২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাবলিক ভার্সিটিতে অসন্তোষের মাত্রা বাড়ছে

  • বিক্ষোভ মিছিল কর্মবিরতি মানববন্ধন চলছে;###;বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষকরা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ নতুন বেতন কাঠামোয় স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা খুশি হলেও অসন্তোষের মাত্রা বাড়ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ ও স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবিতে মঙ্গলবারের কর্মবিরতির পর বুধবারও বিক্ষোভ, মানববন্ধন কর্মসূচী পালন করেছেন শিক্ষকরা। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ বলছেন, তারা বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এদিকে শিক্ষকদের আন্দোলন নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্দোলন শুরু করেছেন কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি। কর্মবিরতির ডাক দিয়ে মিছিল সমাবেশ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। বেতন স্কেলে সিলেকশন গ্রেড, টাইমস্কেল বাদ দেয়ার প্রতিবাদে আজ দেশের সরকারী কলেজসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে কর্মবিরতি পালন করবে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি।

আগের দিনের মতো বুধবারও কর্মসূচী থেকে শিক্ষকরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, আমরা বৈষম্য দূরীকরণ কমিটির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। ওই কমিটির সিদ্ধান্ত সন্তোষজনক না হলে আবারও আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে। পে স্কেল নিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে টানা তিন মাস ধরে শিক্ষকদের এ আন্দোলনের ফলে সেশনজটের আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। জানা গেছে, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া অভ্যন্তরীণ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকায় অনেক দিন ধরেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছিল দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। কিন্তু সদ্য ঘোষিত জাতীয় বেতন কাঠামোয় বেতন-মর্যাদা নিশ্চিতসহ চার দফা দাবিতে সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একযোগে আন্দোলন শিক্ষার পরিবেশকে ঠেলে দিচ্ছে অনিশ্চয়তার দিকে। বেতন কাঠামোতে শিক্ষকদের মর্যাদা ‘অবনমনের’ প্রতিবাদ ও স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর দাবিতে তিন মাস যাবত আন্দোলন চলছে। এই সময়ে কয়েক দফা অর্ধ দিবস কর্মবিরতি ছাড়াও প্রতিবাদ সমাবেশ, মিছিল, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচী পালন করেছেন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। এরপর মঙ্গলবার পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেছেন তারা। এদিন সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা পুরোপুরি বন্ধ ছিল। গত ছয় বছরে মঙ্গলবারই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘোষিত কোন ছুটির বাইরে ক্লাস ও পরীক্ষা পুরোপুরি বন্ধ থাকল। সরকার তাদের দাবি মেনে না নিলে লাগাতার কর্মবিরতিতে যাওয়ার হুমকিও এসেছে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে। ফলে নতুন করে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টির তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোতে। শিক্ষক নেতারা বলছেন, বেতন কাঠামো মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পরও শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ‘পর্যালোচনার’ আশ্বাসে তাদের ক্ষোভের আগুন যখন কিছুটা স্তিমিত হচ্ছিল ঠিক সেই মুহূর্তে অর্থমন্ত্রীর এক বক্তব্য উত্তেজনা বাড়িয়েছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের সবচেয়ে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী জ্ঞানের অভাবে আন্দোলন করছে। এই কর্মবিরতির কোন জাস্টিফিকেশন নেই। তারা জানেই না পে-স্কেলে তাদের জন্য কী আছে, কী নেই। তার এ বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া মাত্রই পাল্টা বক্তব্য আসে শিক্ষকদের কাছ থেকে। রাতেই বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্যকে ‘অনভিপ্রেত এবং অসংলগ্ন’ আখ্যায়িত করেন। তারা বলেন, তিনি (অর্থমন্ত্রী) জনগণের নয়, বরং আমলাদেরই প্রতিনিধিত্ব করছেন।

বুধবারও ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। হয় আমাদের দাবি সরকার মেনে নেবে, না হয় লাগাতার কর্মবিরতিসহ আরও কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হব আমরা। তবে সরকার শিক্ষকদের দাবি মেনে নিলে প্রয়োজনে অতিরিক্ত ক্লাস এবং ছুটির দিনে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা রেখে হলেও শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

শিক্ষক নেতারা বলেছেন, ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষার্থীরা যে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, সরকার আমাদের দাবি মেনে নিলে আমরা তা পুষিয়ে দেব। কারণ শিক্ষার্থীরা বিপদে পড়ুক, এটা আমরা কখনই চাই না।

