২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

টেস্টকে বিদায় জানালেন ওয়াটসন

  • মোঃ নুরুজ্জামান

কোন রকম ইঙ্গিত ছাড়া আচমকাই টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন শেন ওয়াটসন। ইনজুরি-ফর্মহীনতায় অস্ট্রেলিয়ার অবসরের মিছিলে যোগ দিলেন এই তারকা অলরাউন্ডার। এর আগে ইংল্যান্ড সফরে এ্যাশেজ ভরাডুবির দায় মাথায় নিয়ে অবসর নেন অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক। ওপেনার ক্রিস রজার্সও তার সঙ্গী হন। ও হ্যাঁ, এ্যাশেজ শুরুর আগেই ‘বিদায়’ বলেন পেসার রায়ান হ্যারিসও! রঙিন পোশাকের ওয়ানডে ও টি২০ ক্যারিয়ার দীর্ঘ করতেই সাদা পোশাকের ইতি টানলেন ৩৪ বছর বয়সী কুইন্সল্যান্ড প্রতিভা। একই সঙ্গে ইংলিশ কাউন্টি দল হ্যাম্পশায়ারে প্রত্যাবর্তনেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। যার অর্থ, ওয়াটসনকে আসন্ন বাংলাদেশ সফরের টেস্ট দলে দেখা যাবে না।

‘সিদ্ধান্ত নেয়াটা সহজ ছিল না। গত কয়েক দিন অনেক ভেবেছি। ইনজুরি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। মনে হচ্ছে, দীর্ঘ পরিসরের টেস্টকে বিদায় জানানোর সময় হয়েছে। আশা করি এই সিদ্ধান্তে ওয়ানডে ও টি২০ ক্যারিয়ারটা দীর্ঘ করতে পারব’Ñ টেস্ট ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন ওয়াটসন। তিনি আরও যোগ করেন, ‘এ্যাশেজ শেষ হওয়ার পর এ নিয়ে খুব ভাবছিলাম। ভাবছিলাম কোনটা সঠিক। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে নিজের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করেছি। এক দশক ধরে দেশের হয়ে খেলতে পেরে আমি গর্বিত।’ এক সময় মাইক্লেল ক্লার্কের যোগ্য উত্তরসূরি ভাবা হতো তাঁকে। মাঝে সহ-অধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইনজুরি ও অনাকাক্সিক্ষত কিছু ঘটনা, ফর্মহীনতা সব এলোমেলো করে দেয়। এমনকি কিছুদিনের জন্য দল থেকে বাদও পড়তে হয়েছিল।

২০০২Ñএর মার্চে ওয়ানডে অভিষেক হওয়া ওয়াটসন টেস্টে সুযোগ পান ২০০৫ সালে। দশ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রতিভাবান এই অলরাউন্ডারকে অনেকরাই ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। অবসরের ঘোষণা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, টেস্ট খেলাটা সত্যি অনেক কঠিন। পাঁচ দিন ধরে দীর্ঘ এই খেলাটার জন্য ভেতর থেকে তাগিদ পাচ্ছেন না। ‘মনে হয়েছে এটাই সঠিক সময়। টেস্ট ক্রিকেটে লড়াইয়ের জন্য সত্যিকারের মানসিকতা হারিয়েছি আমি। শারীরিক, মানসিক ও টেকনিক্যালি সাদা পোশাকের যা চাহিদা, সেটি পূরণের অবস্থা আর নেই। তাই বিদায় বলার জন্য এটাই ঠিক সময় বলে মনে হয়েছে।’ ওয়ানডে-টি২০ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপশি এখন স্ত্রী-সন্তান, পরিবারকে বেশি সময় দিতে পারবেন বলে খুশি ওয়াটসন। এক দশকে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৫৯টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছেন। ৩৫.১৯ গড়ে করেছেন ৩৭৩১ রান। সেঞ্চুরি ৪ ও হাফসেঞ্চুরি ২৪টি। ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ১৭৬।

