২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্বরূপ অন্বেষায় অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়

  • জাফর ওয়াজেদ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

অবশ্য ওই একই বছর কাশিমবাজারে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনের প্রথম অধিবেশনে অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় বঙ্গের কেন্দ্রস্থলে পুরাতত্ত্বসহ ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি সারস্বত ভবন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রেখেছিলেন। ১৯১০ সালে শরৎ কুমার রায়, অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, রমাপ্রসাদ চন্দ্র ও শশধর রায়ের উদ্যোগে রাজশাহী অঞ্চলের প্রতœসামগ্রী অনুসন্ধান ও সংগ্রহের লক্ষ্যে রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশনের সহায়তায় গড়ে তোলা হয় বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি। ওই বছরের এপ্রিলেই শুরু হয় সংগ্রহ অভিযান। প্রথম অনুসন্ধান শুরু হয় গোদাগাড়ীতে। বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য ও রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশনের একমাত্র মুসলিম সদস্য হাজী লাল মুহম্মদ সরদারের বাড়িটিকে কেন্দ্র করে শুরু হয় কার্যক্রম। দেওপাড়া, পালপাড়া, মালঞ্চি, জাগপুর, চব্বিশনগর, মান্ডইল থেকে কুমারপুর, প্রেমতলী, খেতুর বিজয়নগর অঞ্চলে অভিযান চালিয়ে মোট ৩২টি প্রতœসামগ্রী সংগহ করেন। এগুলো রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগারে সংরক্ষণ করা হয়। অক্ষয় কুমারসহ সহযোগীরা একটি জাদুঘর গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাদের এই সংগ্রহ রাজশাহী তথা পদ্মার এপার ওপারে সাহিত্য সংস্কৃতি তথা ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবস্থা তৈরি করে। এরপরও তারা অভিযান অব্যাহত রাখেন। কিন্তু সংগৃহীত প্রতœসামগ্রীর পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তারা। ১৯১২ সালে গবর্নর লর্ড কারমাইকেল এই জাদুঘরের জন্য প্রথম দুই শ’ টাকা অনুদান প্রদান করেন। বিভাগীয় কমিশনার জন মোনাহান এবং স্থানীয় জমিদারদের সহায়তায় বেসরকারী উদ্যোগে জাদুঘর স্থাপনের কাজ শুরু হয়। ১৯১৬ সালের ১৩ নবেম্বর গবর্নর লর্ড কারমাইকেল জাদুঘর ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯১৯ সালের ২৭ নবেম্বর ‘বরেন্দ্র রিচার্স মিউজিয়াম’-এর দারোদ্ঘাটন করেন গবর্নর লর্ড রোলান্ডশে। প্রাচ্য কলাবিদ অর্ধেন্দু কুমার গঙ্গোপাধ্যায় ‘দি মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায় এবং প্যারিমোহন সেনগুপ্ত ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তারা লেখেনÑ ‘যে জাদুঘর খোলা হইয়াছে তাহা বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা। শিক্ষার যে আদর্শ ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় সকলের স্বপ্নেরও অতীত হইয়া রহিয়াছে সেই আদর্শকে সফল করিবার এই এক সর্বপ্রথম উদ্যম। সাধারণভাবে প্রশংসা করিলেই চলিবে না, এ ঘটনাটি বিশেষ প্রশংসারই যোগ্য, কেননা বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগের সহিত যাহাদের কোনো সম্পর্ক নাই এমন কয়েকটি কর্মপরায়ণ শিক্ষিত লোকের অক্লান্ত চেষ্টা ও শিক্ষার গুণে এমন একটি জিনিসের প্রতিষ্ঠা হইয়াছে। শিক্ষার সকল কেন্দ্র হইতে বহুদূরে ইহা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। ইহাতে আমাদের শিক্ষা কার্যকে পরের কর্তৃত্বের হাত হইতে মুক্ত করা যায় কিনা তাহার অন্তত পরীক্ষা করিবার অবসর ঘটিতে পারে। বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির জাদুঘরে যে সমস্ত মূর্তি সংগৃহীত এবং গৌড়ের সাহিত্য কলা ধর্ম ও নানা রাজবংশের কীর্তিকলাপ সম্বন্ধে অনেক তথ্যই জানিতে পারিবেন।...বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির জাদুঘর কোনমতেই একটি প্রাদেশিক অনুষ্ঠানমাত্র নহে ভারতের অন্যান্য বড় বড় শহরের ইহা অনুকরণ করিবার জিনিস।’ বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির অন্যতম প্রথম প্রতিষ্ঠাতা অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় তার কর্মনিষ্ঠা এবং বিজ্ঞানসম্মত গবেষণার ধারায় ব্রিটিশ সরকার তাদের সন্তুষ্টির কথা জানান। ১৯১৫ সালে অক্ষয় কুমারকে ‘কায়সার-ই-হিন্দ’ স্বর্ণপদক প্রদান করা হয় এবং সিআইই উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সমিতির তিনি ছিলেন কর্ণধার। স্বাস্থ্য তেমন অনুকূল না থাকায় সহকারীদের সহায়তা নিতেন। সহযোগীরাও ছিলেন দক্ষ ও মেধাবী। ড. ক্ষিতীশ সরকার, ড. সরসী কুমার সরস্বতী, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বজেন্দ্র মোহন মৈত্র, নিরোদবন্ধু স্যন্যাল প্রমুখ ছিলেন অক্ষয় কুমারের সহযোগী। ১৯২৫ সালে তাঁরই আমন্ত্রণে মহাত্মা গান্ধী যখন জাদুঘর পরিদর্শনে আসেন, অক্ষয় কুমার তাঁকে সংবর্ধনা প্রদান এবং তাদের উদ্যোগের কথা জানান।

