১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমের আঠিতে অর্থনীতি চাঙ্গা

  • দুই কোটি আম আঠি বাণিজ্যের টার্গেট

ডিএম তালেবুন নবী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ॥ রাস্তা ঘাটে পড়ে থাকা মূল্যহীন ফেলনা আমের আঠি জাতে উঠেছে। ফেলামাত্র উঠিয়ে নিচ্ছে প্রতিযোগিতা করে। কারণ এখন চড়া মূল্যে কেনাবেচা হচ্ছে সর্বত্র। এক হাজার আঠির দাম দুইশত টাকা। কোথাও কোথাও আরও বেশি। এবার আম নয় আমের আঠি নিয়ে শুরু হয়েছে বাণিজ্য। অর্থাৎ আম আঠি বাণিজ্য জমে উঠেছে সমগ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে। প্রায় দুই কোটি আম আঠি বাণিজ্যের টার্গেট নিয়ে মাঠে নেমেছে সরকারী ও বেসরকারী সংস্থা। উদ্দেশ্য আঠি হতে যে চারা উৎপন্ন হবে তা বিভিন্ন আধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় এনে উন্নত জাতে রূপান্তর করে আম চাষীদের কাছে বিক্রয় করা। নতুন নতুন আম বাগান ও বাড়ির উঠানে আম গাছ লাগিয়ে এলাকাকে আরও আম সমৃদ্ধ করার জন্যই চারা লাগানোর এই চেষ্টা। এবার আম মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই জ্যৈষ্ঠ মাস থেকেই এলাকা জুড়ে শুরু হয়েছে আমের আঠি সংগ্রহের কাজ। চলবে কার্তিক মাস পর্যন্ত। তবে এবার আঠির চাহিদা খুবই বেড়ে গেছে। কারণ একটাই বিভিন্ন জেলার সরকারী ও বেসরকারী ব্যক্তি নার্সারির মালিকরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আঠি সংগ্রহ করায় আমের আঠির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনেকের ধারণা এবার আম আঠি বাণিজ্য থেকে প্রায় পাঁচ কোটি ও বেসরকারী নার্সারি মালিকরা চারা গাছ বিক্রি করে প্রায় ২৫ কোটি টাকা আয় করবে। যদিও এবারের আম আঠি সংগ্রহের মূল উদ্দেশ্য উৎপাদিত চারার বাণিজ্য করবে আগামী বছর। আমি আঠি কেনাবেচা তুঙ্গে ওঠায় এবার জেলার প্রতি মহল্লাই টোকাই থেকে শুরু করে গরিব নানান বয়সের ছেলে মেয়ে ও বৃদ্ধ পুরুষ মহিলারা আঠি কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

জেলা শহর চাঁপাইনবাবগঞ্জে দু’টি সরকারী কৃষি ফার্ম রয়েছে। একটি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কল্যাণপুরস্থ হর্টিকালচার সেন্টার ও অপরটি কৃষি গবেষণার আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্র। এটি পূর্বের নাম ছিল আম গবেষণা কেন্দ্র। এখন তা রূপান্তর বা নাম বদল করে করা হয়েছে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব কেন্দ্র। এ দু’টি সরকারী প্রতিষ্ঠান আমের চারা তৈরি ও বিক্রয় করে থাকে। এক কথায় দুটি প্রতিষ্ঠান প্রতিবছর দেশের চাহিদার সিংহভাগ বিভিন্ন বনজ ও ফলের চারা সরবরাহ করে থাকে। তার মধ্যে ফলদ অর্থাৎ বিভিন্ন জাতের আমের চারা বিতরণ, বিক্রয় ও সরবরাহ করে থাকে সব চেয়ে বেশি। আমের সঙ্গে সঙ্গে একই স্টাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের চারার চাহিদা খুবই বেশি দেশ জুড়ে। বিধায় তাদের বাধ্য হয়ে আম পাকা মৌসুম শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আঠি সংগ্রহ শুরু করতে হয়। কল্যাণপুর হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. মোঃ সাইফুর রহমান জানান, তারা এবার বনজসহ নানা ধরনের ফলদ চারা তৈরি করেছেন বিক্রয়ের জন্য প্রায় চার লাখের কাছাকাছি। তার মধ্যে উন্নত জাতের কলম চারা ২৫ হাজার ও সাধারণ চারা ৭৫ হাজার রয়েছে। সামনের বছরের জন্য তারা ইতোমধ্যেই আমের আঠি সংগ্রহ করা শুরু করেছেন। তারা আমের আঠি কিনছে ২শ’ টাকা হাজার। ইতোমধ্যেই লাখ পাঁচেক আমের আঠি সংগ্রহ করেছে। এখনও সংগ্রহ অব্যাহত রয়েছে। হঠাৎ করে কল্যাণপুর ফার্মের কাছে বায়না দিয়েছে কয়েক লাখ আমের আঠির চট্টগ্রাম ও ফেনীর সরকারী নার্সারি বিভাগ।

