১৫ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইউরোপে এই শরণার্থী স্রোতের শেষ কোথায়?

  • স্বদেশ রায়

শিশু আয়লান কুর্দীর মৃত্যুর থেকেও অনেক বড় হয়ে উঠেছে মৃত আয়লানের ছবিটি। এর আগে ভূমধ্যসাগরে শুধু নয়, ইরাক, সিরিয়া, নাইজিরিয়াসহ অনেক স্থানে এমন অনেক শিশুর নির্মম মৃত্যু হয়েছে আইএসের হাতে। এমনকি বাংলাদেশেও আইএসের সহযোগী জামায়াত-বিএনপির পেট্রোলবোমায় দগ্ধ কিশোর মনিরের ছবি এর থেকে কম নয়। না, তারা কেউ আয়লানের ছবির মতো পৃথিবীকে নাড়া দিতে পারেনি। কেন পারেনি, সে আলোচনা এখন এই আবেগের মুখে নয়। এর জন্য একটু অপেক্ষা করার প্রয়োজন আছে।

আয়লানের ছবি সিরীয় শরণার্থীদের জন্য ইউরোপ, আমেরিকা, ব্রাজিল, কানাডাসহ অনেক দেশের পথ খুলে দিয়েছে। যার ভেতর একটি বড় অংশ এগিয়ে এসেছেন সাধারণ মানুষ, তাদের মানবতা থেকে। এসবই এ মুহূর্তের চলমান ঘটনা। কিন্তু বাস্তবে মানবতার সূর্যরশ্মি বাস্তবতার পৃথিবীতে কতক্ষণ টিকবে? পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ঘিরে যে রাজনীতি: অর্থাৎ, চরম ইসলামিক সন্ত্রাস, অন্যদিকে সন্ত্রাস রোধের পাশাপাশি তেলসহ সম্পদ। আবার সৌদি আরবসহ আমেরিকার কয়েক মিত্রের গোষ্ঠীক্ষমতা রক্ষার স্বার্থ। এই বাস্তবতায় ভূমধ্যসাগরের চড়ায় আয়লানের ছবিতে যে সূর্যরশ্মি পড়েছিল, যা অনেকটা সূর্য শর হিসেবে প্রবেশ করেছে; ইউরোপের সাধারণের মানবতার ভিত্তিমূলে তা কতদিন টিকবে?

শিশু আয়লান কুর্দী যখন মারা গেছে ওই সময়েই কিন্তু সিরীয় শরণার্থী স্রোতের শুরু নয়। এর অনেক আগে থেকে শুরু হয়েছে ইউরোপমুখী এ যাত্রা। যুদ্ধ ও সহিংসতা মানুষকে শরণার্থী করবেই, তাকে উন্মূল করবেই। এ ইতিহাস পৃথিবীর অনেক পুরনো। পৃথিবীর ইতিহাসে শরণার্থীর স্রোত ও অভিজ্ঞতার সারি দীর্ঘ। আমাদেরও রয়েছে এর থেকে চরম কষ্টের এক শরণার্থী শিবিরের অভিজ্ঞতা। ১৯৭১ সালের সে ইতিহাস এক অজানা কারণে চাপা পড়ে আছে। সেদিনের সেই কলকাতাপানের মৃত্যু মিছিলের স্মৃতি যাদের আছে সে কি ভোলার! এক কোটি মানুষ। পানিতে, কাদায়, পাইপলাইনে কোথায় না সেদিন অবস্থান নিতে হয়েছিল!

তাই আজ শিশু আয়লান কুর্দীর মৃত্যুর পর ইউরোপে যে শরণার্থীরা যাচ্ছেন তারা সকলেই যে ভাল থাকবেন এমনটি চিন্তা করার কোন সুযোগ নেই। পাশাপাশি এমন সুযোগও নেই যে সিরীয় অভিবাসী স্টিভ জবসের মতো সকলেই ভবিষ্যতে ইউরোপ বা আমেরিকায় খুব ভাল থাকবেন। আবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বড় দেশ: আমেরিকা, ব্রাজিল ও কানাডা নিচ্ছে খুব কম অভিবাসী। বেশি চাপ পড়ছে ইউরোপের ওপর। এখানেই কিন্তু এই শরণার্থী যাত্রার একটি ভবিষ্যত খোঁজার বিন্দু রেখে যাচ্ছে।

ইউরোপের অর্থনীতি এ মুহূর্তে ভাল নয়। তাছাড়া শুধু সিরিয়া নয়, ইরাকসহ যে সকল দেশ এখন আইএস সন্ত্রাসকবলিত সেসব দেশ থেকেই এখন শরণার্থীরা ইউরোপমুখী হবে। ইউরোপও যখন একবার দরজা খুলেছে তখন আর এই দরজা বন্ধ করতে পারবে না। তাই তাদের দুর্বল অর্থনীতির ওপর একটি বড় শরণার্থীর চাপ আসছে ভবিষ্যতে। আর সে সময়ে তারা শরণার্থীকে কাজ ও ভাল আশ্রয়ও দিতে পারবে না। তাদের সাধ্য সীমিত। এখন অনেকে নিজ নিজ বাড়িতে আশ্রয় দিচ্ছে, এগুলো তখন আর সম্ভব হবে না। পাশাপাশি যে বিষয়টি আরও বড় হয়ে আসবে তা হলো, এসব শরণার্থী তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরতে চাইবে। এমনকি তখন শরণার্থীদের ভেতর থেকে একটি নতুন কাঠামো গড়ে উঠতে পারে যা তাদের নিজ দেশে ফেরার জন্য কাজ করবে। তাদের ওই কাজ ও নিজ দেশে ফেরত যাবার পক্ষে তখন আবার ইউরোপীয় মানবতাকে দাঁড়াতে হবে।

সন্ত্রাসকবলিত মিডলইস্ট বা অন্য কিছু দেশের শরণার্থী ঘিরে এই ভবিষ্যত রেখা দেখা যাচ্ছে। ঘটনা এভাবেই ঘটত। তার ধারাবাহিকতা গত কয়েক মাস ধরে শুরু হয়েছিল। আয়লান কুর্দী নামক একটি এঞ্জেলের মৃত্যু সে ঘটনাকে ত্বরান্বিত করেছে মাত্র। এবং আমেরিকার জন্য অনেক কিছুই দ্রুত এগিয়ে নেবার পথ খুলে দিয়েছে। আমেরিকা এর আগে আফগানে, ইরাকে, লিবিয়ায় যুদ্ধ করেছে ইউরোপ বা ন্যাটোকে সঙ্গে নিয়ে। জাপানসহ পৃথিবীর ধনী দেশগুলোকে ওই যুদ্ধের খরচ যোগাতে হয়েছিল। কিন্তু সেসব যুদ্ধের কোনটাই শেষ হয়নি। এখনও আফগান, ইরাক বা লিবিয়া শান্ত নয়। এর ভেতর সিরিয়ায় তারা গত কয়েক বছর ধরে অনেকটা যুদ্ধকূটনীতিতে এগুতে পারছে না। পাশাপাশি আমেরিকার এই যুদ্ধের সঙ্গে আগে ব্রিটেন, ফ্রান্সসহ অনেক ইউরোপীয় দেশ যেভাবে সহযোগিতা করেছিল এখন তারা সেভাবে করতে পারছে না। কারণ, তাদের দেশের জনমত যুদ্ধের বিরুদ্ধে চলে গেছে। এমনকি আমেরিকার জনমতও এখন যুদ্ধের বিরুদ্ধে।