অন্নদাশংকর রায় রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ছিলেন। আত্মস্মৃতিতে লিখেছেন তিনি, ‘রাজশাহীতে বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির সংগ্রহশালা ছিল সারাদেশের মধ্যে একটি মহামূল্য প্রতœরতœগার। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় প্রমুখ মণীষীরা উত্তরবঙ্গের নানাস্থান থেকে প্রাচীন মূর্তি, ভাঙা পাত্র, তাম্রফলক, পুঁথিপত্র ইত্যাদি সংগ্রহ করে গবেষণার সূত্রপাত করেছিলেন। তাদের এই উদ্যোগ ছিল সম্পূর্ণ বেসরকারী। সেজন্য আরও বিস্ময়কর। আমি একবার কি দু’বার গেছি। বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতির সংগ্রহশালা দেখতে কলকাতা থেকে এসেছিলেন স্টেলা ক্র্যামরিশ, বিখ্যাত ভারত শিক্ষানুরাগিণী।’ বরেন্দ্র জাদুঘর প্রতিষ্ঠা হলে শরৎকুমার রায় এর সভাপতি এবং অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় হয়েছিলেন পরিচালক। প্রতœসামগ্রী ছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল গ্রন্থ প্রকাশ। ‘গৌড় রাজমালা’ ও ‘গৌড় লেখমালা’ গ্রন্থ দুটি প্রকাশের পর প্রবাসী পত্রিকায় প্রাচ্য প-িত বিজয় চন্দ্র মজুমদার মন্তব্য করেছিলেন, ‘ইতিহাস সংগ্রহ সংকল্পে যে সকল উদ্যোগ চলিতেছে, তাহা অত্যন্ত প্রশংসার যোগ্য’। এছাড়াও পাণিনির টীকা পুস্তক। ভাষাবৃত্তি ছাড়াও ধাতু প্রদীপ ও অলঙ্কার কৌস্তুভ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল জাদুঘর থেকে। বরেন্দ্র জাদুঘরটি সজ্জিত হয়েছিল অক্ষয় কুমারের পরিকল্পনায়।

রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের অনুপ্রেরণায় ও সহায়তায় ‘ভিক্টোরিয়া ড্রামাটিক ক্লাব’ নামে নাট্য সংগঠন গঠিত হয়। ক্লাবের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল টাউন হল। যেখানে নাটক মঞ্চস্থ হতো। অক্ষয় কুমারের প্রচেষ্টায় রাজশাহীতে নাট্য আন্দোলনও শুরু হয়েছিল। শুধু বাংলা নাটকই নয়, সংস্কৃত নাট্যাভিনয়ের সূত্রপাত রাজশাহীতে তারই হাতে। ‘শকুন্তলা’ ‘বেণীসংহার’ ইত্যাদি সংস্কৃত নাটকের সফল অভিনয় তার পরিচালনাতেই সম্ভব হয়েছিল। এই নাটক দেখে ছোট লাটবাহাদুর পরমপ্রীতি লাভ করেছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়। নলিনীরঞ্জন প-িত তার ‘কান্তকবি’ রজনীকান্ত গ্রন্থে লিখেছেন, ‘১২৯৭ (১৮৯১) হতে রাজশাহীতে ঐতিহাসিক প্রবর অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় ও ডাক্তার অক্ষয়চন্দ্র ভাদুড়ী প্রভৃতির চেষ্টায় নাট্যমোদের তরঙ্গ বহিতে থাকে।’

সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি শিক্ষা যে প্রয়োজন অক্ষয় কুমার সেকালেই সম্যক উপলব্ধি করেছিলেন। ১৮৯৭ সালে রাণী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বকালের ষাট বছরপূর্তি ‘ডায়মন্ড জুবিলী’ উপলক্ষে রাজশাহীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অক্ষয় কুমার তার ভাষণে রাজশাহীতে ‘রেশম শিল্প’ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব তুলে ধরেন। রাজশাহী সুদূর অতীতকাল থেকেই রেশম শিল্পের জন্য প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে খ্যাত। অক্ষয় কুমারের প্রচেষ্টায় ১৮৯৭ সালে রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ডায়মন্ড জুবিলী ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কুল’। এখানে গুটিপোকার বীজ তৈরি করা, সুতা রং করা, সুতো তৈরি করা, কাপড় বুনন ইত্যাদি বিষয়ে শিক্সা দেয়া হতো। অক্ষয় কুমার নিজেও এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক ছিলেন। এখান থেকে গুটিপোকার বীজ জাপান, ইতালি, ইংল্যান্ড এবং উপমহাদেশের অন্যান্য স্থানে চালান হতো। স্কুলের খ্যাতি এমনই ছিল যে, অক্ষয় কুমার তার ‘এন্ডি’ শীর্ষক প্রবন্ধেও উল্লেখ করেছেন, ‘অযোধ্যাঞ্চলের স্বদেশ হিতৈষী অনারেবল রাজা রামপাল সিং... তাঁহার জনৈক কর্মচারীকে এন্ডিকিট পালন শিক্ষা করিবার জন্য রাজশাহী পাঠাইয়া দিয়াছিলেন।’ এই রেশমের জন্য ইংরেজসহ ইউরোপীয় বণিকরা এখানে কুটি স্থাপনও করেছিলেন। অক্ষয় কুমার আধুনিক শিক্ষা বিস্তারে নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং অগ্রদূত হিসেবে কাজও করেছেন। কেবল সাহিত্য ও পুরাতত্ত্ব চর্চা নয়, ছিলেন সংগঠকও এবং বহু ছাত্র সমিতির সঙ্গে ছাত্রাবস্থায় জড়িত ছিলেন তিনি। ছাত্রদের কল্যাণ ও হিত সাধনায় কাজ করেছেন নিরলস। রাজশাহীতে ছাত্রসভা, কলকাতায় ছাত্র সমিতি, রাজশাহীতে গান্ধীর আহ্বানে গড়ে ওঠা চরকা সমিতি, ইন্ডিয়ান এ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজশাহী এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শিক্ষা বিস্তারে নিয়েছিলেন পদক্ষেপ। রাজশাহী কলেজ গড়ে তোলায় রেখেছিলেন অবদান। ১৮৯৬ সালে অক্ষয় কুমার গড়ে তুলেন শিক্ষকদের সংগঠন শিক্ষা পরিচয় সমিতি। পরিচয়ের আভিধানিক অর্থ অনুচর বা সেবক। আর এই সমিতি থেকে শরৎচন্দ্র চৌধুরীর সম্পাদনায় এবং অক্ষয় কুমারের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয় শিক্ষা বিষয়ক মাসিক পত্রিকা ‘শিক্ষা পরিচয়’। সমিতির সম্পাদক অক্ষয় কুমার এই পত্রিকায় নানা বিষয়ে লিখেছেন। পাঁচ বছর টিকে থাকা পত্রিকায় ‘শিক্ষা, শিক্ষক ও সাহিত্য, এই কি প্রকৃত শিক্ষা, ছাত্রোপদেশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষানীতি, শিক্ষার উদ্দেশ্য, শিক্ষা আদর্শ, শিক্ষককে, শিক্ষাÑ তত্ত্ব সংকলন, স্ত্রী শিক্ষা, শিক্ষকের উপযোগিতা, সাধারণ শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ক বহু প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এ সময়ে রাজশাহী থেকে উল্লেখযোগ্য আরো সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক সাময়িকী প্রকাশিত হয়। ১৩০৪ সালের আরেকটি উল্লেখযোগ্য মাসিক পত্রিকা ‘উৎসাহ’ প্রকাশিত হয়। সুরেশচন্দ্র সাহা সম্পাদিত এই পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, নিখিলনাথ রায়, শশধর রায়, জলধর সেনসহ সমকালীন খ্যাতিমান লেখকরা নিয়মিত লিখেছেন। ঊনিশ শতকের শেষ দশক থেকে বিশ শতকের ত্রিশের দশক পর্যন্ত রাজশাহী থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, রাজশাহী, রাজশাহী বাসী, রাজশাহী সমাচার, সাপ্তাহিক উদ্বোধন, ধর্মবন্ধু, চিকিৎসা, উৎসব, মুষ্টি, নূর আল ঈমান, মুসলমান শিক্ষা সমবায়, পল্লী বান্ধব, মার্কাবুল এসলাম ইত্যাদি। অক্ষয়কুমার এসব পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন। অক্ষয়কুমার তার ‘আশীর্বাদ’ শীর্ষক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘রাজসাহী নগরে ‘রাজসাহী প্রেস’ নামে মুদ্রণ যন্ত্রটি সর্বপ্রথমে স্থাপিত হয় এবং কবিবর জগচ্চন্দ্র সরকার মহাশয়ের সম্পাদকতায় ‘রাজশাহী সংবাদ’ নামে সংবাদপত্র প্রকাশের আয়োজন হইতে থাকে।’ এই প্রেস যে ব্রাহ্মসমাজের সাথে সম্পর্কিত ছিল অক্ষয় কুমার তার উল্লেখ করেছেন। অবশ্য ১২৭২ সালের চৈত্র মাস থেকে রাজশাহী হতে ‘হিন্দু রঞ্জিকা’ নামে পত্রিকা প্রকাশিত হয়। টানা ৮০ বছর পত্রিকাটি চালু ছিল। প্রথমে ঢাকায় ছাপা হতো, পরে রাজশাহীতে প্রেস স্থাপন করে সেখান থেকে ছাপা হয়ে আসছিল। অক্ষয় কুমার এই পত্রিকাতেও লিখেছেন। ১৩২২ সালে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত মহিলাদের পত্রিকা ‘বঙ্গ মহিলা’য় অক্ষয় কুমার নারী শিক্ষা নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন। অক্ষয়কুমার জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও লেখালেখি অব্যাহত রেখেছেন। ‘সাহিত্য’, ভারতী, প্রদীপ, বঙ্গদর্শন, প্রবাসী, বঙ্গভাষা, মানসী, মর্মবাণী ও ভারতবর্ষে পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ লিখেছেন। এসব আজও গ্রন্থবদ্ধ হয়নি।