ডানহাতি মিডিয়াম পেসে নিয়েছেন ৭৫ উইকেট। সেরা ৬/৫১। ২০১৩-১৪ এ্যাশেজ জয়ী দলের গর্বিত সদস্য ওয়াটসন ২০১১Ñএর বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটার, ক্যারিয়ারে দু’বার পেয়েছেন এ্যালান বোর্ডার পুরস্কার। সিডনিতে ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয়, যখন তার বয়স ২৩ বছর। অস্ট্রেলিয়ার ৯ উইকেটের বড় জয়ের ম্যাচে প্রথম ইনিংসে করেছিলেন ৩১ রান। প্রতিপক্ষ তারকা ইউনুস খানকে বধ করে পেয়েছিলেন প্রথম উইকেট। মূলত ব্যাটসম্যান হিসেবেই তাকে টেস্টে নেয়া হয়। বল হাতে কার্যকারিতা প্রমাণ করে ২০০৯Ñএ দলে নিয়মিত হন ওয়াটসন। এমনকি উঠে আসেন ওপেনিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পজিশনে। ক্যারিয়ারে দুই হাজারের বেশি রান করেছেন ওপেনার হিসেবেই। ক্লার্ক, রজার্স, ওয়াটসন, হ্যারিস অবসরে, বিশ্রামে পেস তারকা মিচেল জনসন, ইনজুরিতে ডেভিড ওয়ার্নার-জস হ্যাজলউড। তরুণ অধিানায়ক স্টিভেন স্মিথকে তাই একঝাঁক নতুন ক্রিকেটার নিয়ে বাংলাদেশে পাড়ি জমাতে হবে। মাঠ ও মাঠের বাইরে ওয়াটসনের ক্যারিয়ার মোটেই মসৃণ নয়। ২০১২-১৩ ভারত সফরে ততকালীন কোচ এবং অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কের সঙ্গে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলেন। অধিনায়ক ক্লার্কের সঙ্গ তার সম্পর্কটা কখনই ভাল ছিল না। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে নেতিবাচক আলোচনার খোরাক হয়ে উঠেছিলেন তারা। ফর্মহীনতায় এই ইংল্যান্ড সফরেও টেস্ট থেকে বাদ পড়েন ওয়াটসন। অনেকেই বলেন, অনেক তো হলো, এবার ওয়াটসনকে সরানো হোক। কারও আবার মত, বয়স্ক খেলোয়াড়দের নিয়ে বার বার প্রশ্ন উঠছে। এবার ‘বুড়ো’-দের পূর্ণ বিশ্রামে পাঠানো হোক। কার্ডিফের প্রথম টেস্টে ওয়াটসন কার্যত কিছুই করতে পারেননি। দুই ইনিংসে রান ৩০ ও ১৯। বল হাতে পাননি একটাও উইকেট। ‘দ্য অস্ট্রেলিয়ান’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টের আগে টিমে কিছু বদল জরুরী হয়ে পড়েছে। ওয়াটসন অনেক সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু কাজে লাগাতে পারেনি। ১৯৯৭ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে এ্যাশেজ সিরিজেও প্রথম টেস্টে হেরে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। তার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে সিরিজ জিতে নিয়েছিল। এবারও দ্বিতীয় টেস্টে দাপটের সঙ্গে জিতে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। টানা তৃতীয় ও চতুর্থ টেস্টে হেরে সিরিজ খোয়ায় মাইকেল ক্লার্কের দল। ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে অবসর নেন অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক। ওয়াটসনও ছাড়লেন, মাঝে কয়েক দিনের বাড়তি চিন্তা, এই যা! তবে ফর্ম যাই হোক, ওয়াটসন যে সাম্প্রতিক অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় ক্রিকেটার। একটি পরিসংখ্যানেই তা পরিষ্কার।

দেশটির অন্যতম অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার ব্যাটে-বলে ফর্মে না থাকলেও আর্থিক উপার্জনের দিক দিয়ে ওয়াটসনের ফর্ম নিয়ে একদমই প্রশ্ন নেই! দ্য বিজনেস রিভিউ উইকলির (বিডব্লিউআর) বিচারে স্থানীয়দের মধ্যে সেরা ৫০ জন ক্রিকেটারের তালিকায় সবার উপরে তিনি। ২০১৪ সালে ওয়াটসন প্রায় ২৮ কোটি টাকা উপার্জন করেন। এমনকি, অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ অর্থ উপার্জনকারী স্পোর্টস পার্সনদের তালিকাতেও রয়েছেন ৮ নম্বরে। বিডব্লিউআর জানিয়েছে, ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের দল রাজস্থান রয়্যালসের সঙ্গে প্রায় ১৩ কোটির চুক্তির জন্যই ওয়াটসনের উপার্জন এতটা উপরে। আয়ের দিক দিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের মধ্যে তার পরই আছেন যথাক্রমে মিচেল জনসন, ডেভিড ওয়ার্নার ও স্টিভেন স্মিথ। তবে অর্থের ঘোরে কখনই অমানুষ হয়ে যাননি ওয়াটসন। তাই তো এবারের বিশ্বকাপ থেকে উপার্জিত অর্থের বড় একটা অংশ দান করেছেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশনে।