২৪ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জলাবদ্ধতা থেকে উত্তরণ

  • আকতার মাহমুদ

বাংলাদেশে মৌসুমী আবহাওয়ার কারণে প্রতিবছর মে, জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গড়ে প্রতিমাসে ১২-১৮ দিন বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এই সময় প্রতিমাসে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ গড়ে ৩০০ মিলিমিটারের বেশি হয়ে থাকে। সুতরাং দেশের উন্নয়ন পরিক্রমায় এই ধরনের বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও পরিকল্পনার বাস্তবায়ন থাকা প্রয়োজন। বিশেষত: বড় শহরগুলোতে পানি নিষ্কাশনে বিশেষ যতœশীল হওয়া প্রয়োজন যেখানে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। ঢাকা শহরে ২০০৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বরে একদিনে বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৩৪১ মিলিমিটার যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বারিপাত। ওই সময় ঢাকা শহরের দুই-তৃতাংশ পানির নিচে ডুবে গিয়েছিল। এ বছর যে কয়েকবার ঢাকা শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে কোনবারেই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দৈনিক ৮০ মিলিমিটার অতিক্রম করেনি। এমনকি কমবেশি ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতে ঢাকা শহরের অনেক এলাকা পানির নিচে চলে যেতে দেখা গেছে। বর্তমানে ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রাজউক তাদের প্রণীত ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনা (ডিএমডিপি) ও ড্যাপ অনুযায়ী ভূমি ব্যবহার বাস্তবায়ন নিশ্চিত না করতে পারার কারণে ঢাকা শহরের আশপাশের জলাভূমি, নিম্নভূমি, নদী-খাল বেদখল হয়েছে এবং বর্ষা মৌসুমে পানি ধারণের স্থান কমে গেছে। ক্যাডাস্ট্রাল সার্ভে (সিএস) ম্যাপ অনুযায়ী ঢাকা শহরের ৫৪টি খাল থাকলেও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়নের কারণে ওয়াসা বর্তমানে মাত্র ২৬টি খাল চিহ্নিত করতে পারে। ডিসিসি কর্তৃক নির্মিত ভূ-উপরিস্থ ড্রেন এবং ওয়াসা কর্তৃক নির্মিত ভূ-গর্ভস্থ ড্রেন ও প্রাকৃতিক খালগুলোর সঙ্গে যথাযথ সংযোগের অভাব রয়েছে। তাছাড়া বর্জ্য অব্যবস্থাপনা ও জনগণের অসচেতনতার কারণেও ড্রেন ও খাল বন্ধ হয়ে গিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। ঢাকার পানি নিষ্কাশন পদ্ধতি, ঢাকার ড্রেনেজ নিয়ে কথা বলতে হলে শুধুমাত্র উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ১৫১ বর্গ কিলোমিটার নিয়ে চিন্তা করলে চলবে না। পানি নিষ্কাশনে ৩১৮ বর্গ কিলোমিটারের ঢাকাকে বিবেচনায় এনে ঢাকাকে মূলত ৩টি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথাÑ ঢাকা পশ্চিম অংশ (১৪৩ বর্গকিমি), ঢাকা পূর্ব অংশ (১১৮ বর্গকিমি) এবং ডিএনডি (৫৭ বর্গ কিমি) এলাকা। এর মধ্যে ঢাকা পশ্চিম অংশ ১৯৮৮ সালের বন্যার পর চারপাশে বাঁধ দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে। ফলে নদীর স্ফীতজনিত বন্যার পানি থেকে এই অংশ বহিস্থ বন্যা থেকে মুক্ত হয়। আর অন্তঃস্থ বৃষ্টির পানি ধোলাই খাল, কল্যাণপুর ও গোরানচাঁদ বাড়িতে অবস্থিত পাম্পের সাহায্যে ঢাকা পশ্চিম অংশের পানি তুরাগ ও বুড়িগঙ্গাতে পাম্প করে ফেলে দেয়া হয়। এই অংশের প্রধান প্রধান খালগুলো হলোÑ দিগুণ খাল, দিয়াবাড়ি খাল, আব্দুল্লাহপুর খাল, বাউনিয়া খাল, কল্যাণপুর খাল ও তার শাখা খাল, হাজারীবাগ খাল, ধোলাই খাল ইত্যাদি। ঢাকা পূর্ব অংশের প্রধান খালগুলো হলোÑ গোবিন্দপুর খাল, বাওথার খাল, বোয়ালিয়া খাল, সুতিভোলা খাল, শাহজাদপুর খাল, বেগুনবাড়ি খাল, মেরাদিয়া খাল, জিরানি খাল, মান্ডা খাল, নড়াইল খাল এবং তাদের শাখা প্রশাখা। এই অংশের পানি প্রাকৃতিক প্রবাহে এই সকল খালের মাধ্যমে বালু নদীতে গিয়ে পড়ে।

