১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ষড়যন্ত্র এখনও থেমে নেই

  • শাহজাহান মিয়া

স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হাজার বছরে একটি জাতির জীবনে একবারই আবির্ভাব ঘটে এমন একজন মহামানবের। ঘাতকের দল শারীরিকভাবে মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দিলেও তাঁর প্রিয় মানুষের মন থেকে তাঁর প্রতি পর্বত-প্রমাণ শ্রদ্ধা-ভালবাসা একটুকুও মুছে ফেলতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের শোষকদের হাত থেকে নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের মনে সাহস যুগিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য এগিয়ে এসেছিলেন এ দেশের মানুষের মুক্তির জন্য। তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল-জুলুম ও অপরিসীম নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মানুষ নামের পাষ--পাপিষ্ঠরা বিদেশী চক্রের প্ররোচনায় তৎকালীন সেনাবাহিনীর উচ্চাভিলাষী ও বিপথগামী কিছু ঘৃণ্য ঘাতক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে বাঙালী জাতিকে পিতৃহারা করে। স্তব্ধ করে দেয়া হয় সকল প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার বঙ্গবন্ধুর প্রাণান্ত প্রয়াস। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাত্র আড়াই মাসের মাথায় তাঁর দীর্ঘদিনের প্রিয় সহচর চার জাতীয় নেতাকে কারা প্রকোষ্ঠের অন্তরালে ১৯৭৫ সালের ৩ নবেম্বর হত্যা করা হয়। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বিশাল দলটিকে নেতৃত্বশূন্য করে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরে ভীতি সঞ্চারপূর্বক দলটিকে তছনছ করাই ছিল তাদের একমাত্র লক্ষ্য।

শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরে আসেন। ফিরে এসেই তিনি আওয়ামী লীগের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং দল গোছানোর কঠিন কাজ শুরু করেন। দলের সর্বস্তরে ফিরে আসে প্রাণ। শাসরুদ্ধকর অবস্থার হয় অবসান। বিশাল দলটির নেতা-কর্মী-সমর্থকরা আশার আলো দেখতে পায়। কিন্তু ঘাতকচক্র ও ঘাপটি মেরে থাকা কুশীলব-কুচক্রীমহলের মধ্যে কাঁপন শুরু হয়ে যায়। তারা নড়েচড়ে বসে। এ দেশে শুধু স্বাধীনতাবিরোধীরাই নয়, মুখে স্বাধীনতার পক্ষের মুখোশ লাগিয়ে একটি চক্র স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দলটির নেতা-নেত্রী ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর এবং অনুসারীদের কিভাবে অনিষ্ট সাধন করা যায়, অতি সন্তর্পণে যেরকম জঘন্য কর্মকা-ে আগেও সক্রিয় ছিল এখনও তারা অতি সংগোপনে সেরকম ন্যক্কারজনক কাজে নিয়োজিত রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। সুযোগ পেলেই ওরা ফণা তুলে ওদের বিষদাঁত বের করে ছোবল মারার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় ওরা বঙ্গবন্ধুর কন্যা জাতীয় সংসদে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালায়। সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ)-এর মাজারে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর হামলাসহ দেশব্যাপী জঙ্গী কর্মকা-ের প্রতিবাদে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এ্যাভিনিউর আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত শান্তি সমাবেশে ঘাতকদের প্রধান লক্ষ্য শেখ হাসিনা হলেও তাঁর সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের আরও অনেক নেতাকর্মীও মারা যাবে সে বিষয়ে হামলাকারীরা ছিল নিশ্চিত। গ্রেনেড হামলার প্রধান টার্গেট বঙ্গবন্ধুকন্যা অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। মৃত্যুর সঙ্গে তিন দিন লড়াই করে আইভি রহমান মারা যান। ঘাতকরা শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য তারা গাড়িতেও গুলি ছোড়ে। সেদিন তারা আরেকটি ১৫ আগস্ট সৃষ্টির অপচেষ্টা চালায়। জঙ্গী-জল্লাদদের ছোড়া প্রথম গ্রেনেডটি ট্রাকে আঘাত হানলেই তাদের পরিকল্পনা পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়ে যেত। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ আবার নেতৃত্বশূন্য হয়ে যেত।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের মর্মান্তিক গ্রেনেড হামলাটিকেও বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর ঘাতকরা তাঁকে হত্যার জন্য মোট ১৯ বার আক্রমণ চালিয়েছে। প্রতিবারই আল্লাহ কোন না কোনভাবে তাঁকে বাঁচিয়েছেন। শেখ হাসিনা প্রায় বলে থাকেনÑ মহান আল্লাহতায়ালা বাঁচিয়ে রাখলে কেউ তাঁকে মারতে পারবে না। ‘৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের সঙ্গে যেমন জিয়াউর রহমান জড়িত ছিল, ঠিক তেমনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে তার স্ত্রী খালেদা জিয়া ও পুত্র তারেক রহমান জড়িত। এ নৃশংস হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িতদের বিচার হতেই হবে, নইলে আবারও এ ধরনের ঘটনা ঘটবে। শুধু ২১ আগস্টই নয়, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পাঁচ বছরে এবং ২০১৩ ও ২০১৫ সালে যারা মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তাদেরও বিচার করা হবে। খুনীরা কেউ রেহাই পাবে না। জড়িতদের শাস্তি পেতেই হবে।’ সম্প্রতি একটি বড় স্মরণ সভায় প্রধানমন্ত্রীর এই দৃঢ় উচ্চারণ থেকেই নির্মম-নিষ্ঠুর ঘটনাগুলো সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। তিনি শুধু বলার জন্যই কথাগুলো বলেননি, তাঁর বক্তব্যের পক্ষে অনেক যুক্তি-প্রমাণও তুলে ধরেছেন। মিথ্যাচার ও অপপ্রচারে পারদর্শী বিএনপির নেতা-নেত্রীরা যে যাই বলুক না কেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে যে দলটির জন্মদাতা জিয়াউর রহমান নিজেই অত্যন্ত সুকৌশলে পেছন থেকে হলেও ঘাতকদের মদদ যুগিয়েছেন সে বিষয়টি অনেকের কাছে অনেক আগেই স্পষ্ট হয়েছে। সম্প্রতি এক আলোচনা সভায় ২১ আগস্ট সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুঃখভরে বলেন, হামলার পর ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ বিএনপি নেতারা বলতে শুরু করেন, আওয়ামী লীগ নিজেরাই এ গ্রেনেড হামলা চালিয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি নাকি ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়ে নিজেই মেরেছি! আমি আবার গ্রেনেড মারতে শিখলাম কবে?’ আসলে নিজেরা অপকর্ম করে অপরের কাঁধে দোষ চাপাতে বরাবরই ওস্তাদ বিএনপি নেত্রী। তিনি আরও বলেন, গ্রেনেড হামলার পর বিএনপি সরকার আমাদের থানায় মামলা করতে দেয়নি, এমনকি একটি শোক মিছিলও করতে দেয়নি। সংসদে তখনকার সরকারী দল বিএনপি এ বিষয়ে আমাদের বিরোধী দলের আলোচনার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে কথা বলতে পর্যন্ত দেয়নি। ওই লোমহর্ষক ঘটনাটির পর দীর্ঘ ১১টি বছর চলে গেছে। তৎকালীন সরকার কর্তৃক আলামত নষ্ট করা, শত শত সাক্ষীর সাক্ষ্যগহণসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বিচারকার্য শেষ করতে সময় লেগেছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই বিচার কাজ শেষ হবে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে।

শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা এখনও থেমে নেই। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের পরও তাঁকে একাধিকবার হত্যার চেষ্টা হয়েছে। এখনও হচ্ছে। সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ এ ধরনের আশঙ্কার কথা বলে নেতাকর্মীদের সতর্ক ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্রকারীরা এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তাদের অর্থবিত্ত প্রভাবে এর বিস্তার ঘটছে। জামায়াত-বিএনপি-জঙ্গী সংগঠন সব এখন একজোট। টার্গেট শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা না থাকলে তাদের খায়েশ পূর্ণ হবে, দেশ জঙ্গী রাষ্ট্র হবে। তাদের নেত্রী হবেন খালেদা জিয়া, সেনাপতি তারেক জিয়া। সেটা তারা ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত করেছে। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হবে না। শেখ হাসিনার রয়েছে পরম করুণাময়ের ওপর বিশ্বাস আর দেশবাসীর দোয়া ও ভালোবাসা। এই বিশ্বাস ও ভালবাসাই তাঁকে রক্ষা করবে, তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক