১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঘুরে এলাম গ্রীস

  • ফকির আলমগীর

এবারের ইউরোপ সফর আমার জন্য অবিস্মরণীয়। বিশেষ করে গ্রীস ভ্রমণ। প্যারিস থেকে তিন ঘণ্টার বিমান যাত্রায় মধ্যেরাতে গ্রীসের রাজধানী এথেন্সে পৌঁছে যাই। গ্রীসে বসবাসরত প্রবাসী বিশেষ করে আয়বার প্রেসিডেন্ট জয়নুল আবেদিন ভাইয়ের আমন্ত্রণে এবার গ্রীসে যাওয়া। ইউরোপীয় সভ্যতার সূতিকাগার এথেন্সকে দেখার আগ্রহ আমার বহুদিনের। অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণ হলো। একদিকে এথেন্স ঘুরে দেখা অন্যদিকে বাংলাদেশী প্রবাসীদের গান শোনানো। আমার জানা ছিল না গ্রীসে আমার এত ভক্ত। এর প্রমাণ পেলাম রাত ১২টায় এথেন্স এয়ারপোর্টে নেমে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও শতশত ভক্ত অনুরাগী ফুল নিয়ে এয়ারপোর্টে উপস্থিত। আমার শিল্পী জীবনে এত ভক্ত অনুরাগীর উপস্থিতি কোনদিন চোখে পড়েনি। সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলাম তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনায়। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে বৃহত্তর ফরিদপুরের অধিবাসীদের আন্তরিকতাপূর্ণ অভ্যর্থনার কথা আমার অনেক দিন মনে থাকবে। মধ্যরাতে এথেন্স এয়ারর্পোট হয়ে উঠেছিলো যেন এক টুকরো বাংলাদেশ। উষ্ণ অভ্যর্থনার পর দলবেঁধে গেলাম বাঙালী অধ্যুষিত এলাকার ব্যবসায়ী আল আমিনের রেস্টুরেন্টে। প্রবাসীদের সঙ্গে বসে রাতের খাওয়া দাওয়া আর গল্পে মেতে ওঠলাম। রেস্টুরেন্টের বড় স্ক্রিনে আমার গানের ভিডিও প্রদর্শন করা হচ্ছিল। গ্রীসে বসবাসরত আপন ভাগিনা বাদশাকে খুঁজে পাই। খুঁজে পেলাম আরো অনেক চেনাজানা মানুষ। অন্যরকম ভালো লাগায় পূর্ণ হয়ে ওঠল মন। পরদিন সকালের নাস্তা করেই বেরিয়ে পড়ি স্বপ্নের শহর এথেন্স দেখার জন্য।

