২৩ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিনেমার স্টার মেকার হৃষিকেশ মুখার্জী

  • জাফর ওয়াজেদ

ভারতীয় উপমহাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্রতী ছিলেন যেসব বাঙালীজাত নির্মাতা, তিনি তাঁদের অন্যতম। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছেন তিনি। প্রকৃত অর্থে ভারতীয় সিনেমায় ‘স্টার মেকার’ বলে যদি কেউ থেকে থাকেন, তবে তিনিই সেই স্থানটিতে অবস্থান করছেন। নির্মাণ করেছেন যে ক’টি চলচ্চিত্র, সবই সব ধরনের দর্শককেই বিনোদিত করেছিল। চলচ্চিত্র জগতে প্রতিভাধর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের তিনিই প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। প্রতিভাবানদের চিনে নেয়ার মতো জহুরি ছিলেন তিনি। আপাদমস্তক বাঙালী হলেও বাংলা ভাষায় কোন চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি। চিত্র নির্মাণে ছিলেন সব্যসাচী। ক্যামেরা, সম্পাদনা, কাহিনী সংলাপ, গীত পরিচালনা, প্রযোজনাÑ সবই করেছেন এক জীবনে। ৮৪ বছরের জীবনে নিবেদিত ছিলেন রুচি ও শিক্ষাসম্মত চলচ্চিত্র নির্মাণে। সর্বকালের সেরা অভিনেতা ধর্মেন্দ্র, রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চন, অমল পালেকর ও জয়াভাদুড়ির মতো প্রতিভাবানদের তিনিই চলচ্চিত্র জগতে এনে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন।

বাল্যকাল থেকে সিনেমাপাগল হৃষিকেশ জন্মেছিলেন আজ থেকে ১১২ বছর আগে ১৯২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ কলকাতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে বিএ পাস করেন। এরপর স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। বিজ্ঞান ও অঙ্ক বিষয়ের শিক্ষকতায় তার মন ভরছিল না। সৃজনশীলতা তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। আর সেই পথে যাওয়ার জন্য সুযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন। পেয়েও যান একদিন।

কলকাতার নিউথিয়েটার্স স্টুডিওতে যোগ দেন ক্যামেরাম্যান হিসেবে। আর প্রবেশ করলেন চলচ্চিত্র নামক স্বপ্নের জগতে। ক্যামেরার কাজ করতে করতে সংযোগ ও সম্পর্ক গভীরতর হয় খ্যাতিমান চিত্র সম্পাদক সুবোধ মিত্রর। তাঁর কাছ থেকেই চলচ্চিত্র সম্পাদনার কাজ শিখতে শুরু করেন। এরপরে তিনি বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক বিমল রায়ের বিখ্যাত দুটি ছবি দো-বিঘা জামিন ও দেবদাস-এর সম্পাদনার কাজ তিনিই করেন। এভাবেই চলচ্চিত্র জগতে তাঁর পায়ের তলে মাটি ক্রমশ শক্তপোক্ত হতে থাকে। চলচ্চিত্র জগতের সব দুয়ার ঝটপট তাঁর জন্য খুলে যেতে থাকে।

হৃষিকেশ প্রথম একক উদ্যোগে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ১৯৫৭ সালে যখন বয়স তার ৩৫ বছর। ‘মুসাফির’ নামক চিত্রটি তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে অবস্থান সুদৃঢ় করে। ১৯৬০ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘অনুরাধা’। বলরাজ গাহনী ও লীলা লাইডু অভিনীত ছবিটি সে সময় দর্শকদের মনে ভিন্ন ধরনের স্বাদ এনে দিয়েছিল। কাহিনীর ভিন্নতা দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। কাহিনী গড়ে ওঠে এমন একজন বিবাহিত মহিলাকে কেন্দ্র করে, যার স্বামী নিজের আদর্শকে সামনে রেখে তাঁকে ছেড়ে গ্রামে চলে যায়। তখনকার কালে ব্যতিক্রম কাহিনীর ছবিটি বোদ্ধা মহলে জনপ্রিয়তা পেলেও বক্স অফিস হিট করতে পারেনি। তবে লোকসান বা ফ্লপ হয়নি। এই ছবিটির জন্য হৃষিকেশ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে। সম্মান শুধু স্বদেশেই নয় আন্তর্জাতিকভাবেও পেয়েছেন। ‘অনুরাধা’ ছবিটি ১৯৬০ সালে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসব বিশেষ ক্যাটাগরির চলচ্চিত্র হিসেবে সম্মান অর্জন করে।

