২২ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘পিরলো কি ম্যারাডোনা?’

  • চিৎকার করে বলতেন তাঁর বাবা-মা;###;মোঃ মামুন রশীদ

আন্দ্রেয়া পিরলো ছিলেন নিজের জন্য নিজেই বড় সমস্যা। নিজেকে আরও বড় কোন পর্যায়ে মেলে ধরার ক্ষেত্রে সমস্যাটা হয়েছে নিজের অতিমাত্রারা দক্ষতাটাই। শৈশবের ক্লাব ব্রেসিকার সতীর্থরা ম্যাচ শুরুর পর তাঁকে বল পাস দিতে চাইতেন না। তাঁরা ঈর্ষা থেকেই এটা করতেন। কারণ সবাই ভাল করে জানতেন পিরলোর পায়ে বল যাওয়ার পর সেটা প্রতিপক্ষের সীমানায় যাবেই এবং একাই কিছু করে ফেলবেন। সেজন্য গ্যালারিতে থাকা তাঁর বাবা-মা চিৎকার করতেন, ‘এই ছেলেগুলো কি তাঁকে ম্যারাডোনা ভাবতে শুরু করেছে?’ পিরলো কেঁদে ফেলতেন এবং মাঠের অন্য প্রান্ত দিয়ে পালানোর চেষ্টা করতেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বছরখানেক খেলেনওনি ব্রেসিকার হয়ে। কিন্তু পরে নিজেকেই নিজে বুঝিয়েছেন,‘যাও নিজেই বল কেড়ে নাও, দখল করো এবং নিজের দক্ষতা দেখাও। যারা ঈর্ষাকাতর তাঁদের পায়ে বল থাকতে পারে না, সেটা শুধুই তোমার।’ পরে দলের সিনিয়রদের সঙ্গে অনুশীলন করতেন পিরলো। তাঁর ওপর এতটাই মুগ্ধ ছিলেন কোচ মিরসেয়া লুসেস্কু যে পিরলোকে এ সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে লুসেস্কুর সহকারী এ্যাডেলিও মোরো বলেন,‘অনেকেই এখানেও তাঁকে হিংসা করতেন। কারণ সবাই ভীত ছিলেন পিরলোর জন্য একাদশে জায়গা পাবেন না।’ এভাবেই একদিন বেড়ে উঠলেন পিরলো এবং হয়ে গেলেন ইতালি জাতীয় দলের অন্যতম নির্ভরতা, মাঝমাঠের ফুটবল জাদুকর।

পিরলোর পরিবারটা আর্থিকভাবেই ছিল সচ্ছল। তাঁর পরিবারের আছে ১০ হেক্টর আঙ্গুরের ক্ষেত। সেজন্য ফুটবল খেলে তাঁকে উপার্জন করতে হবে বিষয়টা এমন ছিল না কখনোই। ছোটবেলায় পরিবারের সঙ্গে সমুদ্র তীরবর্তী টাসকানে বেড়াতে গিয়ে সৈকতের বালিতে নিজের চেয়ে বয়সে অনেক বড়দের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন। সে বিষয়ে পিরলোর মা লিডিযা বলেন,‘অনেকে তাঁর খেলা দেখে থামিয়ে বলতেন-তুমি তো চমৎকার, আকর্ষণীয় খেলা খেলো। ব্রেসিকার হয়ে যখন খেলা শুরু করলেন ক্লাবটির চিরশত্রু ছিল আটলান্টা। তখন আটলান্টার যুব দলের কোচ ছিলেন সিজার প্রানদেল্লি। তিনি পিরলোর খেলা দেখেছিলেন। এ বিষয়ে পরে বলেন, ‘সে আমাকে নির্বাক করে দিয়েছিল। আমি তাঁকে যেমন দেখেছিলাম সেটার আগে ওভাবে আর কাউকে খেলতে দেখিনি। শুধু আমিই নই, সবাই শুধু তাঁরই দিকে তাকিয়ে থাকতেন এবং অনেকে বলতেন-ছেলেটি অদ্বিতীয় এবং অবশ্যই ইতালির জন্য ভবিষ্যত মেধা।’ পিরলো নিজের ওপরও যথেষ্ট আস্থাবান এবং স্বীয় দক্ষতার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। ২০১৩ সালে একটি আত্মজীবনীমূলক বই লিখে ফেলেন পিরলো। বইটির নাম ছিল-‘পেনসো কুইনডি গিওকো (আই থিঙ্ক, দেয়ারফোর আই প্লে)’। সেখানে তিনি লিখেন,‘খুব ছোটবেলা থেকেই আমি জানতাম আমি অন্য সবার চেয়ে ভাল। সেজন্যই আমার কথার ধার বেড়ে গিয়েছিল। সবাই আমাকে নিয়ে কথা বলতেন। আর আমিও নিজের সম্পর্কে এত বেশি বলতে শুরু করেছিলাম যে অনেকে আবার তেমন ভাল বলে মনে করতেন না আমাকে।’

