২০ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মূল স্রোতে মিশে যায় ছাড়িগঙ্গা

  • অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

ম্যাজিক বক্স চলচ্চিত্রটি বয়োজ্যেষ্ঠদের অনেকের দেখা। গভীর রাত্রে চার তলার এ্যাপার্টমেন্ট থেকে নেমে পথে আসা এক বৃদ্ধ আপন মনে পথ চলতি এক পাহারাদারকে আপন জ্ঞানে বলে চলছে তার মরমীয় মনের কথা। দীর্ঘ দুই যুগের সাধনার অবসান ঘটল এই মাত্র, স্থিরচিত্র চলমান হতে শুরু হয়েছে। এই আবিষ্কারের বদৌলতে সে বিজ্ঞানী। পুরস্কার তাকে ঘিরে ধরবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু তাতে কি সে ফিরে পাবে তার প্রেয়সী স্ত্রীকে, যে বিজ্ঞান সাধনায় স্বামীর নিমগ্নতায় তিতি বিরক্ত হয়ে একদিন ঘর ছেড়েছিল। ফিরে পাবে কি রণাঙ্গনে যাওয়া প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে, যে বাবার বদলি হিসাবে যোগ দিয়েছিল। ফিরে পাবে কি হারানো যৌবন, যা গবেষণায় ব্যয় হয়ে পরিণতিতে আজকের বার্ধক্য। আবিষ্কারের সুফল পাবে তো কোটি কোটি মানুষ, কিন্তু আবিষ্কারকের এই সর্বহারার কি সান্ত¡না হবে! অনেকটা সেভাবেই এক আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত মহাকাশ বিজ্ঞানীর মহাজাগতিক চর্চার প্রমাণের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে এক্সপেরিমেন্টের বলিদান হিসাবে স্ত্রীকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা এবং এক নকশাল বিপ্লবীর নারী লাঞ্ছনাকারীকে প্রতিহত করতে যেয়ে হত্যার সঙ্গে যুক্ত হয়েও আক্রান্ত নারীর জীবনকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে নিজের জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচার এবং পারস্পারিক স্বগোতক্তির নাটক ছাড়িগঙ্গা। যুগ্ম নাট্যকার অমিতরঞ্জন বিশ্বাস ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় রচিত, নির্দেশক-অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নির্দেশিত- অভিনীত, সংস্তব প্রযোজিত নাটক ‘ছাড়িগঙ্গা’ মঞ্চস্থ’ হলো গত ৪ সেপ্টেম্বের গঙ্গা- যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উৎসবের উদ্বোধনী দিনে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায়।

জীবন নাট্যশালায় প্রত্যেকেই যে এক এক জন অভিনেতা- অভিনেত্রী, তা শেক্সপিয়ারের নাটকীয় সংলাপের মধ্যে দিয়ে বহুল শ্রুত। মুশকিলটা হয়, মঞ্চাভিনয়ে আরোপিত চরিত্রের বাইরে গিয়ে অভিনেতা অভিনেত্রী নিজের মতো কিছু করা শুরু করলে। ঠিক সেই কাজটাই করে বসেছেন মহাকাশ বিজ্ঞানী জ্ঞানেন্দ্র। ইংল্যান্ডের নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা, মহাকাশ গবেষণা প্রভৃতি করণীয় কাজ বাদ দিয়ে তিনি দেশে ফিরে গঙ্গার মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছাড়িগঙ্গা বিলের পাশে ভেঙ্গে পড়া প্রাসাদে ল্যাবরেটরি বানিয়ে মহাচৈতন্যের অস্তিত্বের সন্ধানে শুরু করলেন গবেষণা। অধ্যাপনা গেল, গবেষণার সুযোগ বন্ধ হলো আর মাঝখান থেকে অথেনটিক রেজাল্টের আশায় স্ত্রীকে বাধ্য করে ড্রাগ পুশ করায় স্ত্রীও ছাড়িগঙ্গার জলে ডুবে চিরতরে নিঃশেষ হলো। অপর দিকে কেয়ারটেকার গোপেস্বর নামের আড়ালে এক নকশাল যে নিরস্ত্র ব্যবসায়ীকে দলের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও হত্যা করল না অথচ এক অসহায় নারীর আর্তি শুনতে যেয়ে খুন করে বসল নারী লাঞ্ছনাকারীকে। জ্ঞানেন্দ্র যখন উপলব্ধি করল স্ত্রী হত্যার জন্য সেই দায়ী, অনুশোচনায় যখন সে হলো অনুতপ্ত তখনই তার মুক্তি ঘটল। অপরদিকে গোপেস্বর যখন বুঝল তার হত্যা করাটা অন্যায়, কিন্তু সে যে লাঞ্ছনাকারীকে অন্যায় করা থেকে বিরত রাখতে পেরেছে সেটাও এক অর্থে ন্যায় তখন তারও মুক্তি ঘটল। জীবনের বহমানতা থেকে দূরে সরে যাওয়া দুটি মানুষের জীবনের মূল স্রোতে ফিরে আসার মধ্যে দিয়ে শেষ হয় নাটক ছাড়িগঙ্গা।

