২৪ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফুটপাথে জন্ম নেয়া শিশু ও মায়ের ঠাঁই হলো পুলিশের কাছে

মাকসুদ আহমদ, চট্টগ্রাম অফিস ॥ রোদে তপ্ত রাস্তা ও ফুটপাথ। শুক্রবার সকাল ১০টা প্রায়। সরকারী ছুটি থাকায় আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার মতো সড়ক অনেকটা ফাঁকা। কিন্তু ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজের টানে অনেকেই ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে চলছিলেন। হঠাৎ মানসিক ও বাকপ্রতিবন্ধী নারী প্রসব বেদনায় ছটফট করছেন ফুটপাথের ওপর। বাদামতলী মোড় সংলগ্ন আখতারুজ্জামান শপিং মল সংলগ্ন জনতা ব্যাংকের সামনেই জন্ম-মৃত্যুর এক সন্ধিক্ষণ।

উৎসুক প্রায় শত পথচারী জটলাবেঁধে কি যেন দেখছে। কেউ বা স্মার্টফোনে ছবি তুলছেন। আবার কেউবা ভিডিও করছে। প্রসব বেদনার যন্ত্রণা কতটা তা শুধু ওই নারীই উপলব্ধি করছেন। আশপাশে থাকা মানুষগুলো নিজেদের ধ্যানে ব্যস্ত। কারণ ওই নারী ফুটপাথেই জন্ম দিয়েছেন এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের। ইটের কংকর আর বালিতে রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এরই মাঝে ছটফট করছে সদ্যোজাত শিশুটি। মা পড়ে রয়েছেন একদিকে আর সন্তান অন্যদিকে। এর ছবি তুলছিলেন উৎসুক ও বিবেকহীন কিছু পথচারী।

এমন সময় ডবলমুরিং থানা পুলিশের একটি টহল টিম দূর থেকে বিষয়টি দেখে এগিয়ে গেল। গাড়ি থেকে ঝটপট নেমে গেলেন এএসআই পল্টু বড়–য়া। বিবেকের তাড়নায় ওই বিষয়টি উপলব্ধি করার আগেই দেখতে পেলেন ফুটপাথের উপর রক্তেরঞ্জিত সদ্যোজাত শিশু ও তার মা। বিষয়টি পল্টু বড়–য়াকে একটু ভাবিয়ে তুলেছে। রাস্তায় নেমেই একটি ট্যাক্সি ডেকে নিলেন। চালককে বললেন, তোমার গাড়ি মোছার কাপড়টি দাও। চালক তার ব্যবহারের একটি গামছা পুলিশের দিকে তুলে ধরলেন। পল্টু বড়–য়া মা ও সদ্যোজাত ফুটফুটে বাচ্চাটি কাপড়ে মুড়িয়ে ট্যাক্সিতে তুলে নিলেন।

বিষয়টি যেহেতু জন্ম-মৃত্যুর খেলা। নীতগত ও আইনী দুটো ঝামেলা পড়ে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সৃষ্টি হতে পারে। তাই থানায় কর্মরত ডিউটি অফিসার এসআই অনুরাধা পালকে ফোনে একটি জিডি রেকর্ড করার জন্য অনুরোধ জানান। কারণ, ফুটপাথে পড়ে থাকা মা ও শিশু উভয়ই ছিল মৃত্যু ঝুঁকিতে। এর পর ট্যাক্সিটি মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে থাকা আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে পৌঁছায় অল্প সময়ের মধ্যে। কর্তব্যরত চিকিৎসক ছিলেন আরেক নারী। পুলিশের কাকুতিমিনতি শুনতে নারাজ এই চিকিৎসক। পেশাগত দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে চিকিৎসক খাটালেন ক্ষমতা। ভর্তির বিষয়টি সম্পূর্ণ না করে দিয়ে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব দেন পুলিশকে। মায়ের ভূমিকা ছেড়ে চিকিৎসক মানবতা ভুলে গিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখালেন নবজাত শিশুটির ক্ষেত্রে।

তবুও নাছোড়বান্দা পল্টু বড়–য়া। কাপড়ে মোড়ানো বাচ্চাটিকে পিতৃত্বের আলিঙ্গে বেঁধে নিয়ে সোজা চলে গেলেন হাসপাতাল পরিচালকের দফতরে। কক্ষে ঢুকতেই পরিচালক পুলিশের কথা শুনেই ওই চিকিৎসককে ফোনে দুয়েক বাক্য শোনালেন। কর্তব্যরত চিকিৎসককে বাধ্য করলেন সঙ্কটাপন্ন পরিস্থিতিতে থাকা মা ও শিশুকে ভর্তিতে। ভর্তি করা হলো শিশুটিকে হাসপাতালের তৃতীয় তলার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। আর মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে গাইনি বিভাগে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনভাবেই বেওয়ারিশ রোগী ভর্তিতে রাজি নয়। তাই ভর্তির নিবন্ধনে অভিভাবকের ভূমিকায় ছিলেন পুলিশের এ কর্মকর্তা। কারণ শিশুটির স্বাভাবিক জন্মগ্রহণের কারণেই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উভয়ই ভালোর দিকে যাচ্ছিল। তবুও শিশু ওয়ার্ডের আর গাইনি বিভাগের ডাক্তাররা বললেন দুয়েকদিন থাকার জন্য। যেহেতু মায়ের অবস্থা একটু দুর্বল। পল্টু বড়–য়া ওই অবস্থায় ভর্তি করে চলে গেলেন আবার কর্মস্থলে। অবশেষে রাত দেড়টায় হাসপাতাল থেকে পল্টু বড়–য়ার মোবাইলে ফোন। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানালেন আপনার রোগী বাচ্চা রেখে চলে যেতে চান। বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে তার গতিবিধি প্রকাশ্যে না হলেও অনুমান করছেন কর্তব্যরতরা। পুলিশ কর্মকর্তা সকালের অপেক্ষায় ডাক্তারকে অনুরোধ জানালেন।

শনিবার সকালে পল্টু বড়–য়া আবারও হাসপাতালে। কর্তব্যরত চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করেন মা ও শিশুর প্রস্থান নিয়ে। সমাধা মেলেনি। কারণ, প্রতিবন্ধী এ নারী ঠিকানা যেহেতু কেউ জানেন না আবার শিশুর দায়ভার নিয়েও শঙ্কায় এই পুলিশ কর্মকর্তা। একপর্যায়ে নিঃসন্তান আপন ভাগ্নি আইভির কথা মনে এলো তার। আইভির সঙ্গে যোগাযোগ করলেন এমন শিশুকে কয়েকদিনের জন্য লালনপালনের দায়ভার নেবে কিনা। মামার কথায় ভাগ্নি রাজি হলেন। মা ও শিশুকে শনিবারই নিয়ে যাওয়া হয় ফটিকছড়ির আবদুল্লাহপুরে। উভয়ই এখন সুস্থ রয়েছেন।

এ ব্যাপারে এএসআই পল্টু বড়–য়া জানিয়েছেন, হৃদয়বিদারক এ দৃশ্য অমানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিভাবে উৎসুক জনতা ভিডিও করছিল স্মার্টফোনে তা এখনও মনে এলে নিজের ভূমিষ্ঠের ক্ষণ মনে আসে। বাঁচানোর তাগিদেই মা ও শিশুকে নিয়ে গেলাম হাসপাতালে। পরে উভয়ের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে চিন্তা করতেই নিঃসন্তান ভাগ্নির কথা মনে এলো। তাই তাদের পৌঁছে দিলাম ফটিকছড়ির আবদুল্লাহপুরে।