আর ডিএনডি এলাকার উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা ও অবহেলার কারণে ১১টি খাল বেদখল হয়েছে এবং এই এলাকায় জলাবদ্ধতা স্থায়ীরূপ লাভ করেছে। এই এলাকা থেকে পানি শীতলক্ষ্যা নদীতে পড়ে।

ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে যে কাজগুলো অত্যাবশ্যকীয়ভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা দরকার তা নিচে আলোকপাত করা হলো-

১. পানির পথ নিরবচ্ছিন্ন ও নির্বিঘœ রাখা

বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি প্রথমে প্রাথমিক ড্রেন হয়ে সেকেন্ডারি ড্রেনে যায়, সেখান থেকে টারসিয়ারী ড্রেন হয়ে প্রাকৃতিক খাল হয়ে আশপাশের লেক, জলাশয় কিংবা ঢাকা শহরের চারপাশের নিম্নাঞ্চল এলাকায় সাময়িকভাবে অবস্থান করে। সেখান থেকে নদীতে চলে যায়। কিন্তু বর্ষায় নদীর পানির উচ্চতা যখন বেশি থাকে তখন এই পানি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নদীতে যেতে পারে না। তখন পাম্প করা প্রয়োজন হয়। শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য প্রথম শর্ত হলো, প্রাথমিক ড্রেন থেকে শুরু“করে একেবারে নদী পর্যন্ত পুরো পথ প্রয়োজনমতো প্রশস্ত ও গভীর হতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পানির পথ নিরবচ্ছিন্নভাবে নির্বিঘœ হতে হবে। বাস্তবতায় দেখা যায়, ঢাকা শহরে প্রতিদিন মোট উৎপাদিত বর্জ্যরে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ঢাকা সিটি কর্পোরেশন সংগ্রহ করে তাদের ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসতে পারে। বাকি প্রায় ২৫০০ টন বর্জ্য প্রতিদিন জমা হয় ড্রেন খাল, বিল, নিচু এলাকা ও নদীতে। ফলে পানির গতিপথ বন্ধ হয়ে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয় এবং জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন তাদের বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে শুধুমাত্র একটি পরিষ্কার ঢাকা শহরই পাব না, এটি শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

২. উন্মুক্ত পদ্ধতিতে খালের ব্যবহার

এ বছর ঢাকায় জলাবদ্ধতা বেশি হয়েছে এমন এলাকাগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, জলাবদ্ধতা হয়েছে এমন এলাকাতে যার পানি নিষ্কাশন আমাদের শহরে নির্মিত বক্স কালভার্টগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত। ধোলাই খাল, সেগুনবাগিচা খাল এবং পান্থপথের ওপর নির্মিত বক্স কালভার্টের ভেতরে পরিষ্কারের অভাবে ময়লা জমে শক্ত হয়ে গেছে। এদের পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা ৮০ ভাগ কমে গেছে। ঢাকা ওয়াসা এবং অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানের একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে এসব বক্স কালভার্ট ভেঙ্গে ফেলতে হবে। পুরনো ভুলকে স্বীকার করে নিয়ে এসব খালকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। খালগুলো জনগণের চোখের সামনে থাকতে হবে যেন ময়লা পড়লে তা দেখা যায়। এসব খাল পুনরুদ্ধার করার মাধ্যমে কাঁঠাল বাগান, রাজাবাজার, কলাবাগান, মগবাজার, শান্তিনগর, সেগুনবাগিচা, পুরান ঢাকার জলাবদ্ধতার উন্নতি ঘটবে। তাছাড়া শহরের সকল খালকে ভবনের পেছনে রেখে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং ভবনের সম্মুখে রেখে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে হবে যাতে এই খালগুলোর অপব্যবহার কেউ করতে না পারে।

