২৪ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাকিস্তানে চালকের আসনে সেনাবাহিনী

  • এনামুল হক

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ এখন দেশটিতে চালকের আসনে বসলে এতটুকু অত্যুক্তি হবে না। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কসহ দেশের পররাষ্ট্রনীতির দিকনির্দেশনা কার্যত তিনিই দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, প্রধান সকল ইস্যুতে তারই মুখ্য ভূমিকা পলিক্ষিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ স্ব-অবস্থানে আছেন বটে, তবে মিডিয়ার প্রথম পৃষ্ঠায় জেনারেল শরিফেরই প্রাধান্য দেখা যায়। পশ্চিম ওয়াজিরিস্তান সফরে হোক, বন্যা উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শনে হোক, বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হোক- সবখানেই চোখে পড়বে এই জেনারেলকে। দেশের জঙ্গী তৎপরতার বিরুদ্ধে নওয়াজের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেখানে নিষ্প্রভ, সেখানে এই সেনাপ্রধানের ভূমিকা অনেক সুস্পষ্ট, বলিষ্ঠ ও উচ্চকিত। এক অর্থে বলা যায়, জেনারেল শরীফ পাকিস্তানে এক ধরনের রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার কয়েক মাস পর জেনারেল রাহিল শরীফ সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন। সিনিয়রিটির তালিকায় তার অবস্থান ছিল তৃতীয়। তাছাড়া সেনাপ্রধান পদের জন্য তিনি ফ্রন্টরানারও ছিলেন না। তথাপি এমন গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য নওয়াজ এমন এক লো প্রোফাইল অফিসারকেই বেছে নিয়েছিলেন। জেনারেল মোশারফকে নিয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা তার মনে কাজ করেছিল। তাই সব দিক বিবেচনায় জেনারেল শরীফকেই তার নিরাপদ মনে হয়েছে। কিন্তু জেনারেল শরীফ তার প্রতি সরাসরি হুমকি হয়ে না দাঁড়ালেও ধীরে ধীরে যে এতখানি এসারটিভ হয়ে উঠবেন, তা হয়ত নওয়াজ ভাবেননি।

মোশারফের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নওয়াজ শরীফ ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে যে অবিশ্বাসের অচলায়তন গড়ে উঠেছে, তা এতই ব্যাপক ও বিশাল যে, সহজে দূর হবার নয়। আর প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও সেনাবাহিনী এমন রূপ ধারণ করেছে যে, কতগুলো ইস্যুতে তারা সিভিল প্রশাসনকে কোনরকম ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। তার একটা প্রমাণ মোশারফের রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিচার অনানুষ্ঠানিকভাবে বাদ দিতে হয়েছে নওয়াজকে।

জেনারেল শরীফকে বাহ্যত যতটা লো প্রোফাইলের অফিসার মনে হোক না কেন, তিনি তার পূর্বসূরি কায়ানির মতো নন। কায়ানি ছিলেন বড্ড বেশি হিসেবি। তিনি কোন ঝুঁকি নিতে চাইতেন না। যেমন জঙ্গী প্রশ্নে কায়ানি তার পূর্বসূরিদেরই অনুসরণ করে গেছেন। সিভিল সরকারকেই সন্ত্রাস দমনের নীতি নির্ধারণ করতে দিয়েছিলেন। ভাল সন্ত্রাসী ও মন্দ সন্ত্রাসীর মধ্যে পার্থক্য টেনেছিলেন। জেনারেল শরীফ তা করছেন না। ভাল ও মন্দ সন্ত্রাসীর মধ্যে পার্থক্য টানছেন না। সন্ত্রাস দমনে নিজে উদ্যোগী হতে দ্বিধা করছেন না। যেমন, সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় অনির্দিষ্টকাল বসে না থেকে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে সেনা অভিযান চালাতে যাওয়া তার নিজেরই সিদ্ধান্ত।

