২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কৃষি জমিতে কোন স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না

  • সুরক্ষা আইনের খসড়া তৈরি করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়

তপন বিশ্বাস ॥ সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদ- এবং ৫০ লাখ টাকার জরিমানার বিধান রেখে কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের খসড়া তৈরি করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়। দেশের সকল কৃষিজমি শুধু কৃষি কাজেই ব্যবহার করতে হবে। এতে কোন কৃষিজমিতে সকলপ্রকার স্থাপনা নির্মাণের ওপর নিষেধজ্ঞা আরোপ থাকছে। দুই বা তিন ফসলি জমি সরকারও অধিগ্রহণ করতে পারবে না বলে আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে।

ইতোপূর্বে কৃষিজমি সুরক্ষা আইনের খসড়া তৈরি করলেও আদালতে মামলা দায়েরের কারণে তা আটকে যায়। পরে আদালতের নির্দেশ মোতাবেক বর্ধিত কমিটি নতুন করে আইনের খসড়া তৈরি করে। এই খসড়ার ওপর গত ২ সেপ্টেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়। এই বৈঠকে আইনের এই খসড়াটি প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়। এটি এখন ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে মন্ত্রিসভা বৈঠকে উত্থাপনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, প্রতিনিয়ত কমছে দেশের কৃষিজমি। দিন দিন বাড়ছে জনসংখ্যাও। কৃষিজমি কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। প্রতিবছর দেশের ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর চাষাবাদ যোগ্য জমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়ার প্রেক্ষিতে এ আইন করা হচ্ছে।

কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, কৃষিজমিতে আবাসন, শিল্প কারখানা, ইটভাঁটি বা অন্য কোনরকম অকৃষি স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। জমি যে ধরনেরই হোক না কেন, তা কৃষিজমি হিসেবেই ব্যবহার করতে হবে। দেশের যে কোন স্থানের কৃষিজমি এই আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত হবে এবং কোনভাবেই তা ব্যবহারে পরিবর্তন আনা যাবে না। কোন অবস্থাতেই উর্বর জমিতে কোন স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেয়া যাবে না। যেকোন ধরনের জমির শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না। আইনে বিচার ও দ- হিসেবে বলা হয়েছে, আইন লঙ্ঘনকারী বা সহায়তাকারীর সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদ- বা সর্বনিম্ন ২০ হাজার থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদ- কিংবা উভয় দ-ে দ-িত হবে। এই আইনের অধীনে অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপোসযোগ্য হবে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তা কিংবা বন ও মৎস্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মামলা করতে পারবেন।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কৃষিজমি সুরক্ষার জন্য ন্যাশনাল ল্যান্ড জোনিং প্রকল্পের (ফেজ-২) মাধ্যমে ভূমির শ্রেণী অনুসারে জোনিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের প্রথম পর্বে উপকূলীয় ১৯ জেলাসহ ২১ জেলায় জোনিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে পার্বত্য জেলা ছাড়া অবশিষ্ট ৪০ জেলায় জোনিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হচ্ছে ১৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ প্রকল্পের আওতায় ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

সূত্র জানায়, তিন-চতুর্থাংশ মানুষ সরাসরি কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। এই তিন-চতুর্থাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চলে কৃষি উৎপাদন ও কৃষি বিপণন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে। বাংলাদেশে বর্তমানে অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প, শিল্পায়ন এবং নগরায়নের ফলে ক্রমশ কমছে কৃষিজমির পরিমাণ। পরিসংখ্যান বলছে, মোট ৮ দশমিক ৫২ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমি আছে। এ জমিতেই দেশের কৃষকরা কৃষিপণ্য উৎপাদন করে থাকেন এবং দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণ হয় এ জমিতে উৎপাদিত খাদ্যশস্যে। কিন্তু প্রতিবছর দেশের ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর চাষাবাদযোগ্য জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।

১৯৭৬ সালে বাংলাদেশে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৭৬২ মিলিয়ন হেক্টর। গত ৩৮ বছরের এ জমির পরিমাণ কমেছে ১ দশমিক ২৪২ মিলিয়ন হেক্টর। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়নের জন্য কৃষিজমি অকৃষিতে পরিণত হচ্ছে। শিল্পায়ন ও আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলার জন্য কি প্রকারের ভূমি ব্যবহার করা দরকার সে বিষয় নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলে মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমি কমতে কমতে প্রান্তসীমায় এসে দাঁড়িয়েছে। এভাবে কৃষিজমি কমতে থাকলে দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির সম্মুখীন হবে।

