২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায় পদ্মাপারের মানুষ ॥ কাজ থামেনি ভাঙ্গনেও

স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায় পদ্মাপারের মানুষ ॥ কাজ থামেনি ভাঙ্গনেও
  • আশপাশ এলাকায় লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া;###;ভাঙ্গনরোধে নেয়া হয়েছে সর্বাত্মক ব্যবস্থা;###;প্রমত্তা নদীর বুকে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ

রাজন ভট্টাচার্য/মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল ॥ ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী তোর কাছে শুধাই/বল আমারে তোর কি রে আর/কূল কিনারা নাই, কূল কিনারা নাই/

ও নদী কূল কিনারা নাই...’/ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নদী পদ্মাকে নিয়ে কত গল্প, কবিতা, উপন্যাস, গান রচনা হয়েছে যার কোন শেষ নেই। পদ্মাপারের মানুষগুলোর নদীনির্ভর জীবনযাপন নিয়ে লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে অনবদ্য চলচ্চিত্র ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, পরিচালনায় গৌতম ঘোষ। অনেকের ভাষায় ‘পদ্মা’ রাক্ষসী, যা এখনও বহমান। পদ্মার ভয়াল থাবায় অনেকেই হয়ত নিঃস্ব হয়েছেন। দুঃখে কষ্টে দিন পাড়ি দিচ্ছেন অনেকে। এখন পদ্মা সেতুকে ঘিরে স্থানীয় লোকজন নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। ভয়াল পদ্মার দু’পারের মানুষদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে চলছে কাক্সিক্ষত সেতুর কাজ। সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকায় লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ আধুনিক শহরের আদলে পেয়েছেন গ্রাম। উন্নত জীবনযাত্রা। সম্প্রতি ফের উত্তাল পদ্মা। নদীর করালগ্রাসে ভেসে গেছে মানুষের ভিটেবাড়ি। বিলীন হয়েছে গ্রাম।

সব মিলিয়ে নদী যতই বিরূপ হোক না কেন, সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে স্বপ্ন পূরণের অপেক্ষায় পদ্মা পারের মানুষ। সকল বাঁধা উপেক্ষা করে দেশের দীর্ঘতম এ সেতু ২০১৮ সালের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এমন প্রত্যাশা সবার। এতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি বাড়বে। যোগাযোগ ক্ষেত্রে আসতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। স্থানীয়ভাবে হবে শিল্পায়ন। যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রায় বাংলাদেশকে পৌঁছাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

এবারের বর্ষায় পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড এবং পাশের কয়েকটি এলাকায় নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। দেশের সর্ববৃহত এ প্রকল্পের আশপাশের ভাঙ্গন নিয়ে স্থানীয়ভাবে নানা শঙ্কা আছেই। তবে ভাঙ্গনের ফলে সেতু নির্মাণ কাজে কোন প্রভাব পড়বে না বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া সেতুর নদী শাসন হলে ভাঙ্গন থাকবে না বলেও নিশ্চিত করেছেন কর্মকর্তারা। মূল পদ্মা সেতুর প্রায় এক কিলোমিটার ভাটিতে কুমারভোগের পদ্মা সেতুর কন্সট্রাকশন ইয়ার্ড। দেড় কিলোমিটার ভাটিতে খড়িয়া, শিমুলিয়া, দক্ষিণ হলদিয়া গ্রাম এবং মূল প্রকল্প এলাকা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার উজানে পুরনো মাওয়া ফেরিঘাটে ভাঙ্গন দেখা দেয়। এছাড়া প্রায় ১০ কিলোমিটার উজানে দোহার এলাকাও এই ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। তবে সেতুটির অপর প্রান্ত শয়ীতপুরের জাজিরা ও মাদারীপুরের শিবচরে কোন ভাঙ্গন নেই। নদী শাসন প্রক্রিয়া আগে শুরু করলে ভাঙ্গন না হওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

পদ্মার ভাঙ্গন নতুন কিছু নয়। প্রকৌশলীরা বলছেন, যুগ যুগ ধরেই খরস্রোতা পদ্মার আগ্রাসন চলছে। অন্যান্য বারের তুলনায় এবার পানি প্রবাহ ও স্রোত বেড়েছে। যে কারণে সেতু প্রকল্প এলাকার কিছু কিছু স্থানে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে।

গত মার্চ থেকে পদ্মা সেতুর নদী শাসনের কাজ শুরু করেছে। নদী শাসনের এই ওয়ার্ক অর্ডার পায় চীনা প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। এই প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা চট্টগ্রাম ফোর লেন প্রকল্পের একটি অংশের কাজ পেয়েও সময়মতো তা করছে না। এ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তবুও ১৩ ফেব্রুয়ারি তাদের সঙ্গে নদী শাসনের চুক্তি করে সরকার। কিন্তু কাজ শুরুর পরপরই বর্ষা চলে আসে। তাই নদী শাসনের প্রধান কাজ এখনও শুরু হয়নি। তারপরও মূল সেতু এলাকা রক্ষায় অন্তর্বর্তীকালীন কাজ হয়েছে। আর এ কারণে অস্বাভাবিক স্রোত সত্ত্বেও মূল সেতু এলাকা বা পাইলিং এলাকা রক্ষা হয়েছে। সাধারণত মূল সেতু কাজের আগেই নদী শাসনের কাজ হয়ে থাকে। তবে সেতু প্রকল্পের ক্ষেত্রে এটি হয়নি।

এছাড়া ২০১১ সালের ডিজাইনে মাওয়া প্রান্তে নদী শাসনের জন্য ১৩ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নিমার্ণের সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু সর্বশেষ ডিজাইনে এই বাঁধ কমিয়ে মাত্র দেড় কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে। এতেও আশপাশের গ্রামগুলো রক্ষায় সমস্যা হতে পারে। উত্তাল পদ্মা যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বিপদ রয়েছে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। এদিকে পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডের ভাঙ্গন এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও অন্য এলাকায় ভাঙ্গন এখনও চলমান। বন্যার পানি টান দিলে এই ভাঙ্গন আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলেও অভাস দিয়েছেন পানি বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলী এ তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, নতুন করে ভাঙ্গনের আশঙ্কা নেই। ভাঙ্গনরোধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বালির বস্তা ফেলা হয়েছে। এখানে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা রয়েছে। এর আগে এই ইয়ার্ডের প্রায় ২০ মিটার দীর্ঘ এবং ৪ মিটার প্রস্ত এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তারও আগে বিলীন হয় প্রায় ২শ’ মিটার দীর্ঘ এবং প্রায় ৫০ মিটার প্রস্ত এলাকা। মূল সেতু এলাকা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার ভাটিতে লৌহজংয়ের কুমারভোগের পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডের এই ভাঙ্গন প্রথম দেখা দেয় চলতি বছরের ২৭ জুন। সে সময় ১শ’ মিটার দীর্ঘ ও ৫০ মিটার প্রস্ত এলাকায় বিলীন হয়। এবার সে একই স্থানে ভাঙ্গন দেখা দেয় প্রায় দু’ মাস পর। তবে এবারের ভাঙ্গন আগের চেয়ে ভয়াবহ ছিল। ইতোমধ্যেই তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

তবে কন্সট্রাকশন এলাকার বাইরেও কুমারভোগ ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খড়িয়া এবং মাওয়ার পুরনো ফেরিঘাটে পদ্মার ভাঙ্গন রয়েছে। পদ্মার প্রচ- ঘূর্ণি স্রোতই ভাঙ্গনের মূল কারণ। মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কুদ্দুস আলী সরকার জনকণ্ঠকে জানান, নদীভাঙ্গন একটি প্রাকৃতিক বিষয়। তবে পদ্মা সেতুর নদী শাসন কাজ সম্পন্ন হলে এই এলাকায় আর কোন নদীভাঙ্গন হবে না। আর বিচ্ছিন্ন এই ভাঙ্গনে মূল সেতুর কাজে কোন সমস্যা হবে না।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের পাশে কুমারভোগের খড়িয়া গ্রামের ভয়াবহ ভাঙ্গন সম্প্রতি পরিদর্শন করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। পরদিন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও পানিসম্পদ মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন। এর আগে এই ভাঙ্গন পরিদর্শন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি এমপি। তারা এই ভাঙ্গনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন। গত কয়েক দিনে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কুমারভোগের অন্তত ১শ’ ৫৫ পরিবার গৃহহারা হয়েছে। বিলীন হয়ে গেছে শিমুলিয়া বাজারের একাংশ, সরকারী রাস্তা, পুকুর, বৈদ্যুতিক পুলসহ নানা স্থাপনা। এই ভাঙ্গন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। পদ্মায় হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক জনপদ। গ্রামবাসীরা বাড়িঘর সরিয়ে নেয়ার সময়টুকুও পাচ্ছিল না। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ হলদিয়া ও শিমুলিয়া এলাকায়ও ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। তবে এবার ভাঙনের তীব্রতা কিছুটা কমেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে সেতুমন্ত্রী বলেন, নদীভাঙ্গনের কারণে পদ্মা সেতু নির্মাণের মূল কাজের কোন ক্ষতি হবে না। যথাসময়ে পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হবে। ওবায়দুল কাদের বলেন, বর্ষায় নদীতে পানি প্রবাহ বেড়েছে। বেড়েছে স্রোত। তাই বিভিন্ন এলাকায় ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ভাঙ্গন রোধে ব্যবস্থা নেয়ার বিকল্প নেই।

গ্রামবাসীর নানা অভিযোগ ॥ এদিকে গ্রামবাসীরা জানিয়েছে, ফেরিঘাট মাওয়া থেকে শিমুলিয়ায় স্থানান্তর করে অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিংয়ের ফলে গ্রামগুলোতে এই ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। এছাড়া পদ্মা সেতুর প্রকল্পঘেঁষা এই গ্রামগুলোতে ভাঙ্গনরোধে দ্রুত নদীশাসন এবং ২০১১ সালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রক্ষাবাঁধ নির্মাণ জরুরী। ভাঙ্গন থামাতে শিমুলিয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটের নাব্য সঙ্কটের ড্রেজিংয়ের বালু এই প্রান্তে ফেলারও দাবি জানান স্থানীয় মানুষ। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডের ভাঙ্গন সত্ত্বে¡ও সেতুর কাজ চলছে পুরোদমে। আর বৈরি প্রকৃতিকে জয় করে পুরোদমে চলছে পদ্মা সেতুর সব অংশের কাজ। এ কাজ শেষ হলে রাজধানীর ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার সকল প্রকার যোগাযোগ সহজ হবে। এদিকে উপজেলার মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা পয়েন্টে বাস্তবায়িত হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় এই অবকাঠামো প্রকল্প। এতে খরচ হবে প্রায় ২৮ হাজার ৬শ’ কোটি টাকা ধারণা। সাধারণত বর্ষার বৈরিতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে অবকাঠামো নির্মাণকাজ ব্যাহত হয়। কিন্তু এই দুই স্থানে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কারণে মূল সেতুর পাইলিং, ওয়ার্কশপে পাইপ তৈরি, নদীশাসনের জন্য কংক্রিটের ব্লক তৈরি ও সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে।

প্রকল্প এলাকার আশের খড়িয় গ্রামের অসহায় বহু পরিবারের রঙ্গিন স্বপ্ন এখন ভেঙ্গে যাওয়ার পথে। পদ্মা সেতুর এত কাছের গ্রামে বসবাস করা ছিল তাদের কাছে গর্বের। সেই প্রিয় গ্রাম বাড়িঘর, গাছপালা, রাস্তাঘাট বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অসহায় নিলুফার ইয়াসমিনদের এখন চোখেমুখে অনিশ্চিত ভবিষ্যত। সরকারীভাবে এই গ্রামের ১শ’ পরিবারকে সাহায্য দেয়া হয়েছে। তবে গ্রামটিকে রক্ষায় ডুবোচরের একটি অংশ কেটে দেয়ার দাবি উঠেছে। এই চরে বাধাগ্রস্ত হয়ে তীব্র স্রোত গ্রামটিতে আঘাত হানছে। তবে অন্য অংশে ড্রেজিং করে মাটি ফেলায় কিছুটা গ্রামের ভাঙ্গনরোধ হচ্ছে বলে জানিয়েছেন, বিআইডব্লিউটিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী (ড্রেজিং) সুলতানউদ্দিন খান।

নদীর বুকে বিশাল কর্মযজ্ঞ ॥ মূল সেতুর ট্রায়াল পাইলিং চলছে। মাওয়া চৌরাস্তা থেকে সোজা পদ্মাতীরে পাইলিংয়ের কাজ চলতে দেখা যায়। নদীর বুকে রয়েছে সাড়ি সাড়ি ভারি ক্রেন- জাহাজ ও ড্রেজার। গত ২৬ নবেম্বর মূল সেতু নির্মাণের কার্যাদেশ পেয়েছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। কাজ শেষ করতে হবে ১ হাজার ৪৬০ দিন হিসেবে বা চার বছরের মধ্যে। এজন্য প্রতিদিনের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে। গত বছরের অক্টোবরে মাওয়া থেকে দেড় কিলোমিটার পুর্বে শিমুলিয়ায় সরিয়ে নেয়া হয়েছে (মাওয়া ফেরিঘাট)। নির্মাণ করা হয়েছে দুই কিলোমিটার নতুন সড়ক। মূল সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে মাওয়া চৌরাস্তা বরাবর পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায়। চীন থেকে আনা যন্ত্রপাতি রাখা হয়েছে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে। গত ১মার্চ মূল সেতুর মাওয়া প্রান্তে এ্যাংকর পাইলিং শুরু হয়। ২০ মার্চ একই প্রান্তে শুরু হয়েছে কনস্ট্রাকশন ট্রায়াল পাইলিং বা টেস্ট পাইলিং। চীন থেকে আনা ট্রায়াল বা টেস্ট পাইলের ব্যাস দেড় মিটার। চূড়ান্ত পিলার তৈরি হচ্ছে মাওয়ার ওয়ার্কশপেই। মূল সেতুর জন্য বিদেশী শ্রমিক আছেন সাড়ে ৩শ’। দেশী শ্রমিক সাড়ে ৫শ’ জন। নদীশাসনের কাজ করছেন ১ শতকের বেশি জন চীনা ও দেড় হাজার দেশী শ্রমিক। সিএসসি আছেন ১শ’ ৩৫জন। তাঁরা কোরিয়ান-চীন নেপাল-নিউজিল্যান্ডের নাগরিক।

এছাড়াও কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে আছে ছয়টি ভাসমান ক্রেন। ছয়টি ড্রেজার, পাঁচটি সাধারণ ক্রেন, তিনটি এ্যাংকর। পদ্মা সেতুতে মোট দুটি কনস্ট্রাকশন ট্রায়াল পাইল স্থাপন করা হবে। ও টেস্ট পাইল হবে ১০টি। এরই মধ্যে টেস্ট পাইল বসেছে তিনটি। গত ২১ আগস্ট থেকে কনস্ট্রাকশন ট্রায়াল পাইল স্থাপনের কাজ চলছে। এজন্য প্রায় ৩ হাজার টন চাপ দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন জার্মানি হ্যামার ব্যবহার করা হচ্ছে। সেতুর ৭ নম্বর পিলারে। এর আগে শুরু হয়েছে টেস্ট পাইল।