এদিকে স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো ছাড়াও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রতিবাদে বুধবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি মিছিল সমাবেশ করেছে। বুধবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে অর্থমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যকে মানহানিকর অভিহিত করে বক্তব্যের প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশে এ বক্তব্য রাখেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. কাজী এসএম খসরুল আলম কুদ্দুসী। সমাবেশে তিনি বলেন, সকল বিশ্ববিদ্যালয়েরই নিজস্ব আইন আছে। এ আইন দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতির বিষয়গুলো আইনের মাধ্যমেই হয়। আন্তর্জাতিক জার্নাল, উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পদোন্নতি লাভ করে। এখানে দুর্নীতির কোন সুযোগ নেই অথচ তিনি শিক্ষকদের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়েছেন। অর্থমন্ত্রী একসময় সরকারী আমলা ছিলেন। তিনি স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের সময়ে মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। শিক্ষকদের দুঃখ তিনি কী করে বুঝবেন। অর্থমন্ত্রীর প্রতি উদ্দেশ করে তিনি বলেন, বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। বাড়াবাড়ি করলে আপনার অতীত বেরিয়ে আসবে। তখন লজ্জায় মুখ দেখাতে পারবেন না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুব্ধ শিক্ষকরা অর্থমন্ত্রীকে বয়স্ক মানুষ হিসেবে অভিহিত করে পদত্যাগেরও পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অর্থমন্ত্রী যদি অবিলম্বে তার এ বক্তব্য প্রত্যাহার না করেন তাহলে স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোর দাবিতে শিক্ষকদের চলমান আন্দোলনের সঙ্গে অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টিও যুক্ত হবে। শিক্ষকরা আরও বলেছেন, শিক্ষকরা টাকার জন্য নয়, সম্মানের জন্য শিক্ষকতা করে। বঙ্গবন্ধু শিক্ষকদের সম্মান করে বিশ্ববিদ্যালয় এ্যাক্ট চালু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় ঘোষিত এ্যাক্টের বিরুদ্ধে কথা বলার দুঃসাহস কারও থাকতে পারে না।

অর্থমন্ত্রী কীভাবে পান তা খতিয়ে দেখতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। চবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোঃ আবুল মনছুরের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. বেণু কুমার দে, অধ্যাপক ড. অরুণ কুমার দেব, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন, অধ্যাপক ড. জ্ঞানবোধি ভিক্ষু, অধ্যাপক ড. সুকান্ত ভট্টাচার্য, অধ্যাপক মোঃ ইকবাল শাহীন খান, অধ্যাপক এবিএম আবু নোমান, অধ্যাপক একেএম তফজল হক প্রমুখ।

বেতন কাঠামোতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবমূল্যায়নের প্রতিবাদ ও স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ করে কর্মবিরতির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) শিক্ষক সমিতি। দাবি না মানায় বুধবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের মাইক্রোবায়োলজি গ্যালারিতে এক জরুরী সভা অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. খন্দকার শরীফুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সহযোগী অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ ইকবালের সঞ্চালনায় ওই সভায় ১৩২ শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। বাকৃবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. খন্দকার শরীফুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে অনির্দিষ্টকালের এই কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে। বুধবার বিভিন্ন অনুষদে পরীক্ষা চলাকালীন ওই সিদ্ধান্ত হওয়ার পরপরই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার খাতা নিয়ে নেয়া হয়। ফলে হল থেকে বের হয়ে আসে শিক্ষার্থীরা। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভেতর দ্বিমুখী প্রতিক্রিয়া বিরাজ করছে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করেছে শিক্ষক সমিতি। পূর্ব ঘোষণা বুধবার সকাল থেকে কুবি শিক্ষক সমিতি এই কর্মবিরতি শুরু করে। শিক্ষকদের এই আন্দোলন চলবে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। বেতন কাঠামোতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবমূল্যায়ন ও স্বতন্ত্র বেতন স্কেল ঘোষণার দাবিতে মঙ্গলবার এই কর্মসূচীর ঘোষণা দেয় কুবি শিক্ষক সমিতি। শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে বুধবার ক্লাস ও পরীক্ষা না থাকায় শিক্ষার্থীদের তেমন ক্যাম্পাসে আসতে দেখা যায়নি।

বেতন স্কেল কাঠামোতে শিক্ষকদের ‘অবমূল্যায়নের’ প্রতিবাদ ও স্বতন্ত্র পে-স্কেলের দাবিতে ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।

সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ কর্মবিরতি চলে। এছাড়া সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে সমাবেশ করেন শিক্ষকরা। বেলা ১১টার দিকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে কালো পতাকা উত্তোলন করেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোল্লা আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেনÑ সাধারণ সম্পাদক তপন কুমার সরকার, সহ-সভাপতি তারিকুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোঃ মাহবুব হোসেন প্রমুখ।

আন্দোলনে এবার সরকারী কলেজের শিক্ষকরা, আজ কর্মবিরতি ॥ অষ্টম বেতন স্কেলে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাদ দেয়ার প্রতিবাদে এবার আন্দোলনে নামছে শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের সংগঠন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি।

কর্মসূচীর অংশ হিসেবে আজ দেশের সব সরকারী কলেজ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা দফতরে কর্মবিরতি পালন করা হবে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির মহাসচিব আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে কলেজের অধ্যাপকরা (সর্বোচ্চ পদ) চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা। সিলেকশন ড়্রডে থাকায় এতদিন আংশিক অধ্যাপক গ্রেড-৩-এ যেতে পারতেন। কিন্তু সিলেকশন গ্রেড বাদ দেয়ায় এখন এই পথ বন্ধ হয়ে গেল। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা গ্রেড-৫ থেকে পদোন্নতি পেয়ে সরাসরি গ্রেড-৩ এ উন্নীত হন অথচ শিক্ষকদের বেলায় গ্রেড-৫ থেকে পদোন্নতি হওয়ার পর গ্রেড-৪ এ উন্নীত করা হয়। এই বৈষম্য নিরসনেরও দাবি করে আসছেন তারা। কিন্তু সেটা নিরসন না করে উল্টো সিলেকশন গ্রেড বাতিল করায় শিক্ষকরা আরও বৈষম্যের শিকার হবেন।

এই মাত্রা পাওয়া