৎকালীন সানাইরচর নামে পরিচিত এই জনপদে বসবাসকারী সংস্কৃতিমনা জনগোষ্ঠীর কাছে সানাইয়ের সুরের মূর্ছনায় কোন অজান্তেই এলাকাটি ‘সানন্দবাড়ি’ নামে পরিচিতি পায়। তৎকালীন কিছু শিক্ষিত মুসলিম পরিবার অধ্যুষিত এলাকায় শিক্ষার প্রসার লাভ ঘটেছিল। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষা বিস্তারের জনগণের ঐকান্তিক সহযোগিতা ও আগ্রহ ছিল। সানাইরচরের তেমনি একটি অভিজাত মুসলিম পরিবারে আনোয়ার হোসেন আকন্দের জন্ম। আকন্দ পরিবারের পরিচয়ে পাড়ার পরিচয়। বাবা মৌলভী আতাউর রহমান আকন্দ তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা বোর্ড থেকে আলিম পাস করে স্থানীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এর পাশাপাশি সমাজের ‘কাজী’র দায়িত্বও পালন করতেন তিনি। সমাজের একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে ধর্মীয় কার্মকা-ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন, উৎসাহ যোগাতেন, শিক্ষার প্রসারে তেমনি তার নিরলস প্রচেষ্টাও ছিল। তার সময় থেকেই তিনি বিভিন্ন বিচিত্র ও বিরল বই পুস্তক সংগ্রহ করে একটি ক্ষুদ্র সংগ্রহশালা বা মিনি পরিবারিক লাইবেরির সূচনা করেন। আনোয়ার হোসেন আকন্দের বয়স যখন ৮ বছর, তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র, তখন থেকেই এই সংগ্রহশালার দায়িত্বভার তার ওপর অর্পিত হয়। শৈশব থেকেই আনোয়ার হোসেন আকন্দ পড়াশোনা, জ্ঞানার্জন ও সংরক্ষণশীলতার প্রতি মনোযোগী ছিলেন। বইয়ের ছেঁড়া পাতা, কাগজের টুকরাগুলোকেও তিনি যতœ সহকারে সংরক্ষণ করতেন। চারদিক নদীবেষ্টিত এই চরভূমি, দিগন্ত বিস্তৃত বিচিত্র ফসলের মাঠ, প্রকৃতি এই নৈসর্গিক অপরূপের ছোঁয়া শিশু আনোয়ারের মনে দূর অজানাকে জানার আকাক্সক্ষা জাগিয়ে তুলত। তখন থেকেই সমাজ ও জাতীয় জীবনের বিভিন্ন খবর, তথ্য উপাত্ত সংরক্ষণ হতে থাকে তার এই সংগ্রহশালায়। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে দেশের ও বিদেশের বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত ১০ হাজারেরও বেশি মনীষীর জীবনীর ক্লিপিং। পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজারেরও বেশি বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার ১০ থেকে ১২ হাজার মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার বাছাই করা খবরের ক্লিপিং, যা তিনি বাঁধাই করে যতœ করে রেখেছেন তাঁর সংগ্রহশালায়। দেশ- বিদেশের বিভিন্ন ঘটনার ৭০ লাখেরও বেশি রং- বেরঙের ছবি, নাটক, নভেল, উপন্যাস, কাব্য, মহাকাব্য, জীবনীগ্রন্থ, ধর্মীয়গ্রন্থ, বিজ্ঞান, আবিষ্কার, ভ্রমণ কাহিনীর মনকাড়া নতুন ও পুরাতন পাঠ্য বই। বিয়ের মানপত্র, বিদায় অনুষ্ঠানের মানপত্র, নির্বাচনী প্রতীকও রয়েছে তাঁর সংগ্রহশালায়। আনোয়ার হোসেনের জীবনের এই কর্মযজ্ঞ দেশের জাতীয় পত্রিকাগুলোতেও প্রচার পেয়েছে। জ্ঞানী, গুণী মহলে সমাদৃত হয়েছে। আনোয়ার হোসেনের শখের কাজটি কালক্রমে আজ সত্যি সত্যিই ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি জাতীয় পত্রিকার স্থানীয় সাংবাদিকরা তাঁর এই সংগ্রহশালাটিকে সরেজমিন পরিদর্শন করে বিভিন্নভাবে তাদের মূল্যবান মতামতসহ দেশবাসীর নিকট উপস্থাপন করেছেন। এ জন্যই তিনি বেসরকারীভাবে এলাকার মানুষের কাছে বই পত্রিকা এবং পুরাতন তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে মুকুটবিহীন তথ্য সম্রাট হিসেবে পরিচিত।