বলা বাহুল্য, অসংখ্য দেশী-বিদেশী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সমাবেশে উত্তর ওয়াজিরিস্তান সন্ত্রাসের স্বর্গভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আজ সেখানে জেনারেল শরীফের নির্দেশে সেনা অভিযানের কারণে দেশে জঙ্গী সহিংসতার মাত্রা কমে এসেছে। ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এখনও চলেছে সত্য। তবে জঙ্গী গ্রুপগুলোর বড় ধরনের হামলা চালানোর ক্ষমতা নিঃসন্দেহে খর্ব হয়েছে। এটা জেনারেল শরীফের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় অর্জন।

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীর ভূমিকাও বহুলাংশে প্রসারিত হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন যে, একদিকে উপজাতীয় এলাকায় জঙ্গী দমন এবং অন্যদিকে মূল ভূখ-ে সন্ত্রাস দমনের কাজে নিয়োগ করে সেনাবাহিনীকে অতিমাত্রায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর অন্যতম বড় একটা অভিযান এখন চলছে অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ২ কোটি লোক অধ্যুষিত করাচীতে। অভ্যন্তরীণ নিরাত্তার বিষয়ে সিভিল প্রশাসন যে সামরিক বাহিনীর কাছে উত্তরোত্তর দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছে, এটা তারই পরিচায়ক।

পাকিস্তানে যত সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে, আগে থেকে তার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে, লক্ষণ ফুটে উঠেছে, এমনকি ভবিষ্যদ্বাণীও করা গেছে। কিন্তু এবার ঘটছে এক ভিন্ন ব্যাপার। ট্যাঙ্ক রাস্তায় নামানো ছাড়াই ক্ষমতা ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হচ্ছে সিভিল থেকে মিলিটারির হাতে।

গত ৭ মাসে ওয়াশিংটন, লন্ডন, বেজিং ও মস্কোয় হাই প্রোফাইল সফরে গেছেন জেনারেল রাহিল শরীফ। এসব সফর থেকে ক্ষমতার স্থান পরিবর্তনের ধারণাটি জোরদার হয়ে উঠেছে। জনগণের মনে এমন ধারণা এখন লক্ষ্যণীয় মাত্রা বিদ্যমান যে, পশ্চিমী দেশগুলো পাকিস্তান সামরিক বাহিনীকে প্রধান সিদ্ধান্ত নির্ধারণকারী শক্তি বলে মনে করে। পররাষ্ট্র নীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্পর্কে মতামত দেয়ার জোরালো ক্ষমতা সেনাবাহিনীর সবসময়ই ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সার্বিক নীতি নির্ধারণে সে ক্ষমতা অনেক বেশি প্রকাশ্য রূপ ধারণ করেছে। পূর্ণাঙ্গ সময়ের কোন পররাষ্ট্রমন্ত্রী না থাকায় এই উদ্যোগ এখন সম্পূর্ণরূপে জেনারেল হেডকোয়ার্টারের দিকে চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

ভারত ইস্যুতেও দুই শরীফের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গীগত পার্থক্য ও জটিলতা বিদ্যমান। উফা ঘোষণার কথাই ধরা যাক। এই ঘোষণার ব্যাপারে সামরিক বাহিনীর প্রবল আপত্তি আছে। তারা একে একতরফা মনে করে। সম্প্রতি সীমান্তে ও নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় সামরিক বাহিনীর ভূমিকাও কঠোর হয়েছে। এ অবস্থায় নওয়াজ শরীফের পক্ষে নমনীয় ও আপোসমূলক ভূমিকা অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।র এ অবস্থায় পাকিস্তানে এখন যা চলছে সেটাকে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটা ব্যবস্থা বলা যেতে পারে, যেখানে সিভিলিয়ান সরকার সেনাবাহিনীর ওপর উত্তরোত্তর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। জেনারেল শরীফের ভূমিকা যেভাবে শক্তিশালী রূপ ধারণ করছে, তাতে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের উদ্বিগ্ন বোধ করার কথা। তবে সামরিক বাহিনীর পুরোদস্তুর ক্ষমতা দখল করে বসবে, তেমন সম্ভাবনা তাকে শঙ্কিত করছে না। কারণ, সে সম্ভাবনা এখন তেমন জোরালো নয়। আপাতত ক্ষমতা ভাগাভাগির এই ব্যবস্থায় দুই শরীফেরই সন্তুষ্ট থাকার কথা।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে