১৮ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বগুড়ার নওয়াবের শেষ প্রদীপও রইল না

  • ওয়াক্ফ সম্পত্তি বেচাকেনা পাকা!

সমুদ্র্র হক ॥ একে একে নিভিছে দেউটি...। বগুড়ার ঐতিহ্যের স্থাপনা ও দর্শনীয় জায়গা সবই চলে গেল। ঔজ্জ্বল্য না থাকলেও নিভু নিভু করে জ্বলে থাকা বগুড়ার নওয়াবের শেষ প্রদীপ ‘নওয়াববাড়ি’ও বুঝি আর রইল না। লোকমুখে বলাবলি, নওয়াব প্যালেস বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। কিনছেন খুবই প্রভাবশালী এবং ধনাঢ্য এক ব্যক্তি। প্যালেসের সর্বশেষ নওয়াব বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর (তৎকালীন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী) প্রবাসী বড় ছেলে হাম্মাদ আলী ও ছোট ছেলে হামদে আলীর সঙ্গে বেচাকেনার কথা প্রায় পাকা হয়েছে, এমনটি চাউর শহরজুড়ে। বড় ছেলে গত রমজানে প্যালেসে এসেছিলেন। সেখানে বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন প্রভাবশালী ওই ব্যক্তি।

বগুড়া শহরের কেন্দ্রস্থল সাতমাথা থেকে পূর্ব দিকে অল্প দূরে নওয়াবের আমবাগানসহ ওয়াক্্ফ এস্টেটের অনেকটা জায়গা বিক্রি হয়েছে। জায়গা কিনে নেয় বিড়ি ফ্যাক্টরির দু’জন মালিক। সেখানে গড়ে উঠেছে মার্কেট। কিছুটা জায়গায় ’৮০-এর দশকের শুরুতে বগুড়ার শিল্পী আমিনুল করিম দুলাল (প্রয়াত) লিজ নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন কারুপল্লী নামে এক দর্শনীয় ভুবন। যেখানে ‘আজব গুহা’য় সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারা ভাস্কর্য শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। বনের প্রাণীদের লাইভ সাইজ ভাস্কর্য বানিয়ে শিশুদের বিনোদনের আয়োজন করেন। লোকজ জিনিসপত্র, একদার বায়োস্কোপ বানানো হয়। বছর দুই আগে একটি বড় প্রতিষ্ঠান তা কিনে নিয়ে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়। সেখানে গড়ে তোলা হয় হাইরাইজ ভবন। অভিযোগ আছে, সরকারের বিশাল অঙ্কের কর ফাঁকি দিয়ে নওয়াবের সম্পত্তি কেনা হয়। এবার নওয়াব বাড়ির টিকে থাকা সবেধন নীলমণি প্যালেস ভবনটিও বিক্রির খাতায় উঠেছে। ওই ভবনের চত্বরে বিরল দুটি বৃক্ষ রয়েছেÑ জয়তুন ও কর্পূর। এ ছাড়াও প্যালেসের ইতিহাস তুলে ধরতে শিল্পী দুলাল সৃষ্টিশীল লাইভ সাইজ এমন কিছু কাজ করেছেন যা দেখে মনে নওয়াবের পূর্বপুরুষরা বিভিন্ন ঘরে নওয়াবী কায়দায় অবস্থান নিয়েছেন। নওয়াবের ব্যবহার্য জিনিসপত্র প্রদর্শন করা আছে। প্রবেশপথেই যেভাবে নওয়াবের পাইক পেয়াদারা থাকত সেভাবেই স্ট্যাচু বানিয়ে রাখা হয়েছে। বিলিয়ার্ড রুমে গিয়ে দেখা যাবে, নওয়াবের বংশধররা খেলছে। পুরো প্যালেসকে জাদুঘর স্টাইলে গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে সেখানে এ্যামিউজমেন্ট পার্ক করা হয়েছে। কিছুদিন আগে এই জায়গা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রেষারেষিও হয়। ইতোপূর্বে মোহাম্মদ আলীর সৎ ভাই ওমর আলী চৌধুরী (প্রয়াত) নওয়াবের জায়গা বিক্রি করে দিয়েছেন। নওয়াবের ছোট ছেলে হামদে আলীও বিক্রি করে দিয়েছেন অনেকটা জায়গা, যা কিনে নিয়েছে রানার গ্রুপ। এবার মূল জায়গাটিও চলে যাচ্ছে।

