১৬ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গল্প ॥ ভানকা

  • মূল : আন্তন চেখভ;###;অনুবাদ : খুররম মমতাজ

ভানকা জুখভের বয়স নয় বছর। তিন মাস হলো সে জুতার কারখানার মালিক আলিয়াখিনের বাসায় কাজ নিয়েছে। আজ ক্রিস্টমাস ইভের রাত। বাড়ির সবাই গির্জায় গেছে রাতের প্রার্থনায় যোগ দিতে। বাসায় ভানকা একা। সে ঘুমাতে গেল না। সবাই বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই মালিকের দেরাজ খুলে ভানকা কালির বোতল আর ভোঁতা নিবের কলমটা বের করে আনলো। তারপর দোমড়ানো মোচড়ানো একটা কাগজ বেঞ্চের ওপর রেখে লিখতে শুরু করল। প্রথম শব্দটা লেখার আগে সে ভয়ে ভয়ে দরজা আর জানালার দিকে তাকাচ্ছিলÑ কেউ যদি এসে পড়ে! দেয়ালের গায়ে আইকন, আইকনের দু’পাশে আলমারির তাক, তাক ভর্তি নানা মাপের জুতার ছাঁচ। আইকনের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ভানকা। তারপর হাঁটু মুড়ে মাটিতে বসে লিখতে শুরু করল।

‘প্রিয় দাদু কনস্তানতিন মাকারিচ’, লিখল সে। ‘ক্রিস্টমাসের শুভেচ্ছা নিও, আর ঈশ্বর যেন তোমাকে সব...সবকিছু দেন, তাই মনে মনে প্রার্থনা করছি ঈশ্বরের কাছে। আমার তো বাবা-মা নেই, তাই তোমার কাছেই এই চিঠিটা পাঠালাম।’

বন্ধ জানালার কাচের দিকে চোখ তুলে তাকাল ভানকা। মোমবাতির মৃদু আলো পড়েছে কাচের ওপর। কল্পনায় সে দেখতে পেল তার দাদু কনস্তানতিন মাকারিচ দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে। দাদু চাকরি করে জমিদার জিভারিয়োভের বাড়িতেÑ রাতের পাহারাদারের চাকরি। দেখতে ছোটখাটো হালকা-পাতলা পঁয়ষট্টি বছরের বুড়োদাদুর মুখটা সবসময় থাকে হাসিখুশি আর চোখ দুটো মদ খাওয়ার কারণে একটু ঘোলাটে। দিনের বেলাটা দাদু রান্নাঘরের পাশে এক কোনায় ঘুমিয়ে কাটায় আর জেগে উঠে খুনসুটি করে রাঁধুনিদের সঙ্গে। রাতের বেলা ভারি একটা ভেড়ার চামড়ার কোট গায়ে দিয়ে বের হয় পাহারা দিতে। চলতে চলতে হাতের ঘণ্টাটা বাজায় দাদু, তার সঙ্গে থাকে দু’টো কুকুরÑ একটার নাম ব্রাউনি, অন্যটা দেখতে কালো আর লম্বা ইল মাছের মতোÑ সেজন্য ওর নাম ইল। চেনা অচেনা সবার সঙ্গেই খুব ভাল মানুষের মতো ব্যবহার করে ইল, কিন্তু ওর ভাল মানুষির আড়ালে শয়তানি লুকিয়ে আছে। চুপচাপ কারো পিছে বসে ঘুম দেয়া কিংবা মাছ-মাংসের লোভে ভাঁড়ারে হানা দেয়া অথবা লুকিয়ে লুকিয়ে গৃহস্থের মুরগি চুরি করার কাজে ও খুব ওস্তাদ। এই সব কারণে মারও খায় ইল। একবার পিটুনি খেয়ে ওর পেছনের পা’দুটো প্রায় খোঁড়া হওয়ার যোগাড়, দু’দুবার ওর গলায় দড়ি পরানো হয়েছিল। প্রতি সপ্তাহেই মার খায় ইল, মার খেতে খেতে আধমরা হয়ে যায়। তারপর আবার কেমন করে যেন বেঁচে ওঠে।