বাংলাদেশে ১ কোটি ৭৬ লাখ ৮০৪ কৃষক পরিবার রয়েছে। তাদের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগই প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক। কৃষিজমি অকৃষিতে রূপান্তরিত হওয়ায় এ প্রান্তিক কৃষকরা সংসারের হিসাব মিলাতে পারছেন না। এসআরডিআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিভাগওয়ারি অকৃষি খাতে জমি চলে যাওয়ার প্রবণতা চট্টগ্রাম বিভাগে বেশি। চট্টগ্রাম বিভাগে প্রতিবছর ১৭ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। অন্যান্য বিভাগের বেলায় দেখা যাচ্ছে রাজশাহী বিভাগে ১৫ হাজার ৯৪৫ হেক্টর, ঢাকায় ১৫ হাজার ১৩১ হেক্টর, খুলনায় ১১ হাজার ৯৬ হেক্টর, রংপুরে ৮ হাজার ৭৮১ হেক্টর, বরিশালে ৬ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমি প্রতিবছর অকৃষিজমিতে পরিণত হচ্ছে। কৃষিজমি অকৃষিজমিতে পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়ন। আর কিছু জমি অকার্যকর হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিকভিত্তিতে চাষাবাদের কারণে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশের মোট ভূমির পরিমাণ ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৬৩ হাজার একর। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমি রয়েছে মাত্র ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এর এক-চতুর্থাংশই এখন হুমকির মুখে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা গেছে, বছরে বাড়ছে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ। দিনে ২২০ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি অকৃষি খাতে যাচ্ছে, বছরে কমছে ৮২ হাজার হেক্টর জমি। যা মোট জমির এক ভাগ। বছরে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে এক হাজার হেক্টর জমি। ৮০ শতাংশ সরকারী খাস জমিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। নির্মাণ কাজের কারণে বছরে বিলীন হচ্ছে তিন হাজার হেক্টর জমি। গত ৩৭ বছরে শুধুমাত্র ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার একর জমিতে।

কৃষিজমি কমার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে বাড়িঘর তৈরি। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বসতবাড়ির সংখ্যা ছিল দুই কোটি সাড়ে ৪৮ লাখ। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বসতবাড়ির সংখ্যা তিন কোটি ২১ লাখ ৭৩ হাজার ৬৩০। বসতবাড়ি এলাকার পরিমাণ ১৯৯৬-২০০৮ সময়ে তিন লাখ ৫২ হাজার একর থেকে বেড়ে ছয় লাখ ৭৭ হাজার একরে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ‘বিশ্ব উন্নয়ন সূচক ২০০৯’ থেকে জানা যায়, ১৯৯০ সালে দেশের ২০ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করত। ২০০৭ সালে তা বেড়ে হয় ২৭ শতাংশ। বৃদ্ধির এই হার দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নতুন নতুন শহর হচ্ছে। বাড়ছে রাস্তাঘাট। রাস্তাঘাটের বড় অংশই হচ্ছে কৃষিজমিতে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১২ অনুযায়ী, ২০০১ সালে দেশে জাতীয় মহাসড়কের পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৮৬ কিলোমিটার। বর্তমানে জাতীয় মহাসড়ক আছে তিন হাজার ৫৪৪ কিলোমিটার। আঞ্চলিক মহাসড়ক চার হাজার ২৭৮ ও জেলা সড়ক রয়েছে ১৩ হাজার ৬৫৯ দশমিক ১৩ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে সড়ক ও জনপথের রাস্তার পরিমাণ ২১ হাজার ৪৮১ কিলোমিটার। এলজিইডির ৮০ হাজার ১১৯ কিলোমিটার পাকা সড়ক রয়েছে।

সূত্র জানায়, জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০১০’ এবং ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন ২০১০’ অনুসারে কৃষিজমি কৃষিকাজ ব্যতীত অন্যকোন কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কোন কৃষিজমি ভরাট করে বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা, ইটভাটা বা অন্যকোন অকৃষি স্থাপনা কোনভাবেই নির্মাণ করা যাবে না উল্লেখ থাকলেও প্রতিনিয়তই কৃষিজমি ব্যবহৃত হচ্ছে অকৃষি কাজে। প্রতিদিন দেশে গড়ে ২২০ হেক্টর কৃষিজমি ব্যবহৃত হচ্ছে শিল্প-কারখানা স্থাপন, নগরায়ন, বসতবাড়ি তৈরি ও রাস্তাঘাট নির্মাণের কাজে। এর ফলে সামগ্রিক পরিবেশের ওপর যেমন হুমকি সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি দ্রুত সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে দেশের কৃষি খাত। এ প্রেক্ষাপটে সারা দেশেই ল্যান্ড কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।