১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নেতৃত্বে পরিশীলিত রাহুল

  • সিফাত চৌধুরী

ভারতের কংগ্রেস দলের সহ সভাপতি রাহুল গান্ধী জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান খুঁজে পাচ্ছেন। দল পরিচালনা ও নেতৃত্ব প্রদানে ক্রমশ পরিশীলিত ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছেন। দলে নতুন প্রাণ সঞ্চার করার চেষ্টা করছেন। বক্তব্য পরিবেশনা ও বক্তৃতা প্রদানের ক্ষেত্রে রপ্ত করছেন নতুন স্টাইল। এই যুব নেতার নেতৃত্বগুণে উজ্জীবিত হয়ে উঠছে দলীয় কর্মীরা।

সম্প্রতি সমাপ্ত ১৬তম লোকসভা অধিবেশনে রাহুল তার প্রথম এবং এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বিজয় অর্জন করেন। বিজয়টা হলো জমি হুকুমদখল সংশোধনী বিল লোকসভা অধিবেশনে উঠতে না দেয়া। ২০১৩ সালের জমি হুকুমদখল আইনটি বলতে গেলে রাহুলের ব্যক্তিগত উদ্যোগের ফসল এবং তা মনমোহন সিংয়ের আমলে পাস হয়। আইনটির সংশোধনী বিল বর্ষা অধিবেশনে তোলা হচ্ছে জানতে পেরে রাহুল স্ট্র্যাটেজি তৈরি করেন। ঠিক হয় তিনি নিজে লোকসভায় হাঙ্গামায় নেতৃত্ব দেবেন। অন্যদিকে একই সময় যুব কংগ্রেস রাজপথে নামবে এবং ললিত মোদীকে সাহায্য করার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করবে। পরিকল্পনা মতো সবই হয়েছিল এবং তা সফল হয়েছিল। লোকসভার ৪৩ জন সদস্যকে নিয়ে রাহুল এই ইস্যুতে নরেন্দ্র মোদি সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করেছিলেন। এটা ছিল তার নিজের জন্য এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক বিজয়। এ বিজয় যেমন তাকে তার ব্যক্তিগত কিছু সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে, তেমনি আগামী রাজ্যবিধান সভার নির্বাচনঅবধি দলের দিকনির্দেশনা দিতেও সহায়ক হয়েছে। লোকসভায় নীরব-নিশ্চুপ থাকার বদনাম তিনি ঘোচাতে পেরেছেন। বাজেট অধিবেশনে তিনি ১০ দিনের মধ্যে ৩ বার বক্তব্য রেখেছেন। বেশকিছু রাজ্যে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে বক্তৃতা করেছেন। কাজের নতুন ধারা চালু করেছেন। দলীয় নেতাকর্মীরা তার কাছে সহজে পৌঁছতে পারছে, কথা বলতে পারছে। রাহুলের ব্যক্তিগত সেল নম্বর এখন কংগ্রেসের সকল রাজ্য শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের কাছে আছে। তারা প্রয়োজনীয় যে কোন মুহূর্তে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে। তার কাজের নতুন ধারা সর্বস্তরে অনুঘোটক হিসেবে কাজ করছে।