হৃষিকেশের তৃতীয় ছবিটিই তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। ‘আশীর্বাদ’ নামক অসাধারণ ছবিটি ‘সুপার-ডুপার হিট’ হয়। জাতিভেদ প্রথা ও জমিদারির উপর কুঠারাঘাত হানেন তিনি এই চলচ্চিত্রে। দলিতদের জীবন উঠে আসে সিনেমায় অন্য মোড়কে। পাশাপাশি এক পিতার হৃদয়ের যন্ত্রণাকে তিনি অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সঙ্গে তুলে ধরেন সাদা-কালো পর্দায়। এই সিনেমায় অশোক কুমারের ‘লিপ’-এ ‘রেলগাড়ি ছুক্ ছুক্ ছুক’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। লোকমুখে ফিরত গানটি। গানটির রেকর্ডও প্রচুর বিক্রি হয়। ব্যতিক্রমী আরেকটি ছবি নির্মাণ করেন ক্লাসিক ধাঁচের সিনেমা ‘সত্যকাম’ ১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি ছিল সমকালীন চলচ্চিত্র ধারা থেকে পৃথক। ছবির মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন ধর্মেন্দ্র্র, শর্মিলা ঠাকুর ও সনজীব কুমার। ছবির কাহিনী এক যুবককে কেন্দ্র করেÑ যে কিনা স্বাধীনতার পর এক ভিন্ন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু সে স্বপ্ন সফল হওয়ার পথই পায় না। তাকে হতাশা কুরে কুরে খায়। ছবিটি ব্যবসাসফল না হলেও বোদ্ধা ও শিক্ষিত মহলে বেশ সমাদর পায় এবং সুনাম অর্জন করে। ছবির একটি গান আজও মনে পড়েÑ ‘পান্তাভাতে টাটকা বাইগুনপোড়া’ বাংলা-হিন্দী মিশ্রিত গানটি।

সাহিত্যিক-সাংবাদিক তরুণ কুমার ভাদুড়ি কন্যা জয়া ভাদুড়ি মূলত হৃষিকেশের হাত ধরেই চলচ্চিত্র জগতে প্রতিষ্ঠা পান। তার বিখ্যাত হয়ে ওঠার পেছনে হৃষিকেশের যথেষ্ঠ অবদান ছিল। জয়া প্রথম হিন্দী ছবিতে সুযোগ পান ১৯৭১ সালে ‘গুড্ডি’ ছবিতে। সিনেমাটির কাহিনীতেও ছিল নতুনত্ব। চলচ্চিত্র জগতের প্রতি ছেলেমেয়েদের অবাস্তব ধারণা ও স্বপ্নের জগতের নায়ক-নায়িকাদের প্রতি তাদের অসার আকর্ষণকে নৈপুণ্যের সঙ্গে সেলুলয়েডে তুলে ধরেছেন হৃষিকেশ ‘গুড্ডি’ ছবিতে। ছবিতে ধর্মেন্দ্র নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন। ছোট্ট জয়া সিনেমা দেখতে দেখতে ধর্মেন্দ্রের প্রেমে পড়ে যান। পরে নানাভাবে জয়ার এ মোহ কাটানো হয়। অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন জয়া। উৎপল দত্তের কমিক অভিনয় ছবিটিতে অন্য মাত্রা যোগ করেছিল। বস্তুত এ ছবির পর থেকেই জয়া নেক নজরে পড়েন হৃষিকেশসহ অন্য পরিচালকদেরও। জয়াকে নিজকন্যার মতোই স্নেহ করতেন হৃষিকেশ। জয়াকে নিয়ে এরপর তিনি বাবুর্চি (রাজেশ খান্না), অভিমান (অমিতাভ), মিলি (অমিতাভ) ও চুপকে চুপকে (অমন) ইত্যাদি ছবি নির্মাণ করেন। সবক’টি ছবিই জনপ্রিয় হয়। সেসব ছবির গান এখনও লোকমুখে ফেরে। ৮৪ বছর বয়সে ২০০৬ সালের ২৭ আগস্ট শেষ নিংশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বাঙালী সন্তানটি নানা গুনে ছিলেন গুণান্বিত।

নির্বাচিত সংবাদ