এথেন্স গ্রীসের রাজধানী। খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে এ্যাক্রোপালিসের উঁচু ভূমিতে প্রাচীন এথেন্স শহর গড়ে ওঠে। তারপর হাজার বছরের পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র ছিল এই ঐতিহাসিক এথেন্স শহর। কে না জানে, ১৮৯৬ সালে আধুনিক অলিম্পিকের আসর প্রথম বসেছিল এই এথেন্সেই। তাই কোনকিছু না ভেবে সেদিন প্রথমেই ছুটে গিয়েছিলাম সেই ঐতিহাসিক অলিম্পিক স্টেডিয়াম দেখতে। শুধু চোখ মেলে চারদিকে ঘুরে দেখছি। আর মনে নাড়া দিয়ে যায় বইয়ে পড়া সেই গ্রীসের ইতিহাস। সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, হোমারের এই দেশ। গ্রীসের ল্যাটিন নাম গ্রেইসিয়া। ইতালীতে গ্রানট নামের এক উপজাতি বসতি স্থাপন করেছিল। তারাই পরবর্তীকালে এদেশে এসে বসবাস শুরু করে। তাদের নাম থেকেই গ্রীস নামটির উৎপত্তি। গ্রীসের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করে। চারদিকে সবুজের সমারোহ, প্রচুর ফলের বাগানÑ কমলা, আপেল ইত্যাদিতে ভরপুর। নানা জাতের নানা বর্ণের ফল দেখলেই কিনতে ইচ্ছে করে। দেখলাম অনেক পর্যটক ফল কিনছে। যেদিকে চোখ যায় শুধু মানুষ আর মানুষ। দেশে বিদেশের হাজারও মানুষ ভীড় করে ঐতিহ্যবাহী গ্রীসের সৌন্দর্য উপভোগ করতে। পর্যটন খাত তাই এই দেশটির অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ঘুরে বেড়িয়েছি ২০০৪ সালে অনুষ্ঠিত এথেন্সের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে। গিয়েছি কোরিনথস শহরে যেখানে প্রাচীন হেলেনিক সভ্যতার নির্দশন রয়েছে। সেখানে রয়েছে অনেক উঁচু উঁচু পাহাড়। দেখলেই মন ভরে যায়। পাহাড় বেয়ে আঁকাবাঁকা পথে গাড়ী উঠে যায়। গাড়ীর ভেতর বসে থাকলেও মনে হয় নিজেই পর্বত আরোহী হয়ে উঠছি আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘ ধরতে। এথেন্স থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে কোরিনথস যেতে যেতে পথের দুধারে উঁচু পাহাড় আর সবুজের সমারোহে মনে হয়েছিল আমি হারিয়ে গেছে প্রকৃতির মাঝে। বিখ্যাত কোরিনথস খাল দেখার আগ্রহ ছিলো বহুদিনের। সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করলাম না। মিস্টি বিকেলে সেই খাল পাড়ে অনেক পর্যটকের ভীড়। কথিত আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে হিটলারের সৈন্যরা পথ সহজ করার জন্য এই খালটি খনন করেছিল। আগে এক দ্বীপ থেকে অন্যদ্বীপে যেতে অনেক ঘুরে আসতে হতো। কিন্তু এই খালটির কারণে এখন আর ঘুর পথে যেতে হয় না। এই খাল দেখতে হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করে। যতটা না ঐতিহাসিক কারণে পর্যটকরা ভিড় করে, তারচেয়ে বেশি করে এর অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে। স্বচ্ছ নীলাভ পানির দিকে তাকিয়ে থাকলে যে কারও বিষন্ন মন প্রসন্ন হয়ে উঠবে। পানিতে সূর্যের আলোর খেলা দেখতে দেখতে সময় যে কেমনভাবে কেটে যাবে, টেরও পাওয়া যায় না। কোরিনথস শহর ছাড়াও গিয়েছি কয়েকটি দ্বীপের সৌন্দর্য দেখতে। গ্রীস দ্বীপের দেশ। অসংখ্য দ্বীপ রয়েছে এখানে। অনেকে বলে থাকেন প্রকৃতি তার সবটুকু ঢেলে সাজিয়েছে কয়েকট দ্বীপকে। ক্রিট, সান্তোরিনা, সিকোনাস এই তিনটি দ্বীপ না ঘুরলে গ্রীস ভ্রমণ থেকে যায় অপূর্ণ। তাই এই ছোট ছোট দ্বীপের সৌন্দর্য দেখতে ছুটে গেছি। প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়েছি, বিস্মিত হয়েছি।

প্রাকৃতিক শোভার জন্য গ্রীস বিখ্যাত। তবে বেশি বিখ্যাত দেশটির অতীত ইতিহাসের জন্য। বিশেষ করে এ্যাক্রোপলিস। যেদিন এ্যাক্রোপলিস দেখতে গিয়েছিলাম, সেদিনটির আবহাওয়া ছিল রৌদ্রকরোজ্জ্বল। অনেকটা বাংলাদেশের মতো। একটু গরমও ছিল। সকালেই ভাগিনা বাদশা, ফরিদপুরের ছেলে আবিদকে নিয়ে বেরিয়ে পরি বহু আকাক্সিক্ষত ঐতিহাসিক এ্যাক্রোপলিস দেখার জন্য। বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠেছে যেন প্রাকৃতিক দুর্গ। সুউচ্চ পাহাড়ের একটি স্তর পর্যন্ত গাড়িতে ওঠা যায়। তারপর আরও ওপরে উঠতে হলে টিকিট কাটতে হয়। বিশেষ করে এ্যাক্রোপলিসের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠতে হলে টিকিট কাটতে হয়। আমরাও টিকিট কাটলাম। সারা পৃথিবীর হাজার হাজার পর্যটক এই এ্যাক্রোপলিস দেখার জন্য ভিড় করেছে। আমরা প্রথমেই নিচের অংশে সমগ্র এলাকাটি ঘুরে ঘুরে বহু পুরনো ঐতিহাসিক স্থাপত্য শিল্প পরিদর্শন করি। অনেক ছবি তুলি। তারপর আস্তে আস্তে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে থাকি। তরুণ বয়স হলো এসব স্থান পরিদর্শনের উপযুক্ত সময়। চূড়ায় ওঠার সময় বিষয়টি বারবার মনে হচ্ছিল। অন্যান্য পর্যটকদের আগ্রহ আর মনোবল আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল বার্ধক্যকে জয় করতে। কষ্ট হলেও বহু সাধনায় অবশেষে এ্যাক্রোপলিসের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠি।

