২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাসের নির্মোহ সাক্ষ্য-দলিল

  • সিরাজুল এহসান

... ‘ত্রিপুরার সমস্ত গণতান্ত্রিক গণসংগঠনগুলো এরই মধ্যে পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রামীদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন। গত ২৭ মার্চ ছাত্রদের ডাকে আগরতলা বন্ধ হয়ে গেল। বিভিন্ন মহকুমার ছাত্র-যুবকদের ডাকে আঞ্চলিক বন্ধ পালিত হয়েছে। গত ২১ মার্চ, ৬ ফেব্রুয়ারি কমিটির আহ্বানে দশ সহস্রাধিক ছাত্র-যুবক, শ্রমিক-কর্মচারীর এক দৃপ্ত মিছিল থেকে দাবি তোলা হয়েছেÑ পূর্ব বাংলায় গণহত্যা বন্ধ কর, ইন্দিরা সরকার পূর্ব বাংলার মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র দাও, রসদ দাও, অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি দাও।’... উদ্ধৃত অংশটি ভারতের ত্রিপুরা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘দেশের ডাক’ পত্রিকা থেকে চয়ন করা হয়েছে। এটি ওই পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের একটি অংশ মাত্র। প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল। এ রকম অজস্র সংবাদ সংকলিত হয়েছে মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত ‘গণমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’ গ্রন্থে। ২২তম খ- মূলত ভারতের ত্রিপুরায় বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্র থেকে সংবাদ, পর্যালোচনা, অভিমত, সম্পাদকীয় মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই রচিত।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু বাঙালীর জীবনেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার পাশাপাশি সারা বিশ্বের মুক্তি সংগ্রামে এক অনন্য সাধারণ ঘটনা। সে সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ যুদ্ধ বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাঙালীর এ স্বাধীনতা সংগ্রামকে অনেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন গণমাধ্যম দিয়েছে অকুণ্ঠ সমর্থন। তাদের ভূমিকা বাঙালীরাও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে। ভারতের ত্রিপুরাবাসীর সাহায্য-সহযোগিতা মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেখানকার গণমাধ্যমগুলোও বাংলাদেশের সৃষ্টিলগ্নে চিরস্মরণীয় ভূমিকা রাখে। বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি সেই সাক্ষ্য বহন করছে। এ এক অনন্য দলিল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা আজকের বাংলাদেশে একাত্তরের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। বর্বর পাকিস্তানী বাহিনীর নির্বিচারে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের কারণে প্রিন্ট মিডিয়ার প্রকাশনা অব্যাহত রাখা ছিল দুষ্কর। কোন কোনটি প্রকাশিত হলেও খ- বাস্তবচিত্র পাওয়া যেত, সম্পূর্ণ নয়। যারা ইতিহাস বিকৃতি করে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে, মনে করে কোন এক জেনারেলের হঠাৎ ঘোষণায় স্বাধীনতা সংগ্রাম হয়েছে শুরুÑ তাদের মুখে কুলুপ আঁটতে ও চপেটাঘাত করতে এ গ্রন্থটিই যথেষ্ট। বাংলা ভাষার পাঠক সহজেই বুঝতে পারবেন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম একদিনের ব্যাপার নয়। এটা দীর্ঘ ধারাবাহিকতার ফসল। আর এ ফসলের বীজ রোপণ থেকে শুরু করে ঘরে তুলে দিয়েছেন বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

লেখার শুরুতে উদ্ধৃত সংবাদটিতেই প্রকাশ পাচ্ছে স্বাধীনতা সংগ্রামে ত্রিপুরার রাজনীতিকদের বাংলাদেশের প্রতি তাদের অবস্থান। এটা একেবারে যুদ্ধের শুরুর দিকের এক খ-াংশমাত্র। সামগ্রিক চিত্র ছিল আরও আশাপ্রদ। ঠিক যুদ্ধের চরম মুহূর্তে বিজয় যখন সমাগত ওই সময়ের একটি মন্তব্য প্রতিবেদনের অংশবিশেষ এবার দেখা যাক। সাপ্তাহিক ‘ত্রিপুরা’র ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ সংখ্যায় একটি যুদ্ধের ব্যাপারে ‘সাবাস! এগিয়ে চল!’ শিরোনামের নিবন্ধে বলা হয় ...‘সাবাস জোয়ান ভাইরা! আমাদের বাহাদুর জোয়ান ভাইদের প্রশংসা করিবার মতো ভাষা অভিধানে নাই। আখাউড়া বিজয় আমাদের নিকট চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবে। এক রকম বিনা রক্তপাতে আমরা আখাউড়া জয় করিয়াছি বলিলে নেহাতই কম বলা হয়।... আগরতলা হইতে অবিরাম বার ঘণ্টা মুষলধারে কামান গোলা আর রকেট বর্ষণের বেগ সহ্য করিতে না পারিয়া পাক কামান, ট্যাঙ্কগুলো এ্যাবাউট টার্ন করিয়া সুর সুর করিয়া দুর্ভেদ্য বিবরে প্রবেশ ও আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য হয়। বস্তুত আখাউড়া জয় হইয়াছে বাহাত্তর ঘণ্টায় নহে, মাত্র বার চৌদ্দ ঘণ্টায়।’... এমন অনেক টাটকা ঐতিহাসিক ঘটনা পাঠক পাবেন বইটিতে। এখন এমন তথ্য-উপাত্ত, ঘটনা বিকৃত হচ্ছে কিনা, হলেও কিভাবে হচ্ছে, কারা করছে এর একটা পরিষ্কার ধারণাও পাওয়া যাবে এই মূল্যবান গ্রন্থটিতে। সে সময়ের কিছু আলোকচিত্র বইটিতে সংযোজিত হওয়ায় বাস্তবতার ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করছে। ত্রিপুরা থেকে ১৯৭১ সালে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকার মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ, নিবন্ধ-সংবলিত কিছু আলোকচিত্র গ্রন্থভুক্ত হওয়ায় বইটির গুরুত্ব বাড়িয়েছে বৈকি।

একটা জাতীয়, নির্মোহ ও মহৎ দায়িত্ব পালন করেছেন সম্পাদক মুনতাসীর মামুন। এ জন্য জাতীর কাছে শ্রদ্ধাভাজন হয়ে থাকবেন তিনি চিরকাল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা নিরপেক্ষ গবেষণা করেন, ইতিহাসবিদ ও নতুন প্রজন্মের জন্য এ গ্রন্থটি অবশ্যপাঠ্য বলে মনে করি। প্রকাশনার বিশাল গুরুদায়িত্ব অনন্যা প্রকাশনীর মনিরুল হক কাঁধে নিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তার পদক্ষেপ অবশ্যই ধন্যবাদার্হ। প্রচ্ছদে ব্যবহার করা হয়েছে শিল্পী কাইয়ূম চৌধুরীর ছবি আর পরিকল্পনা করেছেন হাশেম খান; এ এক অপূর্ব সমন্বয় ও সম্পদও বটে। প্রকাশনার মানও উৎকর্ষতায় উত্তীর্ণ। গ্রন্থটির বহুল প্রচারের পাশাপাশি এ জাতীয় পরিকল্পনা অব্যাহত থাকুক এমন কামনা করার যথেষ্ট সংগত কারণ আছে।