আমেরিকা ও ইউরোপের জনমত যখন যুদ্ধের বিরুদ্ধে, এ সময়ে ইরাকে, সিরিয়ায়, নাইজিরিয়ায় নতুন ইসলামিক সন্ত্রাসের জন্ম হয়েছে Ñএরা আইএস। অর্থাৎ ইসলামিক স্টেট। এই তথাকথিত ইসলামিক স্টেস্টের নামে তারা নরহত্যা, নারী নির্যাতনসহ নানান অপকর্ম করছে। অন্যদিকে ইউরোপ, আমেরিকা থেকেও তরুণরা পাড়ি দিচ্ছে এই ইসলামিক স্টেট কায়েম করার তথাকথিত যুদ্ধে। এমনকি বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক দেশ থেকেও। যাচ্ছে তরুণীরাও। কিন্তু এ সময়ে তাদের বিরুদ্ধে সার্বিক যুদ্ধ করার মতো বিশ্বজনমত পাচ্ছে না আমেরিকা। অথচ এদের বিরুদ্ধে সার্বিক যুদ্ধ না করতে পারলে কোনমতেই এদের দমন করতে পারবে না। তাছাড়া তেলবাণিজ্যসহ ইউরোপ-আমেরিকার বাইরে যে নতুন অর্থনীতি গড়ে উঠছে, এর বিপরীতে আমেরিকার অবস্থান ধরে রাখার জন্যও তাদের রয়েছে মিডলইস্ট নিয়ে একটি বিশেষ পরিকল্পনা; যে পথে তারা সেই প্রথম বুশের আমল থেকে তথাকথিত ক্রুসেড বলে যুদ্ধে নেমেছে।

তাদের এই অর্থনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার পরিকল্পনা ও ইসলামিক সন্ত্রাস দমন সব কিছুতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল যুদ্ধের বিপক্ষে ইউরোপ ও আমেরিকার জনমত। এই জনমত তৈরিতেই গত কয়েক মাস যাবত যুদ্ধে বিধ্বস্ত মানুষগুলোর আশ্রয়ের স্রোতের পথটি ইউরোপমুখী ঠেলা হয়েছিল। একটি স্রোতও সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত বা আরব আমিরাতমুখী হয়নি। শিশু আয়লান কুর্দীর ছবিটি বিশ্ব মিডিয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়াতে এখন এই স্রোতটি ইউরোপ, আমেরিকা, ব্রাজিল ও কানাডামুখী করতে আরও সহজ হলো। অন্যদিকে মিডলইস্টে আমেরিকার দ্বিতীয় অংশ সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, আরব আমিরাতকে রাখা হলো আগামী বড় যুদ্ধে ব্যবহারের ঘাঁটি হিসেবে।

এখন আমেরিকাকে অপেক্ষা করতে হবে এই শরণার্থী স্রোত আরও বাড়ানো ও শরণার্থী আশ্রয়দাতা দেশগুলোর জনমত তৈরি অবধি। যখন ওই সব দেশে এ জনমত তৈরি হয়ে যাবে যে Ñ শরণার্থীদের সম্মানের সঙ্গে নিজ নিজ দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হোক, তখন আমেরিকা হয়ত এবার শুধু ইউরোপ নয়, ব্রাজিল ও কানাডাকেও পাবে আইএসের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে। আর সে সময় যুদ্ধের ঘাঁটি হিসেবে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত তো ব্যবহার হবেই। পাশাপাশি এশিয়ার কিছু দেশের পত্র-পত্রিকার দিকে নিবিড় দৃষ্টি রেখে যা বোঝা যাচ্ছে, তারাও পাশে থাকবে ওই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে। ইতোমধ্যে সন্ত্রাস তাদেরকেও আঘাত করেছে। তাই আয়লান কুর্দীর মৃত্যুর ভেতর দিয়ে মানবতার দুয়ার খোলা আর জার্মানির ট্রেন স্টেশনের শরণার্থীর হাস্যোজ্জ্বল মুখই শেষ কথা নয়। বরং একটি সর্বাত্মক যুদ্ধই যেন এর শেষ বলে উঁকি দিচ্ছে। শঙ্কা হলো, যুদ্ধ শুরু করা যায়, হয়ত শেষও হয়। কিন্তু যুদ্ধ পৃথিবীকে কোথায় নিয়ে যায় তা কেউ বলতে পারে না। যে যেখানেই গুলি ছুড়ুক ঠিকই খালি হয় একটি মায়ের কোল।

swadeshroy@gmail.com