১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘সন্তানের সঙ্গে আমি আমার আত্মাকেও সমাহিত করেছি’

  • মু. আবদুল্লাহ আল আমিন

সন্তানের সঙ্গে আমি আমার আত্মাকেও সমাহিত করেছি। প্রিয় সন্তানের দাফনের সময় এভাবেই মনের দুঃখ প্রকাশ করেন শিশু আয়লান কুর্দির বাবা আবদুল্লাহ কুর্দি। তিনি আরও জানিয়েছেন, তিনি আর ইউরোপে যেতে চান না। তার দুই ‘ঘুমন্ত’ সন্তানদের সঙ্গে বাকি জীবন সিরিয়ায় কাটিয়ে দিতে।

লাল টিশার্ট ও নীল প্যান্ট পরা আয়লানের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ গণমাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়ার পর ইউরোপসহ সারা বিশ্বের মানুষ ক্ষোভ ও দুঃখ ফেটে পড়ে। ছবিটি তোলেন তুর্কী নারী ফটোগ্রাফার নিলুফার ডেমির। তিনি জানান, যখন দেখলেন সমুদ্র উপকূলে একটি শিশুর প্রাণহীন দেহ এভাবে পড়ে আছে, সিদ্ধান্ত নিলেন এ ছবি তুলে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে দেয়ার। এর কেমন প্রতিক্রিয়া হয় তা দেখাই ছিল তার উদ্দেশ্য। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে টুইটারে তা রেকর্ড গড়ে সারা বিশ্বে যার অর্থ ছিল ‘মানবতা ভেসে গেছে সাগরে’। ডেইলি মেইল লিখেছে, ‘মানবিক বিপর্যয়ের ক্ষুদ্রতম বলি’, ইতালির ‘লা রিপাবলিকা’ পত্রিকায় ছবিটির শিরোনাম ছিল, ‘এক ছবিতে স্তব্ধ বিশ্ব’, দ্য অস্ট্রেলিয়ান শিরোনাম করেছে, ‘অভিবাসী সঙ্কটের ট্রাজিক প্রতীক’। উল্লেখ্য, নিলুফার অভিবাসী ইস্যুটি নিয়ে দোগান নিউজ এজেন্সির পক্ষে চলতি বছর অনেকগুলো ছবি তুলেছেন। তুরস্কের যে পুলিশ আয়লানের মৃতদেহ কোলে করে নিয়ে আসেন তার নাম মোহামেত সিপলাক। ওই নিউজ এজেন্সিকে তিনি বলেন, ‘দূর থেকে যখন আমি বাচ্চাটিকে দেখি, তাকে জীবিতই মনে করেছিলাম। কাছে এসে দেখি তার মধ্যে জীবনের কোন স্পন্দন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আমারও একটি ছয় বছরের শিশু আছে। মৃত শিশুটিকে দেখে আমার নিজের সন্তানের কথা মনে পড়ে গেল। আমি শুধু নিজের দায়িত্বটুকু পালন করেছি মাত্র। এ যেন কতখানি হৃদয়বিদারক ঘটনা তা আমি বলে বোঝাতে পারব না।’ তিনি আরও বলেন, শিশু আয়লানের সঙ্গে তার ছবিও যে এখন সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে, এসব কথা তার কল্পনাতেও আসেনি।

এরই প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যে আরও কয়েক হাজার সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। ছবিটি দেখে ক্যামেরন বলেন, ‘যুক্তরাজ্য তার নৈতিক দায়িত্ব পালন করবে’। এই ঘটনা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, নৌকায় করে মানবপাচার বন্ধ করতে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী। একই সঙ্গে অভিবাসীদের সঙ্কটকেও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সুরাহা করা প্রয়োজন। কারন ৪০ লাখ সিরিয়ান আজ দেশছাড়া। নিজেদের বসতভিটা হারিয়েছেন ৩০ লাখ ইরাকি। এছাড়া সংঘাত বিক্ষুব্ধ অন্যান্য অঞ্চলের মানুষজন তো আছেই।

সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই শরণার্থী সঙ্কট সামলাতে ইউরোপের পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন। তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘অভিবাসীদের আগমন বিষয়ে ইউরোপ যে মনোভাব দেখাচ্ছে সেটা দুঃখজনকÑ বিষয়টি সাধারণ মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সময় এসেছে।’ ব্রিটেনের দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রশ্ন তুলেছে, ‘সিরিয়ার ছোট্ট শিশুর মরদেহের এই শক্তিশালী ছবিটি যদি চলমান সঙ্কট নিয়ে ইউরোপের মনোভাবে পরিবর্তন না আনে, তাহলে আর কিসে কী হবে। ইউরোপগামী শরণার্থীদের বেশিরভাগ যাচ্ছে জার্মানিতে। জার্মানি ইতোমধ্যেই আট লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। তবে তেল সমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলো এক্ষেত্রে খুবই হতাশাব্যঞ্জক আচরণ করেছে। তাদের কাছে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী হিসেবে শরণার্থীদের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি। তবে জর্দান ও কাতার এক্ষেত্রে কিছুটা হলেও এগিয়ে এসেছে।

প্রথমেই উঠেছে, গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আর কতদিন এভাবে জীবন দিয়ে যাবে আয়লানের মতো শিশুরা? আয়লান শুধু নয়, বড় ভাই গালিব আর মাও মারা গেছে নৌকাডুবিতে। সব হারিয়ে বেঁচে আছেন শুধু আবদুল্লাহ। তিনি থাকতেন সিরিয়ার কোবানিতে। গৃহযুদ্ধে উৎপীড়িত হয়ে গিয়েছিল তুরস্কে। তার মতো আরব দেশগুলো থেকে আরও ১৮ লাখ সিরীয় এখন আশ্রয় নিয়েছে তুরস্কে। তুরস্ক কঠিন অবস্থায় পড়লেও দেশটি সীমান্ত সিল করে দেয়নি। প্রতিদিন সিরিয়া থেকে লোকজন আসছে সেখানে। ভাল কাজ না পেয়ে ভাগ্য অন্বেষণে অনেকে চলে যাচ্ছে ইউরোপে। যুদ্ধ পরিস্থিতি সিরিয়ার ওই পরিবারটাকে আচমকাই শরণার্থী বানিয়ে ছিল। কোবানি ছেড়ে প্রথমে দামেস্ক, আলেপ্পো, সেখান থেকে আবার কোবানি। কিন্তু সিরিয়ায় আইএস জঙ্গী এবং কুর্দি বাহিনীর লড়াইয়ে কোন অবস্থার কোন পরিবর্তন হচ্ছে না দেখে ভিটেমাটি ছেড়ে কানাডা যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। আবদুল্লাহর বোন তিমা কুর্দি কানাডায় আছেন। তিমা চাইছিলেন, ভাই ও তাঁর পরিবার কানাডাতেই আশ্রয় পাক। কিন্তু তুরস্কে সে রকম শরণার্থী সমস্যা নেই, এই যুক্তি দেখিয়ে তাঁদের আবেদন বাতিল করে দেয় কানাডা সরকার। শেষে আবদুল্লাহ ঠিক করেন, সমুদ্র পেরিয়ে যাবেন গ্রিসে। তাঁর আফসোস, কেন টাকা পাঠালাম না, তাহলে হয়ত ভাই সিরিয়াতেই থেকে যেত।

নির্বাচিত সংবাদ