জানতে চাইলে পদ্মা সেতুর নির্বাহী (মূল সেতু) প্রকৌশলী দেয়ান আব্দুল কাদের বলেন, কনস্ট্রাকশন ট্রায়াল পাইল স্থাপনের মধ্য দিয়ে সেতুর কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। তিনি আরও জানান, সেতুর ৪২টি পিলারের ওপর ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ। এ পিলারগুলো ১৫০ মিটার পর পর বসবে। এ ছাড়া দুই পারে দেড় কিলোমিটার করে মোট তিন কিলোমিটার সংযোগ সেতুর জন্য আরও ২৪টি পিলার হবে। মূল সেতুর ৪০টি পিলারে ছয়টি করে ২৪০ এবং দুই পারের ১২টিতে দুটি করে ২৪টি অর্থাৎ সর্বমোট ২৬৪টি পাইল বসাতে হবে। সেতুর কাজ নির্ধারিত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ভাঙ্গন প্রতিরোধ করে চলছে।

পদ্মা বহুমুখী সেতুর ওপরের তলায় থাকবে চার লেনের মহাসড়ক। নিচে রেললাইন। ট্রেনের গতি হবে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার। থাকবে গ্যাস ও বিদ্যুত লাইন। প্রতিরোধ বেষ্টনীতে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড। সেতু এলাকার প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে রয়েছে কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড। এ ইয়ার্ডে আছে প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা ১টি ওয়ার্কশপ। সেখানে তৈরি হচ্ছে পাইল। এ পর্যন্ত সেতুর ২৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে উল্লেখ করে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, নদীভাঙ্গন একটি প্রাকৃতিক বিষয়। তা প্রতিরোধ করা হচ্ছে।

বর্ষার পর নদী শাসনের মূল কাজ ॥ বর্ষার পর নদীশাসনের মূল কাজ শুরু হবে। এতে খরচ হবে আনুমানিক আট হাজার ৭০৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। মাওয়া ও জাজিরা অংশে সাড়ে ১৩ কিলোমিটার অংশে নদীশাসনের কাজ করবে তারা। গত বছরের ১৩ অক্টোবর প্রকল্পের মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ তদারকির জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশনকে নিয়োগ করা হয়েছে। সিনো-হাইড্রোর প্রকৌশলীদের তথ্য মতে, মাওয়া ও জাজিরায় প্রাথমিক কাজ এগিয়ে রাখা হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বরের পর নদীশাসনের মূল কাজ শুরুর কথা রয়েছে। জাজিরায় ব্লক তৈরির কাজ চলছে। জিও ব্যাগও আনা হয়েছে। প্রাথমিক কাজ শেষ করা হয়েছে, বর্ষার পর দৃশ্যমান হবে অগ্রগতি।

গুরুত্ব পাবে নান্দনিক নকশা ॥ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পদ্মা সেতুকে এমনভাবে আলোকিত করা হবে যেন অনেক দূর থেকেও একে ঝলমলে দেখায়। সেতুর পিলার, টোল প্লাজাসহ বিভিন্ন স্থানে এলইডি বাতি ব্যবহার করে আলোকিত করা হবে। এতে বিদ্যুত খরচ কম হওয়ার পাশাপাশি নানা রঙের আলোচ্ছটাও বের হবে। তারা জানান, শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই এই সেতু ব্যবহার করা হবে না। এটি হবে একটি দর্শনীয় বিষয়ও। ফলে এর নান্দনিক দিকের অনেক বিষয়ও নকশায় গুরুত্ব পেয়েছে। জানা গেছে, পদ্মা সেতুর মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের সংযোগ সড়কগুলোর দু’পাশে সবুজায়ন করা হবে। এতে নানা রঙের ফুলের গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগানো হবে। সেতুর নিরাপত্তার জন্য স্থাপিত সেনা ক্যাম্পে হেলিকপ্টার অবতরণের জন্য হেলিপ্যাড থাকবে। এছাড়া নদীতে জাহাজ ভেড়ানোর জন্য জেটি নির্মাণ করা হবে। সেতুর পিলারগুলোকে রিফ্লেক্টর ও এলইডি দিয়ে আলোকিত করা হবে। সেতুর বিভিন্ন স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। কন্ট্রোলরুমে বসে এসব ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে সেতু নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ হবে এমন ভাবনা এখন পদ্মা পারের সকল মানুষের।