দাদু এখন কি করছে? হয়ত দাঁড়িয়ে আছে গেটের পাশে, চোখ দুটো কুঁচকে তাকিয়ে আছে গির্জার লাল উজ্জ্বল জানালার দিকে, মাঝে মাঝে বুট পরা পা দু’টো ঠুকছে মাটিতে গা গরম করার জন্য আর হাত-পা ছুঁড়ছে। তার কোমরে ঝুলছে ছোট্ট ঘণ্টিটা। হয়ত মস্করা করছে কাজের মেয়েদের সঙ্গে কিংবা খুনসুটি করছে কোন রাঁধুনির সঙ্গে।

‘এক টিপ নস্যি নেবে নাকি, অ্যাঁ?’ বলতে বলতে দাদু হয়ত নস্যির কৌটোটা বাড়িয়ে দিয়েছে মেয়েদের দিকে।

ওদের কেউ হয়ত নস্যি নেবে, তারপর হাঁচতে থাকবে। আর দাদু মজা পেয়ে হা হা করে হাসবে আর বলবে, ‘ঠা-ায় জমে যাওয়া নাকের জন্য দারুণ কিন্তু, অ্যাঁ...কি বলো?’

কুকুর দু’টোকেও নস্যি দেবে দাদু। ব্রাউনি মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে হাঁচি দেবে, তারপর মহাবিরক্ত হয়ে সরে পড়বে ওখান থেকে। ইল অবশ্য হাঁচি দেবে না, শুধু লেজ নাড়াতে থাকবে। চমৎকার আবহাওয়াÑ স্বচ্ছ পরিষ্কার টাটকা বাতাস, তেমন হাওয়াও নেই। অন্ধকার রাত, গ্রামের বাড়িঘরগুলোর মাথায় আর গাছের ডালে ডালে জমে আছে সাদা বরফ আর শুভ্র তুষারের কণা। রান্নাঘরে চিমনি দিয়ে বেরোচ্ছে হালকা সাদা ধোঁয়া। ঝিকমিক করছে আকাশে অসংখ্য তারা, যেন উৎসবের জন্যই ছায়াপথটাকেও ধুয়েমুছে ঝকঝকে তকতকে করে তোলা হয়েছে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো ভানকা, তারপর আবার কলমের নিবটাকে কালিতে চুবিয়ে লিখতে থাকল : ‘গতকাল আবার আমাকে মেরেছে। চুলের মুঠি ধরে টেনে হেঁচড়ে মালিক আমাকে নিয়ে গেছে উঠোনের মাঝখানে, তারপর ঘোড়া বাঁধার রশি দিয়ে বেদম মেরেছে। বাচ্চাটাকে দোলনায় দোল দিতে দিতে কেমন করে যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, এই আমার দোষ। গত সপ্তাহে একদিন কর্ত্রী আমাকে কই মাছের নাড়িভুঁড়ি পরিষ্কার করতে দিল। লেজের দিক থেকে কেন শুরু করলাম, এই অপরাধে মাছটা কেড়ে নিয়ে কর্ত্রী আমার মুখেই মাছটা ঘসে দিল। অন্য কাজের লোকরাও আমাকে নিয়ে তামাশা করে। ভাঁড়ার থেকে জোর করে ভোদকা আর শসা চুরি করতে পাঠায়। মালিক টের পেলেই হাতের কাছে যা পায় তাই দিয়ে পেটাতে থাকে। খেতেও দেয় না পেট ভরে। সকালে এক টুকরো রুটি, দুপুরে সামান্য ঘ্যাঁট, রাতে আবার শুকনো রুটি। ওরা স্যুপ খায়, ভাল ভাল খাবার খায়, আমাকে কিছুই দেয় না। ঘুমাতে দেয় ঘরের বাইরে করিডরে। যেদিন বাচ্চা কাঁদতে থাকে, সেদিন ঘুমাতেও পারি না, সারারাত বাচ্চার দোলনা দোলাতে হয়। দাদু, লক্ষ্মি দাদু...আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, তোমার ওখানে যেতে চাই আমি, গ্রামে নিয়ে যাও আমাকে, আমি আর পারছি না দাদু...তোমার পায়ে পড়ি। তোমার জন্য আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবো যেন তিনি তোমাকে সুস্থ রাখেন, অনেক প্রার্থনা করবো, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও, নাহলে হয়তো আমি মরেই যাবো।’

লিখতে লিখতে কান্না পেল ভানকার, কালি মাখা হাত দিয়ে সে চোখ মুছল, কাঁদতে থাকল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।

