২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রাজধানীর ৪৪ নিষ্কাশন খাল বেদখল, দেখার কেউ নেই

  • জলাবদ্ধতার জন্য মূলত পানি উন্নয়ন বোর্ডকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা

শাহীন রহমান ॥ ঢাকা নগরীতে নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার নামে ওয়াসা যেসব পাইপ ও বক্স কালভার্ট বসিয়েছে তা-ই এখন স্থানীয় জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই জলাবদ্ধতার বিস্তার, স্থায়িত্ব ও ভোগান্তির জন্য লোকজন ঢাকা ওয়াসা এবং সিটি কর্পোরেশনকে দায়ী করলেও মূলত দায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড। কারণ আইন ও সরকারী রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী নগরীর নিষ্কাশনের দায়িত্ব তাদের ওপর ন্যস্ত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দেড় ঘণ্টার টানা বর্ষণেই অচল হয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা। এতে রাজধানীর বহু এলাকায় কোমরপানি জমে যায়। ফলে প্রচ- যানজট ও জলাবদ্ধতার কারণে স্থবির হয়ে পড়ে নগরবাসী। নগরীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। আবহাওয়া অফিস জানায়, ওইদিন ঢাকায় দেড়ঘণ্টার ব্যবধানে ৪২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। অল্প সময়ে অতিবৃষ্টিতে ঢাকা ও চারপাশের নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার জলাবদ্ধতার পেছনে সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসার চেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডও কম দায়ী নয়। আইন ও সরকারী রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন বা নিষ্কাশনের দায়িত্ব তাদের ওপরই ন্যস্ত। ঢাকা নগরীর ভেতরের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বড় ধরনের কিছু নিষ্কাশন পাম্প হাউস পরিচালনা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এছাড়াও ঢাকা নগরীর পশ্চিমপাশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ প্রকল্পটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের এবং পূর্বপাশে প্রস্তাবিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ প্রকল্পটিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনেই।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড আইন ২০০০ এবং এর পূর্ববর্তী ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ ৫৯ অনুযায়ী সারা দেশের নদী, নদী অববাহিকা নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন, সেচ ও খরা প্রতিরোধের লক্ষ্যে জলাধার, ব্যারাজ, বাঁধ, রেগুলেটর বা অন্য যে কোন অবকাঠামো নির্মাণ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপরই ন্যস্ত।

নদী, পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক এ প্রসঙ্গে বলেন, ঢাকা নগরীর জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে তার কাজ করতে হবে। সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা বা রাজউকের এই ক্ষমতাও নেই, আইনও নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ড খালের খাসজমি উদ্ধার করে এলাকাভিত্তিক নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত করবে এবং ডিজাইন ও পরিকল্পনা অনুযায়ী তা খনন করবে। তারা প্রয়োজনে নতুন জমি হুকুমদখল করে ব্যাঙ্কক নগরীর মতো খোলা নিষ্কাশন খাল নির্মাণ করবে।

তিনি বলেন, ঢাকা নগরীর ৪৪টি নিষ্কাশন খাল দখল করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। সিএস ম্যাপে এসব খাল খাসজমি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এগুলো মোটেও ব্যক্তিমালাকানাধীন জমি নয়। কিন্তু দলিল জালকারীদের সহযোগিতায় দুর্বৃত্তরা আরএস ম্যাপে সেসব ব্যক্তিগত সম্পত্তি করে নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা এসব দেখেও দেখেনি। ফলে সারা নগরী নিষ্কাশন খালহীন জনাকীর্ণ বস্তিতে পরিণত হয়েছে। এর ওপরই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বসিয়েছে চূড়ান্ত আঘাত।