গত মৌসুমেই ইউরোপের পাট চুকিয়ে ফেলেছেন পিরলো। কিন্তু তাই বলে আজ্জুরিদের হয়ে নিজের দায়িত্বটা এত সহজেই ছাড়ছেন না তিনি। গত বিশ্বকাপে বাজেভাবে শেষ করেছে ইতালি। দলের এমন খারাপ সময়ে পিরলোকে প্রয়োজন ভালভাবে গুছিয়ে ওঠার জন্য। নতুনদের নিয়ে আবার সংগঠিত হতে হলে পিরলোর বিকল্প নেই আপাতত আজ্জুরিদের। পিরলো নিজেও জাতীয় দলের জার্সিটাকে অন্যরকম এক মর্যাদার চোখে দেখেন, বিশেষ এক গৌরব বলে মনে করেন। এ কারণে তিনি মনে করেন এখনও দলকে যা দেয়ার আছে সেটা সম্পূর্ণভাবে না দিয়ে সরে দাঁড়ানো হবে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। তবে ইউরো ২০১৬ শেষেই হয়তো আজ্জুরিদের গর্বের নীল জার্সিটা পরা বাদ দিয়ে দেবেন। এবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি ক্লাবের হয়ে মেজর লীগ সকারে (এমএলএস) খেলা শুরু করে দিয়েছেন। এ বিষয়ে তাঁর সাবেক কোচ (রেজিনা এফসি) ফ্রাঙ্কো কলোম্বা বলেন,‘এমএলএসে তাঁকে যেতে দেখে আমি একটুও বিস্মিত হইনি। তিনি যদি এখনও ইতালিতে থাকতেন লোকে বলাবলি শুরু করত তিনি ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে আছেন। তিনি বরং যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলারদের শেখাতে পারবেন কিভাবে ফুটবল খেলতে হয়। সেটা ২০৪০ পর্যন্ত হলেও আমি আশ্চর্য হব না। পিরলো আমার দেখা আজ পর্যন্ত সবচেয়ে ভাল ফুটবলার। কিন্তু তিনি জুভেন্টাসে থাকলে শুধু বয়সের কারণেই হয়তো সাইডবেঞ্চে বসে থাকতেন। আর সেটা হতো তাঁর জন্য চাপের কারণ। কাজেই নিজের সেরাটা ধারাবাহিকভাবে যেখানে দেখানোর সুযোগ আছে সেখানে যাওয়াটাই তাঁর জন্য ভাল বলে মনে করি।’

নিখুঁত পাস, দুর্দান্ত ফ্রি-কিক এবং দক্ষতাপূর্ণ ফুটবল একটা শিল্প। কোনভাবেই উত্তেজিত হয়ে উল্টাপাল্টা কিছু করে বসেন না পিরলো। সে কারণেই তিনি যখন কথা বলেন মানুষ চুপ করে শুনতে বাধ্য হয়। আর চুপচাপ স্বভাবের হলেও খেলার ক্ষেত্রে তিনি যেন প্রতিপক্ষের জন্য সাক্ষাৎ যমদূত। এ বিষয়ে ইতালির বিদায়ী কোচ সিজার প্রানদেল্লি বলেন, ‘তিনি একজন নির্বাক নেতা। খুবই বিরল ঘটনা যে তিনি কোন কথা শুরু করেছেন। কিন্তু যখন হঠাৎ করে কোন কথা বলতে থাকেন তখনই পুরো ড্রেসিং রুম নিশ্চুপ হয়ে যায় এবং তাঁর কথা শোনে। এ শিক্ষাটা একদম পরিষ্কার-যদি কেউ নিজের কণ্ঠটাকে সামলে রাখেন এবং খুব কম ব্যবহার করেন পরবর্তীতে তাঁর বক্তব্য মূল্যবান হয়ে যায়। শুধু এখানেই নয় ব্যক্তিগত জীবনেও পিরলোর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন সবাই।’ আর এভাবেই পুরো ক্যারিয়ারে সম্মান আর মর্যাদা নিয়ে নিষ্কলুষভাবে এগিয়ে চলেছেন পিরলো। এখন পর্যন্ত আজ্জুরিদের হয়ে ১১৬ ম্যাচ খেলেছেন, গোল করেছেন ১৩টি। আরও কতদিন ইতালির জার্সি গায়ে চড়িয়ে মাঠ মাতাবেন সেটা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে ইতালি কোনভাবেই হারাতে চাইবে না তাঁকে। পিরলো নিজেও অবশ্য এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছুই বলেননি। কিন্তু যতদিন সম্ভব দেশের প্রতিনিধিত্ব করে যেতে চান এ নীরব নেতা। সেটা ইতালিও কায়মনে চায় যে আরও কয়েক বছর খেলে যাবেন পিরলো।