ইতোমধ্যেই লাখের অধিক আমের আঠি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠিয়েছে। বিভিন্ন স্থানের হর্টিকালচার ফার্ম কল্যাণপুর হর্টিকালচারের কাছে আমের আঠি নেয়ার বায়না দিয়ে রেখেছে আগাম। বিধায় এবার কল্যাণপুর হর্টিকালচার প্রচ- চাপের মধ্যে রয়েছে। এই হর্টিকালচারের জনৈক কর্মকর্তা জানান, তারা ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জাতের চারা বিক্রি করে আয় করেছে ১৭ লাখ টাকা। মৌসুম শেষে এই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে প্রায় ৫০ লাখ টাকাতে। পাশাপাশি কৃষি গবেষণাগারের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব শাখা অর্থাৎ সাবেক আম গবেষণাগার তাদের উদ্ভাবিত ৯টি জাতসহ বিভিন্ন উন্নত জাতের পাঁচ হাজার চারা চড়া দরে বিক্রি করছে। এবার তারা ১০ হাজার চারা তৈরি করলেও তাদের উদ্ভাবিত জাতের আমের চারা মাত্র পাঁচশত। ফলে এখানেও রয়েছে প্রচ- চাহিদা উন্নত জাতের আমের চারা সংগ্রহের। তাই তারা আগামী বছরের জন্য চারা তৈরির জন্য আমের আঠি সংগ্রহ করছে। এই কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জানান, জনবলের অভাবে তারা চারা তৈরিতে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছেন। অপর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শরিফুল হক জানান, তারা চারা তৈরির আঠি সংগ্রহ করলেও মানের বিচারে অনেক এগিয়ে রয়েছে। কারণ এখানে গবেষণা করা হয়। তবে ল্যাবের কারণে বা যন্ত্রপাতির অভাবে উন্নত জাতের আমের চারা তৈরিতে কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ দুটি সরকারী প্রতিষ্ঠানের বাইরেও প্রতিটি উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণের নিজস্ব নার্সারি রয়েছে। এছাড়াও ব্যক্তি ও বেসারকারী পর্যায়ে পাঁচটি উপজেলায় অর্ধ সহস্রাধিক নার্সারি রয়েছে। প্রতিবছর এই সংখ্যা বেড়ে চলেছে।

জেলা নার্সারি সমিতির সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট উপজেলায় আমের চারা বিক্রির নার্সারির সংখ্যা সব চেয়ে বেশি। তবে এই তিন উপজেলায় সারাবছর সার্বক্ষণিক চারা বিক্রি ও বিতরণের সেবা দিয়ে যাচ্ছে প্রায় দেড় শত নার্সারি। এ সব নার্সারিতে এবারও মজুদ আমের বিভিন্ন জাতের চারার সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ ও সাধারণ চারা রয়েছে ১২ লাখের কাছাকাছি। এসব বেসরকারী নার্সারি মালিকরাও এবার খুবই কষ্ট করে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চড়া মূল্য দিয়ে আমের আঠি সংগ্রহ করছে। যার পরিমাণ ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। আগে আমের আঠি সংগ্রহে এত প্রতিযোগিতা ও চড়ামূল্য ছিল না। আমের চারার চাহিদা প্রচ-ভাবে বেড়ে যাবার কারণেই ইচ্ছে থাকলেও সহজে আমের আঠি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। আর আমের আঠি সংগ্রহ করা না গেলে নতুন চারা তৈরি করা যাবে না। বিধায় আঠি সংগ্রহ, চারা তৈরি, সেই চারা উন্নত জাতে রূপান্তর মাধ্যমে মার্কেটিং করতে গিয়ে এবার হিমশিম খাচ্ছে নার্সারি মালিকরা। তাই একদিকে বেড়েছে আমের আঠির চাহিদা, আবার উন্নত জাতের আমের চারার দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। বিধায় বর্তমান বাজারে ও সরকারী ফার্ম বা হর্টিকালচারে আমের চারার দাম না বাড়লেও বেসরকারী নার্সারি আমের চারার দাম বাড়িয়েছে। আকাশ ছোঁয়া এই দামের কারণে সাধারণ মানুষ এবার আমের চারা কিনে বাড়ির আঙ্গিনা বা উঠানে লাগাতে অনুৎসাহিত হয়ে পড়েছে। তবে যারা আমের বাগান বানানোর জন্য চারা সংগ্রহ করছে তারা চড়া মূল্যকে আমলে নিচ্ছে না।

চারার প্রচ- চাহিদা জেলার অভ্যন্তরে ও দেশের বিভিন্ন স্থানে বেড়ে যাবার কারণে এবার আমের আঠি সংগ্রহ করার ব্যাপারে হয়রানির মুখে পড়েছে বেসরকারী নার্সারি মালিকরা। তাই তারা আগাম বিভিন্ন এলাকায় চড়া মূল্য ঘোষণা করে কমিশন ভিত্তিতে আমের গুটি সংগ্রহে এজেন্ট নিয়োগ করা শুরু করেছে। এক কথায় আমের আঠিও এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।