এ সময় আমার মনে পড়ছিল চীনের মহাপ্রাচীরের কথা। ১৯৮২ সালে তরুণ বয়সে আমি চীনের মহাপ্রাচীরের চূড়ায় উঠেছিলাম। আর এবার এ্যাক্রোপলিসের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠেছি। মাঝখানে কেটে গেছে তেত্রিশ বছর। অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পাহাড় পরিবেষ্টিত এ্যাক্রোপলিসকে যেন বর্ণিল করে তুলেছে। বিভিন্ন দেশের নানা বর্ণের নানা ধর্মের পর্যটকদের সঙ্গে আলাপ হয়। কেউ কেউ বিশ্রাম নিচ্ছে, কেউবা তুলছে ছবি। অনেকে সঙ্গে করে নিয়ে আসা খাবার দাবার আয়েস করে গাছের ছায়ায় বসে খাচ্ছে। এ দৃশ্যগুলোও বড় মনোরম লাগছিল। অনেক পর্যটকদের মধ্যে একত্রে এ্যাক্রোপলিসের চূড়ায় ওঠা নিনি নামের এক চৈনিক সুন্দরী তরুণীর কথা কখনও ভোলা যাবে না। আমরা একসঙ্গে ছবি তুলেছি। সে যাই হোক, আমি অবাক বিস্ময়ে এ্যাক্রোপলিসের চূড়া থেকে এথেন্সের চারিদিকের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। তবে সৌন্দর্যময়ী, রূপময়ী গ্রীসকে বয়স কম থাকতেই দেখে নেয়া ভাল। কারণ প্রতিটি ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থাপনাসমূহ পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত। যদিও গ্রীসের উঁচু পর্বতের ওপর গাড়ি যায়, তবুও প্রত্যেক পাহাড়েই অনেক সিঁড়ি ভেঙ্গে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে হয়। প্রত্যাশিত এ্যাক্রোপলিসে উঠতে গিয়ে দেখেছি অনেক প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কত কষ্ট করে সিঁড়িগুলো ভেঙ্গে এ্যাক্রোপলিসের চূড়ায় উঠছে।

গ্রীস চমৎকার, অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এক দেশ। একের পর এক জলপাই ও ডুমুরের বাগান, নীল আকাশ ও নীল স্বচ্ছ সমুদ্রের জল আর সমুদ্রের জাহাজ ও পালতোলা নৌকা সৌন্দর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে আছে প্রাচীন মন্দির, প্রাসাদ ও দুর্গের ধ্বংসাবশেষ । সর্বোপরি গ্রীসের সহৃদ সাধারণ মানুষ বিদেশী পর্যটকদের মুগ্ধ করে। গ্রীস যেমন সুন্দর, তেমনি গ্রিকরাও দেখতে খুব সুন্দর। কথাবার্তা, চালচলনে বেশ সপ্রতিভ। কথাবার্তায় যেমন স্বাধীনচেতা এবং অনেকটা দার্শনিক ভাব। অন্যদিকে তারা বেশ ফুর্তিবাজ। এ্যাক্রোপলিস এলাকা সব সময় যেন বেশ আনন্দ জোয়ারে ভাসছে। আমার ভাল লেগেছে এসব এলাকায় পর্যটকদের সঙ্গে মিশে যেতে। ভ্রমণে আনন্দ আছে নিঃসন্দেহে, কিন্তু সেই আনন্দকে সর্বক্ষণ মনে ধরে রাখার জন্য চাই উপযুক্ত পরিবেশ। সেই কাক্সিক্ষত পরিবেশ রযেছে গ্রীসে।