১৩০১ সনে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ গঠিত হয় কলকাতায়। শুরুতে এর কার্যক্রম কলকাতাকেন্দ্রিক ছিল। ১৩১১ সনে রংপুরের জমিদার সুরেন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরীর বাঙালার প্রতি জেলায় পরিষদের শাখা সভা স্থাপন করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। এরপর রংপুর, রাজশাহী এবং ভাগলপুরে পরিষদের শাখা সমিতি স্থাপন করা হয়। এই পরিষদের ১৩১৫ সনে অনুষ্ঠিত কাশিমবাজার সম্মেলনে অক্ষয় কুমার পুরাতত্ত্ব সংগ্রহ ও সংরক্ষণে সারস্বত ভবন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রেখেছিলেন। একই বছর রাজশাহীর পুঠিয়ায় পাঁচ আনী বাড়ি প্রাঙ্গণে পরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশন হয়। যেখানে রাজশাহীর গৌরব ও অক্ষয় কুমারের ঘনিষ্ঠ স্বজন কান্তকবি রজনীকান্ত সেন স্বাগত সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। অক্ষয় কুমারের ছত্রছায়ায় তার (১৮৬৫-১৯১০) আবির্ভাব ঘটেছিল। আর তাই অক্ষয় কুমারের মতো আইন পেশা বেছে নিয়েছিলেন। অবশ্য দু’জনেই পেশায় থাকেননি। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় ততদিনে নিবেদিতপ্রাণ। রজনীকান্তর স্ফূরণ ঘটেছিল এই অক্ষয় কুমারের সাহচর্যে। গেয়েছিলেন সেই বিখ্যাত গান, ‘মায়ের দেয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই’Ñ যা আজও গীত হয়।’

বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলন পরিষদের অনুসরণে অক্ষয় কুমার গড়ে তুলেছিলেন ‘উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনী’। ১৩১৫ সালের ১৩ আষাঢ় রংপুরে প্রথম সম্মিলনে অক্ষয় কুমার সভাপতিত্ব করেন। প্রমথ চৌধুরী এতে অতিথি ছিলেন। ১৩২১ সালের ফাল্গুনে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত অষ্টম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছিলেন প্রমথ চৌধুরী। তিন দিনব্যাপী এই সম্মিলন চলে। অভিভাষণে প্রমথ চৌধুরী বাইশ বছর আগে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতিতে রাজশাহীতে প্রদত্ত তার ভাষণের উল্লেখ করে অক্ষয় কুমারের কর্মনিষ্ঠার ভূঁয়সী প্রশংসা করেছিলেন। জীবন সায়াহ্নে অক্ষয়কুমার দেখা পেয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে রাজশাহী মুসলিম ক্লাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও কবির সংবর্ধনা উপলক্ষে নজরুল তাদের আমন্ত্রণে রাজশাহী আসেন। তিনদিন অবস্থান করেন। শেষ দিন সকালে কবি সাক্ষাত করার জন্য অক্ষয় কুমার মৈত্রের বাসভবনে যান। তার চরণ স্পর্শ করতেই তিনি কবিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমরা অস্তমিত সূর্য, তুমি নতুন উদিত সূর্যের দীপ্তি নিয়ে এসেছ। তোমার প্রতিভাকে আমি ম্লান করতে দেব না। আমি কল্পনা করিনি যে, জীবন সায়াহ্নে তোমাকে এতো কাছাকাছি পাবো।’ কবি নজরুল অশ্রুসজল কণ্ঠে প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, ‘যিনি অভিশপ্ত ও কলঙ্কিত ইতিহাসকে পুনর্জীবিত করতে পারেন, যিনি সত্যকে সমাদৃত করতে পারেন, তিনি মরতে পারেন না। আশীর্বাদ করুন, আপনার চিন্তা ও চেতনাকে আমি যেন আমার কাব্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি।’

রাজশাহীতে অক্ষয় কুমারের সমকালে আরো ক্ষমতাশালী লেখক সাহিত্যিক নিরলস সাহিত্য চর্চা করেছেন। যা তাকে আর দেদীপ্যমান করেছে। রজনীকান্ত সেন ছাড়াও ছিলেন রাজেন্দ্র লাল আচার্য, ভবানী গোবিন্দ চৌধুরী, বিমলাচরণ মৈত্রেয়, শরচ্চন্দ্র রায় চৌধুরী, রমাপ্রসাদ চন্দ্র, শশধর রায়, আচার্য যদুনাথ সরকার, কালীনাথ চৌধুরী, বিনোদ বিহারী রায়, মির্জা মহম্মদ ইউসুফ, শ্রীশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় লিখেছিলেন সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস এবং জীবনী কবি বিদ্যাপতি (১৮৯৫)। তিনি লিখেছিলেন তথ্যপূর্ণ প্রবন্ধ আরও অনেক। তার কাব্য গ্রন্থ একটি। বেরিয়েছিল ১৮৮৬ সালে ‘প্রদীপ’ নামে। তার প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত পা-ুলিপি ও রচনা ১৯৮১ সালে তার সহকর্মী ড. ক্ষিতীশ চন্দ্র সরকার উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়কে উইল করে দিয়ে যান।

১৯৩০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পরলোক গমন করেন বাঙালির সারস্বত অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়। তখন তার বয়স ৬৯ বছর। রবীন্দ্রনাথ তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছিলেন। রাজশাহীতে যা কিছু অক্ষয় তাতেই অক্ষয় কুমার ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন তারই সহকর্মী ভবানী গোবিন্দ চৌধুরী। বাঙালির ইতিহাস, শিল্প, সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় পথিকৃৎ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় চিরদিনই অক্ষয় হয়ে থাকবেন।

নির্বাচিত সংবাদ