ছাড়িগঙ্গা নাটক নির্বাচনটাই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নিজেকে আত্মবিস্মৃতি হতে না দেয়া। শৈশবে তেষট্টি দিনের টাইফয়েড আক্রান্ত উচ্চ তাপমাত্রায় জ্বরে জীবন যখন মূল স্রোত থেকে প্রায় সরে যায় তখন যে উপলব্ধি সেই উপলব্ধিইতো এক অর্থে ছাড়িগঙ্গা। ছাড়িগঙ্গা করছি কারণ গঙ্গার মূল স্রোতে মিশতে চাই বলে। অপর দিকে ব্যক্তিজীবনে চলচ্চিত্র মাধ্যমে যে জয় জয়কার, সেখানেও ছাড়িগঙ্গা। চলচ্চিত্র করছি কারণ শিশিরকুমার ভাদুড়ীর দিক নির্দেশনা মেনে মঞ্চের নাট্যাভিনয়কে নিয়ে যাব অভিজাত্য ও শিক্ষিত মহলে। ছাড়িগঙ্গা করছি কারণ বিখ্যাত হবার সস্তা পাতা ফাঁদে পা না দিয়ে অভিনয়টাই শেষ পর্যন্ত করে যাব বলে। ছাড়িগঙ্গা করছি কারণ আশি বছরের চলমান যাপিত জীবনের পঞ্চান্ন বছরের অভিনয় জীবনে সুগম পথ পেয়েছি যতটা ছাড়ও দিতে হয়েছে ততটা বলে। ছাড়িগঙ্গা করছি কারণ শেষ পর্যন্ত কর্ম সম্পাদনের তীব্র ব্যাকুলতা। ছাড়িগঙ্গা করছি কারণ ভুলকে শুধরে সঠিকে আহরণ। ছাড়িগঙ্গা করছি তার সব থেকে বড় কারণ জীবন চলার পথে মাঝে মাঝে থামতে শেখাটাই সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

প্রয়োজন মতই সৌামিক-পিয়ালীর মঞ্চ প্রত্যন্ত গ্রামের ভেঙ্গে পড়া প্রাসাদের মধ্যস্থিত ল্যাবরেটরি ও বিচরণ ক্ষেত্র চিনিয়ে দেয়। বাদল দাসের আলোয় গা ছমছম ভাব এবং অন্তর্দহন ফুটে ওঠে। বিশেষত, ঘরে আগুন লাগার দৃশ্যে ভয়ঙ্করের রূপও যে সুন্দর তা মনে দাগ কাটে। দিশারীর আবহ কেন জানি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিরল ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে জায়গা হারায়। মহঃআলির রূপসজ্জায় রূপে যেন বিশালতা পাওয়া যায়। পোশাকে ঠিক যে কে তা বোঝা গেল না তবু পোশাকের কারণে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে আন্তর্জাতিক মানের বিজ্ঞানী এবং মহাচৈতন্যের পর্যবেক্ষক হিসেবে ভাবতে সুবিধা হয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় তাঁর ব্যক্তিত্বের মতই বুদ্ধিদীপ্ত এবং মাত্রা নিয়ন্ত্রিত।

মাত্রা নিয়ন্ত্রিত অভিনয় দিয়ে যে কিভাবে চরিত্রের বৈশিষ্ট্যকে মাত্রাতিরিক্তভাবে দর্শক হৃদয়ে পৌঁছে দেয়া যায়, তা যেভাবে করে দেখালেন বিজ্ঞানী জ্ঞানেন্দ্র চরিত্রে অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তা এক কথায় অভাবনীয়। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যদি এই চরিত্রে অভিনয় না করতেন, তবে নাটক কেমন হতো তা অজানা। তবে সেক্ষেত্রে নাটকের নাম হতে পারত গঙ্গাযাত্রা কিংবা চরগঙ্গা। অনেক নাটক যেমন অভিনেতা-অভিনেত্রীকে চিনিয়ে দেয় । তেমনি কিছু অভিনেতা অভিনেত্রী নাটককেও চিনিয়ে দেয়। অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নাটক ছাড়িগঙ্গা’কে চিনিয়ে দেয়। অভিনেতা দ্বিজেন বন্দোপাধ্যায়ের রসবোধ এবং অভিনেত্রী পৌলমী বসু’র দৃঢ়তা নাটকের দ্বান্দ্বিকতায় অংশ নেয়। অনুশোচনার অবসানে পুনঃস্বপ্ন নির্মাণের নাটক ছাড়িগঙ্গা শেষ পর্যন্ত মূলস্রোতে মিশে যায়।

এই মাত্রা পাওয়া