৩. ওয়াটার রিটেনশান পন্ড (জলাধার) তৈরি

ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান, ঢাকা মহানগরী উন্নয়ন পরিকল্পনা (ডিএমডিপি) স্ট্রাকচার প্ল্যান ও ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী চিহ্নিত ওয়াটার রিটেনশান পন্ড (জলাধার) ৫৭৩৭ একর জমি এখনি অধিগ্রহণ করে বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য জলাধার সৃষ্টি করতে হবে। বালু নদীর তীর ধরে গোবিন্দপুর খাল ও বাউথার খালের সংস্থলে ১টি, সুতিভোলা খালের শেষ প্রান্তে ১টি, নড়াইল খালের শেষপ্রান্তে ১টি, তুরাগ নদীর তীর ধরে গোরানচাঁদবাড়িতে ১টি এবং কল্যাণপুর খালে শেষ প্রান্তে ১টি মোট ৫টি জলাধারের বাস্তবায়ন ঢাকার জলাবদ্ধতা দূরকরণে অত্যন্ত জরুরী। যেভাবে নিচু এলাকা ভরাট করে নগরায়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে তাতে করে এসব এলাকায় চিহ্নিত ওয়াটার রিটেনশান এলাকা ভরাট হয়ে যাবে। পরে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আর জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফলে ভবিষ্যতে এই শহর স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে যাবে।

৪. আইনি সহায়তা

ঢাকা শহরের দ্রুত নগরায়ণ ও সেইসঙ্গে সঙ্গে নিম্নাঞ্চল ভরাট হয়ে যাওয়ার বাস্তবতাকে অনুধাবন করে এক্ষনি ঢাকা মহানগরী মহাপরিকল্পনায় চিহ্নিত সকল খাল, লেক-জলাশয়গুলো রক্ষা করতে হবে। মনে রাখতে হবে দ্রুত এগুলো রক্ষা করা না গেলে ঢাকা শহরের অস্তিত্ব রক্ষা করা যাবে না। ‘জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০’ এর ৫ নং ধারা অনুযায়ী ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) চিহ্নিত এসব খাল, লেক-জলাশয়গুলোর শ্রেণী কোনভাবে পরিবর্তন করা যাবে না, এমনকি অন্য কোন কাজে ব্যবহারও করা যাবে না। এছাড়া পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫’ এর ধারা ৫ ব্যবহার করে এসব গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়ের হারিয়ে যাওয়া রোধে ‘প্রতিবেশ সঙ্কটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করে রক্ষা করা যেতে পারে। সকল ধরনের আইনি সহায়তা থাকার সত্ত্বেও শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছার ও উদ্যোগের অভাবে ঢাকা শহরের খাল, নদী, পুকুর, লেক ও জলাধারগুলো রক্ষা করা যাচ্ছে না।

৫. নগর সরকার/সমন্বিত কমিটি প্রবর্তন

জলাবদ্ধতা দূর করতে হারিয়ে যাওয়া খাল পুনরুদ্ধার, সচলতা ও ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। শহরের ভূ-উপরিস্থ ড্রেন, ভূ-গর্ভস্থ স্টর্ম ওয়াটার ড্রেন ও খালগুলোর মালিকানা বিভিন্ন সংস্থার অধীনে ন্যাস্ত আছে। এজন্য নির্বাচিত মেয়রদের ‘প্রধান সমন্বয়ক’ ভূমিকায় রেখে ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন ও পেশাজীবী সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে একটি শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। নগর সরকার প্রবর্তন করা গেলে এই কাজটি আরও সহজ হয়ে যায়। অবশেষে এই কথা বলা যায় যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সুশাসন ছাড়া ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন করা সম্ভব নয়। জলাবদ্ধতা নিরসনে মহানগরের ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের প্রস্তাবনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। যথাসময়ে প্রকল্পগুলো না নিতে পারলে পরবর্তিতে সমাধান করতে গেলে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে যায়। ঢাকা শহরের বসবাস যোগ্যতা আজকে হুমকির সম্মুখীন। তাই জলাবদ্ধতার সমস্যা নিরসন ব্যতীত আমাদের প্রিয় শহরের বাসযোগ্যতায় উন্নতি করা যাবে না।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স

অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়