‘আমি তোমার নস্যির গুঁড়ো তৈরি করে দেব,’ লিখে চললো ভানকা। ‘প্রার্থনা করবো তোমার জন্য, যদি কোনো ভুল করি তুমি আমাকে মেরো যত খুশি। ওখানে যদি কোনো কাজ না থাকে, আমি নায়েব মশায়ের পায়ে ধরে বলবো যেন তিনি আমাকে দয়া করে বুটজুতো পরিষ্কারের কাজে লাগিয়ে দেন, কিংবা ফেদিয়ার সঙ্গে রাখালের কাজ করতে দেন। নাহলে আমি আর পারছি না দাদু, এখানে আমি মরেই যাবো। পালিয়ে যাওয়ার কথাও একবার ভেবেছি, কিন্তু আমার তো বুটজুতো নেই, বাইরে শুধু বরফ আর বরফ, বরফকে আমার ভীষণ ভয়। তুমি যদি আমাকে নিয়ে যাও, আমি বড় হয়ে তোমার দেখাশোনা করবো, কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। তারপর যখন তুমি মরে যাবে, আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবো যেন তিনি তোমাকে স্বর্গবাসী করেনÑ তোমার জন্য প্রার্থনা করবো আমি, যেমনটা করি আমার মায়ের জন্য।’

‘মস্কো শহরটা অনেক বড়, জানো দাদু? কত বিরাট বিরাট সব দালান-কোঠা বড়লোকদের! অনেক ঘোড়া আছে এখানে, কিন্তু ভেড়া নাই একটাও, কুকুরগুলোও তেমন তেজি না। এখানে ক্রিস্টমাসের তারা হাতে ছেলেরা ঘুরে বেড়ায় না, গির্জায় ওরা আমাকে গানও গাইতে দেয় না। একবার একটা দোকান দেখেছিলাম, মাছ মারার জিনিস বিক্রি করছে। কাচের এপাশ থেকে দেখলাম ছিপ, কাঁটা, সুতোÑ এসব সাজিয়ে রেখেছে, কত বড় বড় ছিপ! চল্লিশ পাউন্ড ওজনের মাছ টেনে তোলা যায় এরকম ছিপও আছে! বন্দুকের দোকানও দেখেছি আমি, আমাদের ওখানে জমিদার বাবুর যেমন বন্দুক আছে ঠিক সেইরকম বন্দুক। দাম বোধহয় অনেকÑ হয়তো একশো রুবল হবে। কসাইয়ের দোকানে দেখেছি বনমোরগ বুনোহাঁস আর খরগোস ঝুলিয়ে রেখেছে। কে এদের শিকার করেছে, কোথায় গুলি লেগেছেÑ এসব জিজ্ঞেস করলে কসাই চুপ করে থাকে, কোনো জবাব দেয় না।’

‘প্রিয় দাদু, ওখানে যখন ক্রিস্টমাস ট্রি সাজানো হবে আমার জন্য একটা সোনালি রঙের চকলেট চেয়ে নিও। ওলগা ইগনাতায়েভনার কাছে চেও, বলো এটা ভানকার জন্য। তারপর সবুজ রঙের ড্রয়ারটার মধ্যে রেখে দিও, কেউ যেন না দেখে।’

বড় একটা নিঃশ্বাস নিল ভানকা, আবার ভয়ে ভয়ে জানালার দিকে তাকাল। ওর মনে পড়ল দাদুই ক্রিস্টমাস ট্রি কেটে আনার জন্য জঙ্গলে যেত, সঙ্গে নিয়ে যেত ভানকাকে। কি সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো! জঙ্গলে যাওয়ার পথে হাসত বুড়ো দাদু, বরফ ভাঙার চড়চড় শব্দ হতো, আর ভানকাও দাদুর পিছে পিছে যেত নানারকম পাখির ডাক ডাকতে ডাকতে। পছন্দ মতো একটা ফার গাছ কাটার আগে দাদু পাইপ ধরাত, এক টিপ নস্যি নিত আর ভানকার সঙ্গে দুষ্টুমি করত। ভানকা তখন ঠা-ায় হিহি করে কাঁপত। তুষার ঢাকা ফার গাছগুলোও ঠা-ায় জবুথবু হয়ে একেবারে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকত, মনে হতোÑ কে এবার কাটা পড়বে সেটা দেখার জন্যই যেন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো...এমন সময় কোথা থেকে হঠাৎ ছুটে আসত একটা বুনো খরগোশ, তুষারের ভেতর দিয়েই ছুটে চলে যেত তীরের মতো। দাদু চেঁচিয়ে উঠত, ‘র্ধ! র্ধ লেজওয়ালা পাজিটাকে র্ধ!’