একাধিক সূত্র জানায়, বগুড়ার নওয়াবের এই ভূমি (স্থাবর ও অস্থাবর) ওয়াক্ফ এস্টেটের আওতায়, যা বিক্রি করা যায় না। কেউ কিনতে চাইলেও আইন তা সমর্থন করে না। তার পরও কিভাবে নওয়াবের বিশাল সম্পত্তি বেচাকেনা হয়েছে এবং আগামী দিনেও হবে তা রহস্যজনক।

সূত্র জানায়, চোখের দেখাতেই প্যালেসে নওয়াবের ভূমিসহ যে অবকাঠামো আছে তার দাম অন্তত এক শ’ কোটি টাকা। ১০-১৫ কোটি টাকার মধ্যে তা বিক্রির ব্যবস্থা হয়েছে, এমনটি জানা যায়।

এর আগে রানার গ্রুপ যে জায়গাটি কিনেছে তাও কম দামে কেনা দেখানো হয়। অনেক গোপনীয়তার মধ্যে এবার কেনাবেচার পালা শেষ করা হবে। বিষয়টি লোকেমুখে ফেরার পর বগুড়ার সুধীজনরা প্রতিবাদমুখর হয়ে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা করেছে। তাদের কথাÑ বগুড়ার নওয়াববাড়ি ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। প্যালেস রক্ষায় সরকারেরও এগিয়ে আসা দরকার। পরিবারের সদস্যগণ সকলেই বর্তমানে বিদেশে। কেউ এই দেশে আসবেন বলে মনে হয় না। ঐতিহ্য রক্ষায় প্যালেসটি বড় ভূমিকা রেখেছে। প্যালেসের প্রবেশপথে তিন শ’ বছর আগের তৈরি নিখুঁত নক্সা করা কাঠের দরজা সাক্ষ্য লোকজ সংস্কৃতির গভীরতা। ইতিহাস বলে- টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের সৈয়দ আব্দুস সোবহান চৌধুরী বগুড়ার মানিকপুরের তহুরুন্নেছা চৌধুরানীকে বিয়ে করে বগুড়ায় বসতি গড়েন। সোবহান চৌধুরী জমিদারি পেয়ে শিক্ষা ও সেবামূলক জনহিতকর কাজ করেন। স্বীকৃতি মেলে ১৮৮৪ সালে। ব্রিটিশ শাসক তাকে নওয়াব উপাধি দেয়। করতোয়া তীরে নওয়াবের রাজবাড়ী নির্মিত হয়। পরবর্তীতে তা ‘নওয়াববাড়ি’ নামে পরিচিতি পায়। নওয়াবের বংশধরদের ধারাবাহিকতায় নওয়াব সোবহান চৌধুরীর পর যথাক্রমে নওয়াব আলতাফ আলী, নওয়াব সৈয়দ মোহাম্মদ আলী চৌধুরী (বগুড়ার মোহাম্মদ আলী)।

মোহাম্মদ আলীর মৃত্যুর পরও প্যালেস অনেক দিন টিকে ছিল। সড়কের পাশে আমবাগানের এক কোনায় বগুড়ার দইয়ের প্রতিষ্ঠাতা গৌরগোপালকে জায়গা দেন নওয়াব। তারপর গত শতকের ’৭০-এর দশকের শেষদিক হতেই নওয়াবের সম্পত্তি বেচাকেনার পালা শুরু হয়। সবশেষে টিকিয়ে থাকা নওয়াবের পিদিমটিও নিভে যাচ্ছে। বিরল প্রজাতির জয়তুন ও কর্পূর বৃক্ষ দুটিও বুঝি কুঠারের আঘাতে ধরণী বুক থেকে হারিয়ে যাবে।