গত ১ সেপ্টেম্বর বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার বিষয়ে সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন এর মূল কারণ হিসেবে বক্স কার্লভার্টকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ঢাকা শহরের যে ড্রেন রয়েছে তার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ১৪টি সংস্থার। কিন্তু একটির সঙ্গে অন্যটির কোন সমন্বয় নেই। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। তিনি বলেন, ঢাকা শহরের যে জলাবদ্ধতা সেটা আজকের সমস্যা নয়। এটা দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীন উদ্যোগের ফসল। একদিকে বক্স-কালভার্ট নির্মাণ করা যেমন ভুল ছিল। আবার যেসব জায়গা দিয়ে পানি নেমে যায় সেখানে হাউজিং ব্যবসায়ীরা বাড়ি নির্মাণ করে পানি নামার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানী ঢাকায় আগে প্রাকৃতিক খালগুলো ছিল ৩০ থেকে ১০০ ফুট পর্যন্ত চওড়া। দুর্বৃত্তরা দু’পাশের জায়গা দখল করেছে ২০ থেকে ৮০ ফুট পর্যন্ত। ১০ থেকে ২০ ফুট অবশিষ্ট খালগুলোতে ওয়াসা পাইপ ও বক্স-কালভার্ট বসিয়ে উপরে সড়ক বা ফুটপাথ নির্মাণ করেছে। কিন্তু বক্স-কালভার্টের অধিকাংশই ফেলে দেয়া ইট-পাথর, বালি, পলিথিন ও আবর্জনায় পরিপূর্ণ। এগুলো দেখার বা পরিষ্কার করার কেউ নেই। এরই ফাঁক দিয়ে পয়োবর্জ্যের প্রবাহ খাল ও নদীতে গিয়ে পড়ে। বৃষ্টি হলে পানি টানতে পারে না। সৃষ্টি হচ্ছে প্রচ- জলাবদ্ধতা।

তাদের মতে, রাজউকের (রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) দায়িত্ব হচ্ছে ঢাকা নগরীকে পরিকল্পনা মাফিক গড়ে তোলা। এই সংস্থা তা না করে এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা করেছে। ২০০৫ সালে ঢাকা মহানগরীর জন্য একটি ডিটেইলড এরিয়া প্লান (ড্যাপ) করার কাজ হাতে নেয়। ২০১০ সাল নাগাদ ড্যাপ পরিকল্পনায় দুটি ক্ষমার অযোগ্য কাজ হয়ে যায়। বুড়িগঙ্গা ও আশপাশের নদীসহ সারা নগরীর উন্নয়ন পরিকল্পনা আরএস ম্যাপের ভিত্তিতে করা হয়। যার ফলে নদী, খাল ও জলাভূমির বিশাল দখলীকৃত খাসজমি ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে হালাল হয়ে যায়। এছাড়াও ভূমি দস্যুদের স্বার্থে ঢাকা নগরীর পূর্বপাশের জলাভূমি এলাকাকে ভরাট করে শহর করা হয়। বালু নদী তীরবর্তী গ্রাম কেটে জলাভূমি তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। যদিও পরিকল্পনাটি পরে সমালোচনার মুখে অকার্যকর হয়ে গেছে। কিন্তু এতে সর্বনাশ যা হবার হয়ে গেছে। ঢাকা নগরীর উন্নয়নে এখন আর কোন নিয়ম-শৃঙ্খলা বা পরিকল্পনা নেই।

তাদের মতে, এক সময় এই ঢাকা সত্যিই তিলোত্তমা নগরী ছিল। ঢাকা এক সময় খাল, পুকুর, নদী ও জলায় পরিপূর্ণ প্রাচ্যের ভেনিস ছিল। অন্তত বিগত ষাটের দশকেও ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে দ্রুত এর জনসংখ্যা বাড়তে থাকে। অতিরিক্ত এই মানুষের চাপেই ক্রমান্বয়ে আজ বিশ্বের দূষিততম নগরীতে পরিণত হয়েছে। এখন সামান্য বৃষ্টি হলেই রাজধানীবাসীকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একটু বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতায় স্বাভাবিক জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। তার প্রধান কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যাতে বৃষ্টির পানি পড়লেই তা আটকে থাকে। জলাবদ্ধতা দূর করতে যেসব আছে তা ময়লা আর আবর্জনার স্তূপে অকার্যকর।

তাদের মতে জলাবদ্ধতার আরেকটি কারণ হলো, প্রতি বছরই নগরজুড়ে খোঁড়াখুঁড়ির হিড়িক পড়ে যায়। এটি জলাবদ্ধতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পদক্ষেপ নিতেই হবে। গড়ে তুলতে হবে পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা।

এই মাত্রা পাওয়া