১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ পীর মওলানা শাহ্ মোঃ আবদুল মতিন (রহ)

অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম ॥ যশোরের খড়কীর পীর খান্দান বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে চার শ’ বছরের পুরাতন ঐতিহ্য বহন করে আছে। মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে এই খান্দানের পূর্বপুরুষ সৈয়দ সুলতান আহমদ (রহ) যশোরে এসেছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্যকে বশে আনার জন্য রাজা মানসিংহের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে পদাতিক বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে। তিনি ছিলেন পীরে কামিল এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী মহান সূফী। প্রতাপাদিত্যকে বশে এনে ফেরার পথে চাঁচড়ার রাজা মানসিংহকে বিপুল সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। চাঁচড়া এবং এর আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য-শোভা দেখে সৈয়দ সুলতান আহমদ (রহ) মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি এখানে থেকে যান। চাঁচড়ার রাজা তাকে রাজবাড়ির খিড়কীর দিকে প্রচুর লাখেরাজ ভূসম্পত্তি প্রদান করেন। সৈয়দ সুলতান আহমদ এখানে খানকা স্থাপন করে মানুষকে ইসলামের শান্তির বাণী শোনান। খিড়কী থেকে স্থানের নাম খড়কী হয়ে যায়। খড়কীর মর্যাদার জন্য একে খড়কী শরীফও বলা হয়। বংশপরম্পরায় এই খান্দানে বহু পীর-বুযুর্গের আবির্ভাব ঘটে। এই খান্দানের পঞ্চম স্তরে মওলানা শাহ্্ মোঃ আবদুল করিম (রহ) রচিত মৌলিক, বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য তাসাওউফ গ্রন্থ এরশাদে খালেকিয়া বা খোদাপ্রাপ্তি তত্ত্ব নামের পুস্তক ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। বাংলাভাষায় এটি অন্যতম সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ। এই খান্দানের সপ্তম স্তরে আবির্ভূত হন হযরত মওলানা শাহ্ সূফী মোহাম্মদ আবদুল মতিন রহমাতুল্লাহি আলায়হি।

মওলানা শাহ্ সূফী মোহাম্মদ আবদুল মতিন (রহ) উচ্চশিক্ষিত কামিল পীর ছিলেন। পূর্বপুরুষগণের দীনী আদর্শ ধরেই তিনি এগিয়ে গেছেন। জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ে তিনি শিক্ষকতা করেছেন। খুলনার তেরোখাদা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তার শিক্ষকতা জীবনের শুরু হয়েছিল। যশোরের বসুন্দিয়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, যশোর জিলা স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু জিলা স্কুলের চাকরি ছিল সরকারী বদলিযোগ্য চাকরি। তাই তিনি ইস্তফা দিয়ে যশোর শহরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মুসলিম একাডেমীতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি নকশবন্দিয়া চিশতিয়া কাদিরিয়া মুজাদ্দিদিয়া প্রভৃতি তরিকার খিলাফতপ্রাপ্ত হন। দলে দলে লোক এসে তার নিকট মুরিদ হতে থাকে। যশোর, খুলনা বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, ঢাকা প্রভৃতি অঞ্চলে তাঁর অসংখ্য মুরিদ রয়েছে। তার মুরিদ ও ছাত্রদের মধ্যে অনেকেই মর্যাদাপূর্ণ এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। হযরত মওলানা শাহ্ সূফী আবদুল মতিন রহমাতুল্লাহি আলায়হি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। তার মধ্যে কোন অহঙ্কার ছিল না। তার স্বভাবসুলভ প্রশান্ত চেহারার সামনে এসে সীমাহীন ভক্তি ও শ্রদ্ধায় সবার মনপ্রাণ জুড়িয়ে যেত। তার আন্তরিকতা ও সদাহাস্যমাখা চেহারায় ছিল অনন্য আকর্ষণশক্তি। তার মধ্যে জাতি-ধর্ম ভেদাভেদ ছিল না। তার নিকট কেউ মুরিদ হতে চাইলে তিনি কাউকে মুরিদ করতেন না। আবার অনেক সময় কাউকে মুরিদ করে নিয়েছেন। তিনি মন উজাড় করে মুরিদদের তরিকতের তা’লীম দিতেন।

১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি খড়কীতে চারতলাবিশিষ্ট আঞ্জুমানে খালেকিয়া নামে একটা বিশাল আধুনিক ইয়াতিমখানা স্থাপন করেন। এই ইয়াতিমখানার ছেলেরা যেমন ইসলামী শিক্ষা লাভ করে তেমন জেনারেল শিক্ষাও প্রাপ্ত হয়।

১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি সস্ত্রীক হজে বায়তুল্লাহর জন্য মক্কা মুকাররমা গমন করেন এবং মদিনা মনওয়ারায় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের রওজা মুবারক জিয়ারত করেন এবং প্রায় চার ঘণ্টা রওজা মুবারকের পার্শ্বে গভীর মুরাকাবা করেন। তিনি পাকিস্তান ও ভারতের বহু ওলি আলার মাজার শরিফ সস্ত্রীক জিয়ারত করেন। চীনের ক্যান্টনে সস্ত্রীক গিয়ে বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবূ ওয়াক্কাস (রা)-এর মাজার শরীফ জিয়ারত করেন। মওলানা শাহ্ সূফী আবদুল মতিন (র) সত্যিকারার্থে জামানার কুতুব ছিলেন এবং মাতৃগর্ভ থেকে আল্লাহর ওলি ছিলেন। ২০১১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রায় ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাজায় লাখো মানুষের সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র শাহ্ কমরুল হাসান হাসুকে খড়কী শরিফের গদিনশীন পীর নিযুক্ত করে যান।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা,

ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা),

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