১৬ নভেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার জলাবদ্ধতা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

  • ইশরাত ইসলাম

জলাভূমি, খাল-বিল আর নদী পরিবেষ্টিত এক অপূর্ব নৈসর্গিক পরিবেশে ঢাকার যাত্রা শুরু। সেই ১৯১৭ সালে ঝরৎ চধঃৎরপশ এবফফবং ঢাকা শহরের পরিকল্পনায় জলাশয়, খাল-বিল আর নদী-নালার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি ঢাকার এই জলাভূমিকে শহরের পানি নিষ্কাশন, যাতায়াত ব্যবস্থা এবং চিত্তবিনোদনের প্রয়োজনে নগরের ভূমি বিন্যাসে সম্পৃক্ত করার উপর জোর দিয়েছিলেন। প্রাচ্যের ভেনিস বলে খ্যাত ঢাকা এখন তার নয়নাভিরাম জলরাশির জন্য আদৃত নয়, বরং পুঁতিগন্ধময় জলাবদ্ধতার কারণে নিন্দিত। আমরা যদি একটু গভীরভাবে জলাবদ্ধতার কারণ খুঁজতে যাই তবে কয়েকটি বিষয় উঠে আসে। যেমন জলাশয়, খাল-বিল, নদী-নালা ভরাট, প্রাকৃতিক জল নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে বক্স কালভার্ট নির্মাণ, নগরীর মাঠ ও খোলা জায়গার ক্রমশ সঙ্কোচন এবং নিম্নমানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে বর্জ্যে পূর্ণ নালা ও জলাধার।

ঢাকার মহাপরিকল্পনায় সবসময় প্লাবনভূমি, জলাধার সংরক্ষণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত ঢাকার প্লাবনভূমি বর্ষায় পরিণত হতো অথৈ সাগরে। বন্যার পানি নিষ্কাশনে এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃসঞ্চালনে এই জলাভূমির ভূমিকা অপরিসীম। অথচ সকল পরিকল্পনা, আইনকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তথাকথিত উন্নয়ন ও গৃহায়ন সমস্যা নিরসনের নামে নির্বিচারে গ্রাস করা হচ্ছে জলাভূমি খাল-বিল ও নদী-নালা। জলাভূমি ভরাটের এই মহোৎসব রোধ করা ঢাকার কোন নগর পিতার একার পক্ষে সম্ভব নয়। রাজউক এক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে যদি এই প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিদের সততা, দেশপ্রেম সর্বোপরি কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা থাকে। স্বাধীনতার বিষয়টি এজন্য আসছে কারণ আমাদের সমাজে অতি ক্ষমতাবানদের কাছে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনেক সময়েই অসহায়। তবে সরকার তথা সরকারের কর্ণধার ব্যক্তিরা কোনভাবেই দায় এড়াতে পারবেন না। কারণ দেশের প্রচলিত আইনকানুন, মহাপরিকল্পনা ইত্যাদির প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব। আইন প্রয়োগে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী গাফিলতি করলে বা বাধা দিলে তা কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের একান্ত কর্তব্য।

আমাদের হিসাব করে দেখা দরকার জলাবদ্ধতার কারণে সরকারী বা ব্যক্তিপর্যায়ে যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে তা কি কোনভাবেই জলাভূমি ভরাট করে নগরায়নকে সমর্থন করে? তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কেন রক্ষা করতে পারছে না খাল আর জলাধার। এখানেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় আমাদের আইন ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগে সদিচ্ছা। সভা সেমিনারে সহজেই দায়ী করা যায় কিছু ব্যক্তিকে। অবশ্যই জলাবদ্ধতায় নাকাল নগরবাসীর কাছে তাঁদের দায়বদ্ধতা আছে। তবে নগরবাসী বুঝতে পারে সমস্যার মূল, শাখা-প্রশাখা অনেক গভীরে। যতদিন পর্যন্ত নগরায়নে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রাধান্য পাবে, কতিপয় গোষ্ঠীর অর্থলিপ্সার কাছে উপেক্ষিত হবে মানুষ, সামাজিক মূল্যবোধ ও পরিবেশ; ততদিন প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে আমরা বার বার বিপর্যস্ত হব।

