২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ওসমান আলী, নসরদ্দি ও তাদের জমিজিরাত

  • মনোয়ার আলী

ওসমান আলীর বাস দক্ষিণের এক গ-গ্রামে। তার মতো কিছু লোকের কারণে গ্রামটা অনেকদিন থেকেই সমৃদ্ধ, জনাকীর্ণও বটে। বাঁশঝাড়ের মতো তাদের বাড়বাড়ন্ত পরিবার বহু আগেই নিজ গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে আশপাশের ভিন গ্রামের ওপর থাবা বসিয়েছে। দিনে দিনে তাদের বসতি বেড়েই চলেছে। শুধু জমিজেরাত নয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি সবক্ষেত্রেই তাদের পরিবারের রমরমা অবস্থা। ওসমান আলীর ভাষায়Ñ সবই আল্লার ইচ্ছা, আল্লার কুদরতে তাদের অর্থ-বিত্ত-বুদ্ধি কোনটারই অভাব নেই। ওসমান আলী অবশ্য বড়াই করে বলেনি, তবে আমি জানি, ওদের আরও যে জিনিসটার অভাব নেই সেটা লাঠিÑ লাঠির জোর। দু’যুগ আগেই জানতাম এবং এখনও দেখে মনে হয় না যে ওটা তারা কখনও ছেড়েছে।

এই ওসমান আলীর সঙ্গে আমার আবার দেখা হলো প্রায় দু’যুগ পর, আমি তখন সবে মহকুমা ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে বদলি হয়ে এসেছি। দীর্ঘদিন পর প্রথম দেখায় আমাকে চিনে উঠতে ওসমান আলীর দু’দ- বিলম্ব হয়নি। এটা ওর একটা ঈর্ষণীয় গুণ। দুর্ভাগ্যক্রমে, আমি এই গুণ থেকে বঞ্চিত। ফলে কলেজের দুর্দান্ত সহপাঠীকে চিনেও চিনে উঠতে আমার খটকা সহজে কাটেনি। কিছু কারণ অবশ্য ছিল। ওসমান আলীর মাথা থেকে এখন সহসা টুপি নামে বলে মনে হয় না, সে টুপির কিনারা আবার তেল চিটচিটে, কালচে। ঘোর নামাজি নিশ্চয়। মুখভর্তি ঘন কাঁচাপাকা দাড়ি। এসব আমার অতি চেনা ওসমান আলীর সঙ্গে একান্তই বেমানান। তার গায়ের রং এমনিতেই কালো। এখন যা বাড়তি, তা হলো কালো কপালের মাঝে ততোধিক ঘনকালো বড়সড় গোলাকার এক মোহরের ছাপ। এই ছাপের মাহাত্ম্য আমার জানা, আপাতত শ্রীহীন এই ছাপটি হাশরের ময়দানে ব্লাক ডায়মন্ডের মতো আলোক বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে তাকে বেহেস্তের পথ দেখাবে। ওই দাগ হাসিলের জন্য ছোটবেলায় নামাজের পাটির ওপর সেজদায় দড়াম দড়াম করে প্রচুর কপাল ঠুকেছি, সবই বৃথা গেছে। ওস্তাদজী হতাশ করেছিলেনÑ ‘এভাবে চেষ্টার কাম নারে বেটা, আল্লার খাস বান্দারাই কেবল এ সৌভাগ্যের অধিকারী হয়।’ তখন ওস্তাদজীর ধর্ম কথা কাহিনীতে বিশ্বাসের কমতি ছিল না। ঠিক স্মরণ নেই, তবে সেই থেকেই হয়ত কপাল ঠোকা বন্ধ করেছিলাম। ওসমান আলীকে দেখে এতদিনে কথাটা আবার মনে পড়ল। ভাবি সেও হয়ত ওস্তাদজীর মতো আল্লার খাস বান্দাদের একজন। তিনি কাকে কখন কিভাবে পথ দেখান কে বলতে পারে!

আমার চেনা ওসমান আলী দু’যুগ আগে এমন ছিল না বরং তার অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে। সেই ষাটের দশকে কলেজ জীবনে কি জীবনদর্শন, কি রাজনীতি সবক্ষেত্রেই তাকে ঘোর বামপন্থী বলেই চিনতাম এবং সেটা এতদূর যে তার চাঁছাছোলা কথায় মাঝে মাঝে আমাদেরই বিরক্তি ধরে যেত, এমনকি কখনও কখনও উদ্বিগ্নও হয়ে উঠতাম।

সেই ওসমান আলী এক সকালে সামনে পেছনে চার পাঁচজন ছোট-বড় ছেলে-মেয়ে নিয়ে আমার অফিসে এলো। মেয়েটা সবার ছোট, বাবার কোলে। আমার দিকে চোখ পড়তেই কয়েক সেকেন্ড থমকে দাঁড়িয়ে বললÑ ‘তুমি এখানে, ভালই হলো, লোক অপরিচিত হলে খরচপাতি বেশি হয়, ঝামেলাও হয়। তবে ভেব না, কলেজের বন্ধু বলে তোমার ন্যায্য পাওনা দেব না? দেব, আমার টাকার অভাব নেই।’ তারপর ছেলে-মেয়েদের উদ্দেশে বলল, তোমাদের চাচা হন, সালাম কর। সালামের সিরিজ শেষ হতে না হতেই বলল, ওদের সঙ্গে নিয়ে এলাম, দেখুক, শিখুক, এসব অফিস চিনে রাখা ভাল, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। আমরা আর ক’দিন, হায়াত-মউতের কথা কে বলতে পারে!

দীর্ঘদিন পর দেখা, ভালই লাগল। বললাম, এরা তোমার ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি নিশ্চয়।

না, এরা সবাই ছেলে-মেয়ে। আমার ছয় ছেলে চার মেয়ে, আল্লায় দিলে ছোট বিবির ঘরে আরও একজন আসছে। মাসখানেকের মধ্যেই এসে যাবে ইনশাআল্লাহ। বড় মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিয়েছি, বড় ছেলে দুটো আসেনি, তারা কাজে ব্যস্ত। তোমার কয়টা?

বললাম, তিন ছেলে-মেয়ে। এক ছেলে, দু’মেয়ে। আফসোস করে বললাম, আমরা যাহোক শহরে জন্মশাসনের কিছু কিছু সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকি, তোমাদের অজপাড়াগাঁয়ে তো সেসব দুষ্প্রাপ্য হবারই কথা।

দুষ্প্রাপ্য!Ñ ওসমান আলীর ভরাট মুখ সহসা রাগে বিরক্তিতে কুঞ্চিত হয়ে গেল, আমাকে হতভম্ভ করে সে খিঁচিয়ে উঠলÑ বলি শয়তানি জিনিস দুষ্প্রাপ্য হলো কবে? তবে শোন, আমাদের গ্রামের ত্রিসীমানায় ওসব ঘেঁষতে দিইনে, বুঝেছ। বছর দুই আগে নাছোড়বান্দা দুই ডবকা ছুঁড়ি ব্যাগভর্তি মায়া না কি যেন বড়ি নিয়ে গ্রামের বৌ-ঝিদের ফুঁসলানোর কোশেশ করছিল। ডেকে স্রেফ বলে দিয়েছিÑ ‘শোন মা সকল, আর যেন কোনদিন এ তল্লাটে না দেখি। এখানে জনাকয়েক বদ ছেলে-পেলে আছে, খুব বেয়াড়া, আমরা নিজেরাই সামলাতে পারিনে। আগানে-বাগানে টেনে নিয়ে পেট বাধিয়ে দিলে ঠেকাবে কে?’

থানা পুলিশ হয়েছিল অবশ্য। কি নাকি মহামহিমের সরকারী কাজে বাধা দিয়েছি। তা দারোগা সাহেবকে বললাম, ‘ভুলতো বলিনি, খোদা না খাস্তা কেউ যদি সত্যি তেমন কিছু করে বসে আপনারা অদ্দূর থেকে এসে ঠেকাতে পারবেন? অপরাধীকে শনাক্ত করবেনই বা কিভাবে, সাক্ষী পাবেন কোথায়? এসব কাজ তো আর হাট-বাজারের মধ্যে হয় না। পুলিশ আর কি বলবে, ভূরিভোজ করে নজরানা নিয়ে বিদায় নিল। আমার কিছু খরচপাতি হলো এই যা। এটা অবশ্য বেফজুল খরচ না, ধর্মের কাজ। সদকায়ে জারিয়া।’

তার মানে তুমি জন্মশাসন মানো না!

ওসমান আলী ক্রোধের সঙ্গে বলল, মুসলমান হলে মানে না, হিন্দু, ইহুদি নাছারা হলে মানতে পারে। মুসলমানদের সংখ্যা কমানোর ফন্দি আরকি! আসে কোত্থেকে ওসব হারাম মালপত্তর? ওদের দেশ থেকেই তো। তোমরা দুটো ডিগ্রী নিয়ে দু’চোখে দুটো ঠুলি এঁটে বসে আছো। ইসলামের বিরুদ্ধে দুনিয়াব্যাপী যে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে সেটা বুঝেও বুঝতে চাও না।

এই ওসমান আলী আমার অপরিচিতÑ একেবারেই অপরিচিত। সে জামানায় কলেজ ম্যাগাজিনে ‘ম্যালথাস থিওরি এবং পাকিস্তানের প্রেক্ষাপট’Ñ এ জাতীয় একটা লেখা লিখে হুলস্থুল ফেলে দিয়েছিল, আর আজ বলে কি! আমি সে কথা তুলতেই রেগেমেগে বলল, ‘আছে আছে, সবই মনে আছে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বোধবুদ্ধির যে ম্যাচুরিটি আসে, সেটা বোঝ না? আপসোস! অত বড় যে ইসলামী ফিলোসফারÑ ইমাম গাজ্জালী, তিনিও তো এক সময় বিভ্রান্ত ছিলেন, মোতাজিলাদের দলভুক্ত ছিলেন, পড়নি? আরে মিয়া, আল্লার অসীম কুদরতের কথা তুমি কি জানো? বাচ্চা যখন হয় মায়ের পেটটা কেমন স্ফীত হয়, জরায়ু মুখ কত বাড়ে তা না হয় দেখোনি তাই বলে জানোও না নাকি? আল্লার কুদরত ছাড়া এমন হতে পারে? তোমরা অতি নাদানÑ আল্লার ওই কুদরত থেকে কোন শিক্ষাই নেও নাই। আল্লা মুখ দিয়েছেন, ওই মুখের আহার যোগানোর জন্য মায়ের স্ফীত পেটের মতো পৃথিবীটাও বাড়িয়ে দেন তিনি, তা বোঝো!

পৃথিবী বাড়িয়ে দেন!

দেন তো অবশ্যই, তোমরা তার কি জানো?

মুখটা তেতো হয়ে গেল। কথা বাড়াতে ইচ্ছা ছিল না। তবু তিক্ততার সঙ্গে জিজ্ঞাসা না করে পারলাম না, তা তোমার ছেলে-মেয়েদের জন্মের সঙ্গে পৃথিবীর আয়তন কতটা বেড়েছে বলে তোমার ধারণা।

ওসমান আলীর মুখটা হঠাৎ বীভৎস হাসিতে বিকৃত হয়ে উঠল। বলল, তা বেড়েছে বইকি! এই তো, এগারো নম্বর আসার আগেই ইনশাআল্লাহ্্ আরও কাঠা দশেক বেড়ে যাচ্ছে। ওসমান আলীর কথায় চমকে উঠলাম, অফিস ঘরের দরজার পাশে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা মাঝবয়সী জীর্ণশীর্ণ ভাঙাচোরা এক লোকের দিকে তাকিয়ে সে অশ্লীলভাবে কথাগুলো বলল! লোকটার চেহারায় হতদরিদ্র কৃষকের ছাপ। পাশে ততোধিক শীর্ণ ভগ্নস্বাস্থ্য এক যুবক, শূন্যদৃষ্টি। বাবা এবং ছেলে নিশ্চয়ই। লোকটার হাতে মলিন কাপড়ে জড়ানো ভাঁজ করা কিছু কাগজ। অভিজ্ঞতা থেকে ওদের আমি চিনিÑ ‘হতভাগ্য বেচারামের’ দল! দায়ে পড়ে জমিজমা বিক্রি করে বাঁচতে চায়। বাঁচা হয় না, ক্রমাগত ডুবতে থাকে।

ওরা এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমাদের আলাপচারিতা শুনছিল। জিজ্ঞাসা করলাম, তাহলে আপনারাই বিক্রেতা, জমি বিক্রি করবেন?

লোকটা আগেও সালাম দিয়েছিল। ওসমান আলীর কথার তোড়ে জবাব দেয়া হয়নি। সে আবারও সালাম দিল, বিমর্ষভাবে বলল, হ হুজুর, ওনার লগে কথা পাকা হইছে, দশ কাঠা জমি ওনারে লিখা দিতাম।

কি নাম আপনার?

নসরদ্দি সানা। সাকিনÑ

তাকে থামিয়ে দিলাম। জিজ্ঞাসা করলাম জমি বেচবেন কেন?

কি করুম হুজুর, টেকা দরকার। জমি না বেচলে পামু কই!

পেয়েছেন সব টাকা?

হ, পাইছি।

ছেলে-মেয়ে ক’জন আপনার?

অষ্টজন হুজুর।

আটজন! তা ওদের জন্মের সময় আপনার পৃথিবী বাড়েনি? এই এনার যেমন বেড়েছে!

না হুজুর, নসরদ্দি বিষণœভাবে বলল, মোরটা বরং দফায় দফায় কমছে। ইমাম সাহেব আর ওনাগো ‘অজ-নছিয়তে’ পোলাপানের জন্ম ঠেকাইলাম না। অগোর মায় মরতে মরতে একপাল আ-া বাচ্চা জনম দিয়া গেল। অহন কি খাওয়ামু, কি পরামু, ক্যামনে চিকিচ্ছে করামু, মাইয়াগো বিয়াই বা দিমু ক্যামনেÑ কূল-কিানারা পাই না। বাপ-দাদাগো জমিজিরেত সব একে একে খোয়াইতেছি। মোর দুনিয়াটা বেবাক ছোট হই যাইতেছে হুজুর!