প্রতিদিন সকাল সাড়ে আটটা থেকে রাত দুটা পর্যন্ত কাজ করেন রাহুল। রোববারও বাদ নেই। কোন্ কোন্ ইস্যুতে কি কি স্ট্র্যাটেজি অনুসরণ করতে হবে, সেই নির্দেশ তিনি টেলিফোনে জানিয়ে দেন। যে কোন দিনে কংগ্রেস সভাপতির সঙ্গে যত লোক দেখা সাক্ষাত করে, তার চেয়ে বেশিসংখ্যক লোক দেখা করে রাহুলের সঙ্গে। রাহুল এখন আর স্থায়ী কোন রাজনৈতিক টিমের ওপর নির্ভর করে না। তার বদলে বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিশেষজ্ঞদের, মতামত শুনলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই দিয়ে থাকেন। তারপরে আর দোদুল্যমানতা দেখান না। কতিপয় সিনিয়র নেতা সুষমা স্বরাজ, বসুন্ধরা রাজ ও শিবরাজ সিং চৌহানের পদত্যাগের দাবিতে লোকসভা অচল করে দেয়ার কৌশলের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। রাহুল ধৈর্য্য ধরে তাদের বক্তব্য শুনেছেন। কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাপার হলো, রাহুল তার উপস্থিত বক্তৃতা দেয়ার ক্ষমতাকে শাণিত করার চেষ্টা করছেন। তিনি মোদি ও কেজরিওয়াল এ দু’জনের বক্তৃতার স্টাইলের মিশ্রণ ঘটিয়ে এক নতুন ধারার বক্তৃতার ঢং তৈরির চেষ্টা করছেন। লোকে সেটা পছন্দও করছে। পার্টির জন্য এক নতুন ‘কোর গ্রুপ’ তৈরিরও প্রয়াস পাচ্ছেন তিনি এবং সেজন্য উপযুক্ত লোকজন সংগ্রহ করছেন। গত জুন মাসে দিল্লীতে বিক্ষোভরত একদল স্যানিটেশন কর্মীর মধ্যে এক মহিলার বক্তৃতা শুনে তিনি এত মুগ্ধ হন যে, তাকে সঙ্গে সঙ্গে দলে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেন। কেরালায়ও এক জেলে তাকে অনুরূপভাবে মুগ্ধ করেছিল। রাহুলের সমর্থকরা বলে, এ ধরনের লোকজন নেয়ার ফলে দলের পরিধি প্রসারিত হবে। স্থানীয় সাংগঠনিক কাঠামো জোরদার করার জন্য এটা আরও বেশি প্রয়োজন।

রাহুলের আরেক স্ট্র্যাটেজি হলো, কোন রাজ্য সফরের গেলে সেখানকার তরুণ ও নবীন নেতাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া। উদ্দেশ্য হলো, দলের জন্য তাদের ভিশন, তাদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লক্ষ্য ও আশা আকাক্সক্ষা বোঝার চেষ্টা করা। তবে কোন কোন রাজ্যের নেতারা এতে নিজেদের উপেক্ষিত ভাবায় অসন্তুষ্ট। সে কারণে সেখানে এই কৌশল পরিহার করেছেন তিনি।

আগামী দু’বছরে সেসব রাজ্যে নির্বাচন হবে সেখানেই রাহুলের জন্য মস্তবড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে বেশিরভাগ রাজ্যে নির্বাচন হবে। এ মুহূর্তে দলীয় অবস্থান বিচারে বলা যায় যে, এসব স্থানের নির্বাচনে সংগ্রেসের শোভন কোন ফলাফল অর্জন করার সম্ভাবনা ক্ষীণÑজয়লাভের প্রশ্ন তো ওঠেই না। দলের নির্বাচনী সম্ভাবনা যাই থাক, রাহুলকে কংগ্রেসের সভাপতি পদে নিযুক্তিতে বিলম্ব হওয়ার জন্য দলীয় কর্মীরা অধৈর্য হয়ে উঠছে। সহকর্মীরা বিলম্বের কারণ হিসেবে বলেন, রাহুল দলের প্রবীণ নেতাদের সঙ্গে ব্যবধান ঘুচিয়ে ফেলার চেষ্টা করছেন। তিনি সুষ্ঠু ও মসৃণ পন্থায় উত্তরণের অপেক্ষায় আছেন। তিনি চাইছেন, প্রবীণ নেতারা তাকে স্বেচ্ছায় মেনে নেবেন।

দলের সভাপতি হওয়ার যোগ্যতা যে রাহুলের আছে, সে ব্যাপারে অনেকেরই সন্দেহের কোন অবাকাশ নেই। এটুকু অন্তত নির্দ্বিধায় বলা যায়, ভারতের প্রতিটি রাজ্য সম্পর্কে রাহুল যত সুগভীর ইতিহাসগত ও সামাজিক জ্ঞানের অধিকারী, তেমন জ্ঞান খুব কম সংখ্যক ভারতীয় নেতারই আছে।

সূত্র : ইন্ডিয়া টুডে

নির্বাচিত সংবাদ