২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অপরূপ শিলং

  • সুমন্ত গুপ্ত

ছোট বেলায় জাফলং এ যখন ঘুরতে যেতাম তখন দেখতাম দুটি পাহাড়ের মিলন ঘটিয়েছে একটি সুন্দর ব্রিজ। বাবা মা তা দেখিয়ে বলতেন ‘সামনেই ভারত’। মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগত এতো সুন্দর একটি ব্র্রিজ তা কেন ভারতে পড়ল। তখন মনে মনে ভাবতাম একদিন না একদিন আমি ওই ব্রিজে যাবই। অনেকদিন পর হলেও সে সুযোগ হওয়ায় বেজায় খুশি হয়েছিলাম। আমি আর মা, দুজনে গিয়েছিলাম আমার শৈশবের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে মেঘালয়ের রাজধানী শিলং-এর সেই ব্রিজটি দেখতে। শুধু ব্রিজই নয়, শিলংয়ের সর্বত্রই যেন দেখার আছে অনেক কিছু। সেসব কিছু দেখার উদ্দেশ্যেও ছিল। শিলং বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার উত্তরে, প্রায় ১৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। সিলেট তামাবিল রুটে জাফলং থেকে বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন পর্যন্ত রাস্তা খুব খারাপ। আমরা সেই ভাঙা রাস্তার ধকল সহ্য করে পৌঁছাই বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন অফিসে। এখানে আধঘণ্টার মধ্যে ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে নো ম্যান্স ল্যান্ড পার হয়ে আমরা ডাউকী সীমান্তে। ঐদিন আমাদের জন্য গাইড অপেক্ষা করছিলেন। প্রথমে পরিচয় হলো বাপ্পীদার সঙ্গে। বাপ্পীদাই ইমিগ্রেশনের সব ঝক্কি ঝামেলা শেষ করালেন। তারপর আমরা রওয়ানা দিলাম শিলংয়ের উদ্দেশে। পাহাড়ী রাস্তা, এক পাশে খাদ আর এক পাশে পাহাড়। প্রায় ২০ মিনিট পর দেখা মেলল সেই ব্রিজ, যেই ব্রিজটি ছোট বেলা থেকেই খুব আকর্ষণ করতো আমাকে। ব্রিজটি আবার ওয়ান ওয়ে, ছবি তুলতে গেলাম, বাপ্পীদা নিষেধ করলেন। পথে পথে ঝর্ণার শো শো শব্দ মনটা ভরে যায়।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিনহাজার ফুট ওপর দিয়ে পাহাড়ি পথে আমরা এগিয়ে চলেছি ছড়ানো ছিটানো অনেকগুলো ঝর্ণা দেখতে দেখতে। পাহাড়ি রাস্তা কেবল খাড়াই নয়, বিশ থেকে ত্রিশ ফুট পরপর রয়েছে ভয়ানক মোড়। অতিসাবধানে ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছিল। ট্যাক্সি থেকে বাইরে তাকালেই মনকাড়া পাইন গাছের সারি। গাড়ি থেকে নিচে তাকালেই মন একেবারে ঠা-া হয়ে যায়। চোখ চলে যায় কয়েক হাজার ফুট নিচে। শহরের যত ওপরে উঠেছি ততই ঠা-া লেগেছে। বিশাল বিশাল পাহাড় আর তার বুক চিরে রাস্তা। দু’পাশে পাহাড়ী খাঁদ। এ খাঁদের মাঝে আবার দু’এক জায়গাতে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ী নদী, সাপের মতো পাহাড়ও গা বেঁয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে।

গাড়িতে বাজছে পুরনো হিন্দিগান আর বাইরে সবুজ পাহাড় ঝর্ণাÑ সব মিলিয়ে অসাধারণ পরিবেশ। কিছুক্ষণ পরেই আমরা হারিয়ে গেলাম মেঘের রাজ্যে। পথে ছবি তোলার সুযোগ আর ছাড়লাম না। শিলংয়ে যাওয়ার রাস্তা অসাধারণ সুন্দর, আঁকাবাঁকা। বারোটার দিকে পুলিশ বাজার পৌঁছে যাই। পুলিশ বাজারে মোটামুটি সব হোটেলই আছে। তাই ঘুরে ঘুরে খুঁজে নিলাম পছন্দের হোটেল। হোটেলে গিয়ে ফ্রেস হয়েই আমরা বেরিয়ে পড়লাম ঘুরতে। প্রথমে গেলাম হেইদার পার্কে। আসামের গবর্নরের স্ত্রী লেডী হেইদারের নামে এই পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে। এখানে একটি মিনি চিড়িয়াখানা আছে। এরপর গেলাম চার্চ এ। আসাধারণ শিল্পনৈপুণ্য ভেতরে ও বাইরে। এটিই এশিয়ার সর্ববৃহৎ চার্চ। এরপর গেলাম ওর্য়াডস লেকে। সেখান থেকে শিলং গলফ কোর্স মাঠে। এটি ৫২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এবং এতে ২২টি হোল আছে। সবুজ এ ঘেরা মাঠ দেখলে যেন মনে হয় ঘাসের ওপর বসে দিন পার করে দেই।