কাটা গাছটা টানতে টানতে বিরাট বাড়িটার কাছে নিয়ে যেত দাদু। তারপর শুরু হতো ক্রিস্টমাস ট্রি সাজানো। ভানকার মা পেলাগায়া ঐ বাড়িতে কাজ করত। সবাই মিলে সাজানো হতো ক্রিসমাস ট্রি, সবচেয়ে বেশি ছুটোছুটি করতেন গৃহকর্ত্রী ওলগা ইগনাতায়েভনা। ভানকা তাঁকে খুব পছন্দ করত, তিনিও ভালোবাসতেন ভানকাকে, পকেটে চকলেট গুঁজে দিতেন, লেখাপড়াও শিখিয়েছিলেন, এক থেকে এক শ’ পর্যন্ত গুনতে বলতেন। এমনকি কোয়াড্রিল নাচও শিখিয়েছিলন তিনি ভানকাকে। কিন্তু মা মারা যাওয়ার পরই সবকিছু কেমন ওলট-পালট হয়ে গেল। ভানকাকে থাকতে দেয়া হলো রান্নাঘরের এক কোনায় দাদুর সঙ্গে, তারপর পাঠিয়ে দেয়া হলো মস্কোতে, জুতো কারখানার মালিক আলিয়াখিনের বাসায়...

‘তাড়াতাড়ি একদিন আসো, আমাকে নিয়ে যাও,’ ভানকা লিখতে থাকল, ‘দোহাই তোমার দাদু, আমি তো এতিম, দয়া করো আমাকে। ওরা সবসময় মারে, খেতেও পাই না, সারাক্ষণ কাঁদি আমি। সেদিন জুতো বানানোর ছাঁচ দিয়ে মালিক মাথায় মেরেছিল। মাটিতে পড়ে গেলাম, মনে হচ্ছিল বোধহয় মরেই যাবো। কুকুরের চেয়েও খারাপ জীবন কাটছে আমার দাদু। আলিয়োনা আর কানা ইগোরকে শুভেচ্ছা দিও, কোচোয়ান কাকাকেও, আমার হারমোনিকাটা কাউকে যেন দিয়ে দিয়ো না। ইতি তোমার নাতি ইভান জুকভ, আর তাড়াতাড়ি এসো কিন্তু দাদু!’

চিঠিটা ভাঁজ করল ভানকা। আগের দিন এক কোপেক দিয়ে কেনা একটা খামের মধ্যে ভরল চিঠিটাকে। একটু চিন্তা করল, তারপর দোয়াতে কলম চুবিয়ে ঠিকানা লিখল:

আমার দাদু,

আমার গ্রাম

মাথা চুলকে আবার একটু চিন্তা করল ভানকা। তারপর দাদুর নামটা যোগ করে দিলÑ

কনস্তান্তিন মাকারিচ।

চিঠিটা শেষ করে মনে মনে খুশি হয়ে উঠল ভানকা, হঠাৎ কেউ এসে পড়েনি, ক্যাপটা মাথায় চাপালো সে, তারপর কোট না পরেই শুধু শার্ট গায়ে ছুটলো ডাকবাক্সের দিকে।

গতকাল কসাইয়ের দোকান থেকে ভানকা জেনে নিয়েছে চিঠি ফেলতে হয় ডাকবাক্সে। ঝুম ঝুম ঘণ্টা বাজিয়ে তিন ঘোড়ায় টানা ত্রইকা চালিয়ে মাতাল ড্রাইভাররা এসে নিয়ে যায় চিঠি, তারপর সেই চিঠি পৌঁছে দেয় যার যার ঠিকানায়। ভানকা দৌড়ে গেল মোড়ের মাথায় ডাকবাক্সের কাছে, চিঠিটা ফেলে দিল বাক্সের ফোকড় গলিয়ে।

এক ঘণ্টা পর, স্বপ্নের উষ্ণতায় বিভোর ভানকা ঘুমের ভিতর দেখলÑ রান্নাঘরের চুলোয় আগুন জ্বলছে, চুলোর পাশে বসে দাদু চিঠিটা জোরে জোরে পড়ে শোনাচ্ছে রাঁধুনিদেরÑ ভানকার চিঠি। ইলও একপাশে কু-লী পাকিয়ে শুয়ে আছে, মাঝে মাঝে লেজটা নাড়ছে খুশিতে।