ঢাকার জলাবদ্ধতার আরেকটি অন্যতম কারণ বক্স কালভার্ট করে প্রাকৃতিক খাল ধ্বংস আর এই সব বক্স কালভার্ট এখন ময়লা আবর্জনায় পূর্ণ। ঢাকার মতো শহরে এই ধরনের বক্স কালভার্ট নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখা যে প্রায় অসম্ভব তা অদূরদর্শী নীতিনির্ধারকরা বোঝেননি কিংবা বুঝতে চাননি। এখনও ঢাকার পূর্বাঞ্চলে বক্স কালভার্ট করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। এখন থেকে প্রায় তিন দশক আগে ঢাকার জন্য প্রস্তাবিত ফ্লাড এ্যাকশন প্ল্যানে ঢাকার সবগুলো খাল খননের মাধ্যমে জল নিষ্কাশনের উপযোগী করার কথা বলা হয়েছিল। খালগুলোকে যুক্ত করার কথা ছিল নির্ধারিত জলাধারের সঙ্গে। উন্নয়নের নামে, রাস্তা তৈরির অজুহাতে খাল বন্ধ করেছি। ব্যক্তি বা সমষ্টিগতভাবে খাল দখল করেছি, ময়লা আবর্জনায় ভরেছি।

মনে রাখতে হবে ঢাকা শহরের প্রায় ৪৩% বর্জ্য সংগৃহীত হয় না। যার এক উল্লেখযোগ্য অংশ জলাভূমি, খাল ও নদীতে জমা হয়। নালাগুলো দিয়ে ময়লা আবর্জনার কারণে পানি নিষ্কাশিত হতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে নালার মুখই আবর্জনায় বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের দুই নগরপিতা বর্জ্য নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন, যা পক্ষান্তরে জলাবদ্ধতা নিরসনে সহায়তা করবে এবং সার্বিকভাবে নগরীর পরিবেশ উন্নত করবে। সর্বোপরি নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে আমরা উন্মুক্ত মাটি ক্রমশ হারাতে থাকি। বিশেষত ঢাকায় উদ্যান বা খোলা জায়গা ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। যা জলাবদ্ধতা তথা নগরীর পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এছাড়া বাড়িঘর তৈরির সময় চারদিকে যে খোলা জায়গা রাখার আইন আছে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

জলাবদ্ধতার সমস্যা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। তাই রাতারাতি নিরসন করাও যাবে না। তবে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ এখনই হাতে নেয়া দরকার। যেমন : ১. হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অনতিবিলম্বে ঢাকার নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ২. উবঃধরষবফ অৎবধ চষধহ (২০১১)-এ উল্লেখিত সকল জলাধার, প্লাবনভূমি এবং খালের সীমানা ভূমিতে পিলারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা দরকার। ৩. ২০৩৫ সাল পর্যন্ত যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, ওই পরিকল্পনায় ঢাকার প্লাবনভূমি, জলাধার এবং খালগুলো সংরক্ষণের যথার্থ নির্দেশনা ও পরিকল্পনা থাকতে হবে। ৪. বক্স কালভার্ট তৈরির প্রকল্প আর করা যাবে না। ৫) যুগোপযোগী ও পরিবেশবান্ধব ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন ৬. আবর্জনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া নালাগুলো সংস্কার করা। ৭. সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য অনতিবিলম্বে কাজ শুরু করা। ৮. সংসদ সদস্য এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলরগণ তাঁর এলাকার জলাভূমি রক্ষার দায়িত্বে থাকবেন। এক্ষেত্রে সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর কাছে তারা দায়বদ্ধ থাকবেন।

সর্বোপরি জলাবদ্ধতার মতো সমস্যার সমাধান যথাযথ গবেষণার মাধ্যমে হওয়া একান্ত প্রয়োজন। নগরবাসীকে সম্পৃক্ত করে পরিকল্পনা নেয়া প্রয়োজন। এরইমধ্যে জলাবদ্ধতা নিরসনে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ ফল কেন পাচ্ছি না তা দেখা দরকার। আমাদের মনে রাখতে হবে ২০০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ৩৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিতে কি পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি ও ভোগান্তি হয়েছিল। সেই তুলনায় এবারের বৃষ্টি তেমন কিছুই না। তাই জলাবদ্ধতার কথা শুধু বর্ষায় ভাবলে চলবে না, বিস্তৃত ও সর্বাঙ্গিন পরিকল্পনা প্রয়োজন যেখানে জলাবদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেমনÑ ঢাকা ওয়াসা, রাজউক, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সমন্বিত উদ্যোগে কাজ করতে হবে এবং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অবশ্যয়ই বলিষ্ঠ সমন্বয়কের প্রয়োজন রয়েছে। সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছাই হবে জলাবদ্ধাতা নিরসনের ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশবিদ্যালয়