২৪ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিনেমার আড়ালে

ধ্বংসের পরেই আসে সৃজনের প্রয়াস। সেই প্রয়াসকে সামনে রেখে অতীত জাগ্রত হয় স্মরণের প্রান্তর ধরে। তাতে থাকে বেদনা, যন্ত্রণা, দুঃসময় কিংবা সুসময়। আর সে সময়ের ঘটনাকে কাহিনীর সূত্রে গেঁথে যখন নির্মাণ করা হয় গল্প, উপন্যাস কিংবা চলচ্চিত্র; তাতে বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনারও থাকে মিশেল। কিন্তু সেই মিশেল যদি হয় নেতিবাচক, তবে তার প্রভাবও নেতি হতে বাধ্য, যা জনমনে আধিপত্য স্থাপন করতে পারে নঞর্থক অর্থে। এ প্রসঙ্গের অবতারণা, সাভারের রানা প্লাজার ভয়াবহ দুর্ঘটনা নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘রানা প্লাজা’-কে সামনে রেখে। শুধু বাংলাদেশকেই নয়, বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল রানা প্লাজা ধসের ঘটনা। মানবসৃষ্ট সবচেয়ে ভয়াবহ এই বিপর্যয়ের রেশ এখনও রয়ে গেছে। ২০১৩ সালের এপ্রিলে সংঘটিত ঘটনায় এক হাজারের বেশি মানুষ মারা যায়, যাদের অধিকাংশই ছিল পোশাক শ্রমিক। ধসের সতেরো দিন পরে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া পোশাক শ্রমিক রেশমাকে উদ্ধারের ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হয়। অলৌকিকভাবে বেঁচে থাকা রেশমার মর্মন্তুদ জীবনের ১৭ দিনের ঘটনা ছিল বিস্ময়কর। অনেকে এই ঘটনাকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে মন্তব্য করলেও বাস্তবতা হচ্ছে, রেশমা জীবন্ত উদ্ধার হয়েছেন। কী করুণ, কঠিন, কষ্টকর সময় তাকে পার করতে হয়েছে, তা জানে ভুক্তভোগী রেশমাই। মৃত্যুর মোহনা থেকে ফিরে আসতে পেরেছিল। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে মারা গেছেন দু’জন। সেই আত্মত্যাগ প্রাতঃস্মরণীয় বৈকি! রেশমা উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি বাণিজ্যিক ধারার প্রেমের সিনেমা নির্মিত হয়েছে এই বাংলাদেশে। এ রকম ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমাটি দেশের পোশাকশিল্পের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে হাইকোর্ট ছবিটি প্রদর্শনীর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। ২৫ বিলিয়নের পোশাকশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ুকÑ এটা কারও কাম্য নয়। অবশ্য ‘বারোভাজা’ জনদের সমন্বয়ে গঠিত সেন্সর বোর্ড নামক প্রতিষ্ঠানটির বাস্তবতাবিবর্জিত চেতনার কারণে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর ও নির্মম দৃশ্যসংবলিত ছবিটি ছাড়পত্র পায়। কিন্তু আদালত সেসব দৃশ্যে বাদ সাধে। সে কারণে ধসের ২৮ মাস পর আবারও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় উঠে এসেছে রানা প্লাজার নাম। ভয়াবহ ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়া রানা প্লাজা নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি মুক্তির আগে ছয় মাসের জন্য প্রদর্শনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। আতঙ্কজনক দৃশ্যের কারণে সিনেমাটি নিষিদ্ধ করার জন্য দায়ের করা রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলেছিল, এতে ভয়াবহ নিষ্ঠুর এবং সহিংসতার দৃশ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সিনেমা দেশের পোশাকশিল্পের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ২৫ বিলিয়নের পোশাকশিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় বিশ্বের সবচেয়ে অন্যতম ভয়াবহ শিল্প বিপর্যয়ের কাহিনী নিয়ে বানানো সিনেমাটিতে আতঙ্কজনক দৃশ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা শ্রমিকসহ দর্শকদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা থেকে যায়। পরে সুপ্রীমকোর্ট ছবিটির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। তবে সিনেমায় ব্যবহৃত ভীতিকর দৃশ্য বাদ দেয়ার বিষয়টি স্পষ্ট নয়। ছবিটি পুরোপুরি বাণিজ্যিক। তাই প্রেম, গীত, নৃত্যের ছড়াছড়ি। রানা প্লাজা ছবির মাধ্যমে দেশকে নেতিবাচকভাবে প্রতিফলিত করা হোকÑ তা কারও কাম্য হতে পারে না। সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি ‘পথের পাঁচালী’ সম্পর্কে ভারতীয় নায়িকা নার্গিস দত্ত মন্তব্য করেছিলেন, ভারতের ভয়াবহ দারিদ্র্যকে সিনেমায় তুলে ধরে সত্যজিৎ পুরস্কার পেয়েছেন। সিনেমায় সত্য, বস্তুনিষ্ঠ দৃশ্য উঠে আসুক এটা সবার কাম্য। কিন্তু স্পর্শকাতর নেতিবাচক বিষয় জুড়ে থাকÑ তা কাম্য নয়?