১৯ অক্টোবর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্মরণে সালমান শাহ ভাল আছি, ভাল থেকো...

  • বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের এক ক্রান্তিকালে সুদর্শন ফ্যাশানেবল তরুনের আগমন ঘটে। ১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ ঢালিউডের পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান পরিচালিত ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবিতে অভিনয় করলেন নবাগত এই নায়ক। মানুষ হলে আসলো, ছবিটি দেখল আর মন্ত্রমুগ্ধের মতো আবিষ্কার করল এক মহানায়কের অসাধারণ অভিনয়শৈলী। চলচ্চিত্রপ্রেমীরা হলমুখী হলো, পরিচালকরা আশ্বস্ত হলেন, সুদিন ফিরে এসেছিল বাংলা চলচ্চিত্রের। বাংলা চলচ্চিত্রের ত্রাতা হয়ে একে একে উপহার দিলেন দুর্দান্ত ২৭টি ছবি। তাঁর অভিনীত ৯৫ ভাগ চলচ্চিত্র সুপারহিট এবং ব্যবসা সফল হয়। ঠিক যেন রূপকথার রাজপুত্তুর। এলেন, অভিনয়ের জাদু দেখালেন, আবার সবার মন জয় করে কাউকে কিচ্ছুটি না বলে না ফেরার দেশে চলেও গেলেন। রাজপুত্তুরটির নাম সালমান শাহ। হাজার হাজার ভক্তকূলকে কাঁদিয়ে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থামিয়ে দিলেন তার জীবনরথ। বাংলা চলচ্চিত্রের এই স্বপ্নের নায়কের রূপকথার জীবন তুলে ধরেছেন পান্থ আফজাল

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সর্বকালের আলোচিত ও সুদর্শন নায়ক সালমান শাহ। সালমান শাহের আসল নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন। বাবা কমরউদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী। দুই ভাইয়ের মধ্যে সালমানই বড। ১৯৭০ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটে তার নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছোটবেলা থেকে পড়ালেখার পাশাপাশি মডেলিং ও অভিনয়ের প্রতি তার দুর্বলতা ছিল। চলচ্চিত্রে আসার আগে মডেলিং করেছেন এবং ছোটপর্দার একাধিক নাটকে অভিনয়ও করেছেন। বাংলা সিনেমা যখন ‘জাফর ইকবালের’ মৃত্যুর পর সত্যিকারের একজন সুদর্শন নায়কের খরায় ভুগছে, ঠিক তখনি সালমান শাহ আবির্ভূত হলেন। নবাগত নায়িকা মৌসুমীর সঙ্গে প্রথম ছবিতে জুটি বাঁধলেও পরবর্তীতে শাবনূরের সঙ্গে জুটি গড়ে একের পর এক ব্যবসা সফল ছবি উপহার দেন সালমান। ১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ তার প্রথম ছবি ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ মুক্তির পর মাত্র ৪ বছরের মধ্যেই ২৭টি ছবি করে ফেলেন।

১৯৮৬ সালের দিকে হানিফ সংকেতের গ্রন্থনায় কথার কথা নামে একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো। এর কোন একটি পর্বে ‘নামটি ছিল তার অপূর্ব’ নামের একটি গানের মিউজিক ভিডিও পরিবেশিত হয়। হানিফের সংকেতের স্বকণ্ঠে গাওয়া এই গান এবং মিউজিক ভিডিও দুটোই অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত। একজন সম্ভাবনাময় সদ্য তরুণ তার পরিবারের নানা রকমের ঝামেলার কারণে মাদকাসক্ত হয়ে মারা যায়, এই ছিল গানটার থিম। গানের প্রধান চরিত্র অপূর্বর ভূমিকায় অভিনয়ের মাধ্যমেই সালমান শাহ মিডিয়াতে প্রথম আলোচিত হন। তখন অবশ্য তিনি ইমন নামেই পরিচিত ছিলেন। মিউজিক ভিডিওটি জনপ্রিয়তা পেলেও নিয়মিত টিভিতে না আসার কারনে দর্শক আস্তে আস্তে ইমনকে ভুলে যায়। আরও কয়েক বছর পর অবশ্য তিনি আবদুল্লাহ আল মামুনের প্রযোজনায় পাথর সময় নাটকে একটি ছোট চরিত্রে এবং কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রেও কাজ করেছিলেন। ১৯৯৩ সালের ২৫ মার্চ। ঈদ-উল- ফিতর। হিন্দি কেয়ামত থেকে কেয়ামত ছবির কপিরাইট বৈধভাবে কিনে আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেড পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানকে দিয়ে তৈরি করে কেয়ামত থেকে কেয়ামত। সে সময়কার জনপ্রিয় মডেল আনন্দবিচিত্রা সুন্দরী মৌসুমীর সঙ্গে অভিনয় করেন অপেক্ষাকৃত স্বল্প পরিচিত ইমন। প্রযোজকগোষ্ঠী অবশ্য ততদিনে পারিবারিক নামকে একটু কাটছাঁট করে তার পর্দার নাম ঠিক করেছেন সালমান শাহ।

সালমান সম্বন্ধে শুধু এটুকু বলা যায়, বাংলাদেশী বাংলা ছবির প্রায় ৫০ বছরের ইতিহাসে সেই প্রাচীন আমলে রহমান এবং নায়করাজ রাজ্জাকের পর সালমানই একমাত্র নায়ক যিনি সর্বমহলে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে এবং তরুণদের স্টাইল আইকন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিলেন। বাংলা ছবির নায়কদের মধ্যে সালমান ছাড়া অন্য কারো ফ্যাশন, স্টাইল লোকে তার আগে বা পরে কখনই অনুসরণ করেনি। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী হয়ত অনভ্যাস, সিনেমা হলের পরিবেশ এবং তার অভিনীত ছবিগুলোর মানের কারণে হলে যায়নি, কিন্তু নায়ক হিসেবে সালমানকে বরণ করে নিয়েছিল।

মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার বছরের ক্যারিয়ারে সালমান শাহ নিজেকে যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তা আগামীতে ঢালিউডে কেউ স্পর্শ করতে পারবেন কিনা তাতে সন্দেহ রয়েছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল নায়িকা মৌসুমীর সঙ্গে জুটি বেঁধে নতুন করে চলচ্চিত্র নির্মাতা-প্রযোজককে তিনিই আশার আলো দেখান। সালমান-মৌসুমী জুটি ভেঙে গেলেও সালমান শাহের জনপ্রিয়তা মোটেও ম্লান হয়নি। বরং তার পাশে এসে একাধিক নবীন নায়িকা জ্বলে ওঠেছেন। তাদেরই একজন আজকের সুপারস্টার শাবনূর।

১৯৯৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাতে পরিচালক মতিন রহমানের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সালমান তাকে বলেছিলেন, ‘বাবা, আমি ভাল হয়ে গেছি। আগামীকাল থেকে আর কাউকে কষ্ট দেব না। তোমাদের চেষ্টায় আজ আমি ইমন থেকে সালমান। আগামীকালের সকাল হবে সবার জন্য প্রিয় সকাল।’ ৬ সেপ্টেম্বর সকালে সালমানকে পাওয়া যায় তার রুমের সিলিংয়ে ঝুলন্ত অবস্থায়। প্রিয় নায়কের মৃত্যুশোক সহ্য করতে না পেরে বেশ ক’জন ভক্ত আত্মহত্যা করেন।

কিন্তু সালমান শাহ-এর পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে মা নীলা চৌধুরী কিছুতেই তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে মেনে নেননি। সালমান শাহ-এর মৃত্যুকে ঘিরে জন্ম হয় নানা প্রশ্নের। এক অবাঙালী ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে স্ত্রী সামিরার সম্পর্কের জেরে সালমান খুন হয়েছেন এমন অভিযোগ ওঠে। সালমান যে ব্র্যান্ডের সিগারেট খেতেন সেটি ছাড়া অন্য একটি ব্র্যান্ডের সিগারেট তার ঘরে পাওয়া যায়। প্রতিবেশীদের কয়েকজন তার ফ্ল্যাট থেকে ধস্তাধস্তির শব্দ পাওয়ার কথাও বলেন। সালমান শাহ-এর মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য সমাধানের দাবি এখনও জানিয়ে চলেছেন তার ভক্তরা। সালমান শাহর মৃত্যুর প্রায় দুই দশক হতে চলল। কিন্তু তার জন্য ভক্তদের ভালবাসা এতটুকু ম্লান হয়নি। একজন সালমান ভক্ত হিসেবে শুধু একটাই শুভকামনা- ভাল আছি, ভাল থেকো...

এক নজরে সালমান

নাম : শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন [সালমান শাহ]

রাশি : বৃশ্চিক

উচ্চতা : ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি

জন্মস্থান : সিলেট

জন্ম তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭০

মৃত্যু তারিখ : ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬

বিবাহ : ২০ ডিসেম্বর ১৯৯২

বাবা : কমর উদ্দিন চৌধুরী

মা : নীলা চৌধুরী

ভাই : মো. শাহরান ইভান চৌধুরী

স্ত্রী : সামিরা

পড়ালেখা : এসএসসি (১৯৮৭)-আরব মিশন স্কুল ধানমণ্ডি

আই.কম- আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ

বি.কম- মালেকা সায়েন্স কলেজ ধানম-ি

মোট ছবি : ২৭টি

শখ : দাবা, ক্রিকেট খেলা

প্রিয় গায়ক : হেমন্ত মুখার্জী, আজম খান

প্রিয় নায়ক : অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান

প্রিয় রং : কালো

প্রিয় খাবার : আইসক্রিম, ফাস্টফুড

প্রিয় পোশাক : জিন্স, টি-শার্ট

প্লেব্যাক : প্রেমযুদ্ধ, ঋণশোধ

বিজ্ঞাপনচিত্র : মিল্ক ভিটা, জাগুরার, কেডস, গোল্ড স্টার টি, কোকাকোলা, ফানটা।

ধারাবাহিক নাটক : পাথর সময়, ইতিকথা

একক নাটক : আকাশছোঁয়া, দোয়েল, সব পাখি ঘরে ফেরে, সৈকতে সারস, নয়ন, স্বপ্নের পৃথিবী।

প্রথম চলচ্চিত্র : কেয়ামত থেকে কেয়ামত

শেষ ছবি : বুকের ভেতর আগুন

প্রথম নায়িকা : মৌসুমী

সর্বাধিক ছবির নায়িকা : শাবনূর (১৪টি)

নির্বাচিত সংবাদ