১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাখিও অন্যের চেহারা অনুকরণ করে

পাখি কি চেহারা অনুকরণ করতে পারে নাকি। পাখি তো পাখির মতই দেখতে। চেহারা আবার অনুকরণ করবে কিভাবে? কিন্তু গবেষকরা জানিয়েছেন পাখিও মানুষের মত চেহারা অনুকরণ করে। আমাদের মানুষের সমাজে দুর্বল পুরুষদের মধ্যে কেউ কেউ মাস্তানের ভাব ধারণ করার চেষ্টা করে। তার জন্য সে মাথা মুড়িয়ে ফেলে বা রাখে এলোমেলো চুল। গায়ে চড়ায় কালো রঙের লেদার জ্যাকেট। চেহারায় সর্বদা ভ্রুকুটি ভাব। যেন বলতে চায়Ñ ‘আমাকে ঘাটাতে এসো না, পস্তাতে হবে।’

এমন কপট মাস্তানিভাব শুধু মানুষের বেলায় নয়। পাখিদের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়। সম্প্রতি গবেষকরা জানিয়েছেন যে, দক্ষিণ আমেরিকায় এক ধরনের ভীরু স্বভাবের কাঠঠোকরা পাখি আছে যারা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে চেহারায় পালকের গড়ন ও বর্ণে বড়সর এবং উগ্র স্বভাবের পাখির ভাব ধারণ করে। এমন এক কপট মাস্তানিভাব ধারণ করায় এই শ্রেণীর কাঠঠোকরার পক্ষে বৈরী পরিবেশে টিকে থাকা সম্ভব হয়েছে।

এই কাঠঠোকরার নাম হেলমেটেড উডপেকার। জীবতাত্ত্বিক নাম ড্রাইওকোপাস গালিয়েটাস। বাংলায় বললে টুপিওয়ালা কাঠঠোকরা। দক্ষিণ আমেরিকার আটলান্টিক উপকূলের বনাঞ্চলে এদের বাস। কিন্তু সেখানে আরও দুই বড় জাতের ও উগ্রমেজাজের কাঠঠোকরার বাস। একটি হলো লাইমেটেড বা ডোরাকাটা কাঠঠোকরা (ড্রাইওকোপাস লাইমেটাস) এবং অন্যটি রোবাস্ট বা সুঠামদেহী কাঠঠোকরা (ক্যাম্পেফিলাস রোবাস্টাস)। দেখতে অনেকটা একই রকম মনে হলেও টুপিওয়ালা কাঠঠোকরা লাইমেটাস কিংবা রোবাস্ট কাঠঠোকরার তুলনায় লম্বায় ২২ থেকে ২৫ শতাংশ ছোট এবং ওজনেও ওদের অর্ধেকেরও কম। একই জায়গায় বড় আকারের উগ্র স্বভাবের কাঠঠোকরার বাস থাকায় আকারে এত ছোট ও ভীরু প্রকৃতির টুপিওয়ালা কাঠঠোকরার বসবাস হুমকির সম্মুখীন হওয়ার কথা। কারণ খাদ্য সংগ্রহ বা শিকারের খোঁজে বের হলেই টুপিওয়ালা কাঠঠোকরাকে ওই দুই বড় জাতের কাঠঠোকরা মেরে তাড়িয়ে দেবে এমন আশঙ্কা থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা হয় না ওদের মতো বড়সর ভাব ও মেজাজ ধারণ করার জন্য। একই রকম চেহারা এবং পালকের বর্ণ ও গড়ন ধারণ করার জন্য তাই টুপিওয়ালা কাঠঠোকরাকে বড় জাতেরগুলো আক্রমণ করতে কিংবা ঘাটাতে আসে না। ফলে টুপিওয়ালা দিব্যি নির্বিঘেœ চড়ে ফিরে বেড়ায়, খাবার সংগ্রহ করে খায়। পক্ষি বিশেষজ্ঞ মার্ক রবিনস এক গবেষণার দ্বারা দেখিয়েছেন যে, টুপিওয়ালা কাঠঠোকরা আকারে ছোট হয়েও স্রেফ বড় জাতের পাখিদের আদলে নিজের চেহারা এবং পালকের বর্ণ, গড়ন ধারণ করে বড় জাতগুলোকেই যে শুধু প্রতারিত করেছে তা নয়। পক্ষি বিশেষজ্ঞদের চোখেও ধুলো দিয়েছে। কারণ তারা এর পালক দেখে পাখিটিকে একটি ভুল শ্রেণীতে ফেলেছিলেন সে শ্রেণীর অন্তর্গত এই পাখিটি নয়। টুপিওয়ালাকে তারা ফেলেছিলেন লাইমেটেড বা ডোরাকাটা কাঠঠোকরার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের শ্রেণীতে। কিন্তু মার্ক রবিনস গোড়তেই সন্দেহ করেছিলেন যে, টুপিওয়ালারা আসলে ডোরাকাটা কাঠঠোকরার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় নয়। তার গবেষণায় পাখিটির জিনেটিক বিশ্লেষণ করা হয়। এক্ষেত্রে ৬০ বছর আগের সংগৃহীত নমুনাও কাজে লাগানো হয়। চেহারাগত সাদৃশ থাকায় ডিএনএ বিশ্লেষণকালে মূল প্রশ্নটি ছিল টুপিওয়ালা কাঠঠোকরা আসলে ড্রাইওকোপাস বর্গের অন্তর্গত নাকি সেলিয়াস বর্গের অন্তর্গত। গবেষকরা ফাইলের জেনেটিক বিশ্লেষণের পর দ্ব্যর্থহীনভাবে টুপিওয়ালাকে সেলিয়াস বর্গের অন্তর্ভক্ত করেন। তবে তারা এটাও দেখিয়ে দেন যে টুপিওয়ালাকে ড্রাইওকোপাস লাইনেটাসের দূর সম্পর্কের আত্মীয় বলে মনে করার কারণ আছে। তবে সেটা হলেও পরবর্তীকালে দর্শনগত অনুকরণের মধ্য দিয়ে তারা লাইনেটাস বা ডোরাকাটা কাঠঠোকরার মতো একই চেহারা, পালকের বর্ণ ও প্যাটার্ন ধারণ করার চেষ্টা করেছে। এভাবে ধীরে ধীরে বিবর্তনের ধারায় একপর্যায়ে ডেরাকাটা কাঠঠোকরার সঙ্গে টুপিওয়ালার লক্ষণীয় সাদৃশ্য গড়ে উঠেছে।

সূত্র : ন্যাচার সায়েন্স