পরদিন সকালে বাপ্পীদা এসে আমাদের নিয়ে যায় চেরাপুঞ্জি। এখানে আকাশ সব সময় মেঘাচ্ছন্ন। কখনও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। যে কোন সময় বৃষ্টি হয়। ১৯৪৭ সালে এখানে ২৪৫৫.৩ মি.মি বৃষ্টি হয়, যা কোন এলাকাতে এক বছরে সর্বাধিক বৃষ্টিপাত। চেরাপুঞ্জির যাবার রাস্তাটা অসাধারণ। আঁকাবাঁকা রাস্তা কোথাও মেঘে ঢাকা, কোথাও আলো। ব্রিজ থেকে মেঘের ভেলা দেখলাম। অসাধারণ মেঘ যেন আমাদের ছুঁয়ে যাচ্ছিল। চেরাপুঞ্জির মেঘের অসাধারণ মেঘের খেলা মনকে অভিভূত করে রেখেছিল। এরপর গেলাম সেভেন সিস্টারস ফল দেখতে। অসাধারণ দৃশ্য। যেন কেউ তুলির পরশ দিয়ে ছবি এঁকেছে। সেখান থেকে গেলাম ইকো পার্কে। এখান থেকেই সেভেন সিস্টার ফলসে পানি বেয়ে নামে। এরপর আমরা গেলাম মাওসমাই গুহায়। ছোট একটি গুহা। ভেতরে সুড়ঙ্গের মতো রাস্তা। এখান পর্যটকদের চলাচলের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা আছে। গুহাটা অসাধারণ এবং কিছুটা ভয়ঙ্কর। ভেজা, কাঁদা মাখা পথ কিছু জায়গায় গুহাটির এত সরু যে আমাদের প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে পার হতে হয়েছিল।

চেরাপুঞ্জিতে ঘুরে বেড়ানোর সুবিধা হলো সব ঝরনা গাড়িতে বসে দেখা যায়। পাহাড়ে ট্রেকিং করে যাওয়ার দরকার হয় না। আমরা কিছু সময় বিরতি দিয়ে আবার রওনা হই শিলংয়ের পথে। পথে বেশ কয়কটা ঝরনা দেখলাম। শিলং ফিরে গেলাম ডন বস্কো মিউজিয়াম দেখতে। এখানে পুরো নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়ার সংস্কৃতির পুরো ধারণা পাওয়া যাবে। এই মিউজিয়াম ভালভাবে ঘুরে দেখতে হয়ে প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এরপর এলাম বড়াপানি লেক-এ। বিশাল লেক। এখানেও স্পিড বোট দিয়ে ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা আছে। লোভ সামলাতে পারলাম না। কারণ এর আগে ওর্য়াডস লেকে বোটে উঠতে পারিনি সময়ের অভাবে। এরপর গেলাম এলিফেন্ট ফলস দেখতে। খাসিয়ারা এই ঝর্ণাটিকে তিন ধাপের ঝর্ণা বলত। পরবর্তীতে ব্রিটিশরা এর নাম দেয় ‘এলিফেন্ট ফলস’, কারণ ঝর্ণাটির বাম পাশে হাতির মতো একটি পাথর ছিল। ১৯৮৬ সালের ভূমিকম্পে পাথরটি ধ্বংস হয়ে যায়। এলিফেন্ট দেখে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা। হোটেলে রুম এ এসেই কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম শহর ঘুরতে।

শিলং অসম্ভব সাজানো গোছানো সুন্দর ছোট শহর। শহরে দেখা মেলে সুন্দর সব একতলা, দোতলা বাড়ি, রাস্তাঘাট বেশ ভাল, ঘুরে বেড়াতে বেশ মজা, সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার যা চোখে পড়ল প্রায় সব বাড়ির সামনেই ফুল গাছের ঝাড়। ঘর যত ছোট হোক না কেন ফুলের স্নিগ্ধ ছোঁয়া তাতে থাকবেই। পুলিশ বাজার খুঁজে পেলাম মিষ্টির দোকান। বিভিন্ন ধরনের নাম না জানা মিষ্টি দেখলেই জিভে জল আসে। রাত ৯টারও বেশি বেজে গেল হোটেলে পৌঁছাতে। রাতের বেলা পাহাড়ের ওপর বাতি জ্বালানো শহরগুলোর রূপ অসাধারণ। পরদিন রওয়ানা দিলাম দেশের পথে। ফিরতি পথে লিভিংরুট ব্রিজ, ব্যালেন্সিং রক দেখে বর্ডারে পৌঁছে বাপ্পীদাকে বাংলাদেশে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে ছুটে চললাম সেই ঘুণে ধরা জীবনের পথে।