২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আত্মখননের ইতিবৃত্ত

  • সৌম্য সালেক

‘ঠোঁট কেঁপে ওঠে রাতে স্বপ্ন বুঝি খুলে ফেলে খাম

ভেতরে সোনালি নাভি দুস্তর ত্রিকান নামে ধীরে’

ভাষা ও সাহিত্যের প্রামাণ্য ইতিহাসের সাক্ষ্য হচ্ছে- মানব মনের স্বতঃস্ফূর্ত বাহন ও মাধ্যম হচ্ছে কবিতা। মানুষের যে মন চিন্তা করে, ভাবে, উপলব্ধিতে দুলে ওঠে, সৌন্দর্যে-প্রেমে যে মন বিকশিত হয়, অন্যায়-অবিচারে যে মন ক্ষুব্ধ, মিথ্যা ও অধর্মে যে মন বিদ্রোহী, সত্য ও মহত্ত্বের অগ্নিস্পর্শে যে মন প্রদীপ্ত তারই রূপায়ণ ঘটে কবিতায় নানাভাবে ও বিচিত্র রাগে। তাই কবিতার সাথে মানবেতিহাসের পরিবর্তন ও সভ্যতার অঙ্গাঙ্গী সম্বন্ধ রয়েছে। সভ্য অথচ উঁচু মানের কবিতা লেখা হয়নি, চর্চা হয়নি এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল বা তেমন কোন উন্নত জাতি বোধ করি চিহ্নিত করা কঠিন হবে। শোক, দ্বিধা, বিকার, মৃত্যু, প্রেম, কাম, বীরত্বসহ মানব মনের এমন কোন অবস্থা নেই যা কবিকণ্ঠে উচ্চারিত হয়নি। তাই চিরন্তন ও আদি শিল্প হিসেবে সর্বাগ্রে কবিতার কথা চলে আসে। যখন দু’জনের চোখে আর কোন আলো নেইÑ বিষাদ ছেয়ে ফেলে চরাচর, দুটি পথ এগিয়ে যায় দুইমুখী তখন কবির কণ্ঠেই কেবল সুর তোলেÑ ‘না কিচ্ছুটি নেই শুধু ঘনিয়ে আসছে রূঢ় সন্ধ্যা/তুমি আমি ভুল পায়ে মেপে যাই দূরত্বের পথ।’ ‘ব্যক্তিগত পরিখা’ কবি জাহিদ সোহাগের তৃতীয় কাব্য। এ কাব্যের শব্দ চিন্তা এবং নির্মিতির ক্ষেত্রে কবি বেছে নিয়েছেন অনুভূতি প্রকাশের প্রচ্ছন্ন ও সংযত এক শিল্পভাবনা যা উত্তেজিত করে না বরং ছুঁয়ে দেয়। নির্লিপ্ত নিষ্পৃহ কতিপয় রাতহারা- চন্দ্রহারা ব্যতিরেকে অনুভূতি সবাইকে নাড়া দেয় কিন্তু অনুভূতি বাঙ্ময় হয়ে ওঠে কেবল কবি ও শিল্পীর শব্দে-তুলিতে। মা’কে অসাড়-রুগ্ন দেখার অনুভূতি প্রত্যেক সন্তানের জন্য পীড়াদায়ক; একেবারে সংগতিহীন পর্যন্ত মায়ের বিছানার পাশে পৌঁছে যায় দুঃখের দাওয়াই নিয়ে। অনুভবকে চূড়ান্তভাবে প্রকাশে ভাষার অসামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও এই বোধ কবির কণ্ঠেই শুধু সাবলিলÑ ‘যাও বাড়ি ফিরে যাও মায়ের অসুখ হলে কিনে নিও দুঃখের আঙুর’। লোকেরা ক্রমাগত ইচ্ছাকে অবদমন করে করে বস্তুতে ভরে ফেলে চারপাশ, তারা ভাবে বস্তুই মোক্ষ, ভোগই পরম কিন্তু একদল আছে বল্গাহারা, ওরা ইচ্ছার পিঠে চাবুক মেরে চলে, জ্বেলে দেয় বাকিটা আগুন, এমনকি জিভের নিচে চেপে না রেখে উচ্চারণ করে বসে মারাত্মক সত্যটিÑ ‘হঠাৎ কোথায় যদি ছুঁয়ে ফেলি ইচ্ছার উদগম/নিজেকে ফেরাব কেন? আমি যেন ঢেলে দেই অগ্নি/এমন ভেবেছি কত আড়ষ্ট জিভের নিচে বেঁচে/ কেনে যেন এক স্থিতি করতালি শুনে ফিরে যায়’। কবির কাছেই কেবল দূরত্বের সীমানা ঘুচে যায়, অসীমের দিকে চেয়ে সে স্বাভাবিক সীমাকে লঙ্ঘন করতে শিখে- গৃহের মমতা ছেড়ে বেছে নেয় অসীম আলয়Ñ

‘ভেবেছি দিগন্ত বুঝি ঝুলে আছে মাঠের কিনারে/চাইলে বাড়াতে পারি কেউ নেই পেছনে ডাকার/গৃহের মনীষা যত মুছে গেছে ভুলের আঙুলে/এখন হয়তো হবে একে একে ছিড়েছি জঞ্জাল’। একজন কবির সুন্দর এবং অসুন্দরকে একচক্ষে প্রত্যক্ষণের চূড়ান্ত অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। এ বিষয়ে কবি এলিয়টের মন্তব্য হচ্ছে- ‘কবিতার বিষয় খুঁজে পাওয়া যাবে একমাত্র দুর্ভোগের মধ্যেই। কবিকে একই সঙ্গে কদর্যতা ও সৌন্দর্যের অন্তর্নিহিত রূপকে উপলব্ধি করতে হবে।’ যে বিষয়ে সাধারণ দৃষ্টি অক্ষম, সেখানেও কবি সম্পন্ন দৃষ্টি। তাই কবি বোধ করতে পারেনÑ অন্ধ হলেই কেবল দুঃখের প্রবেশ রুদ্ধ হয় নাÑ ‘চোখটা বাঁচিয়ে রেখে শুধু দৃশ্য ঠেলে দেয় চোখে/ওরা ভাবে অন্ধ হলে দুখের চিহ্নও মুছে যায়।’ স্মৃতি দূরে যেতে পারে কিন্তু জাগতিক দৃশ্য ছেড়ে মুছে যায় না নীলসীমা, পাখি ফেরা সন্ধ্যার লাল, তাই নীরব রোমন্থনে বেঁচে যায় বিগত বিকেলগুলোÑ ‘হয়তো খুঁজেও পাবে নীল হয়ে আসা কোন দিনে/স্মৃতির ফেনায় ভেসে আস যদি আমিষের স্বাদে’। ভিখিরীর মতো হাত পেতে নয়Ñ প্রেমিক-পুরুষ জানে প্রতিদান, এই প্রতিদান শুধু মূল্যদানই নয় প্রতিকারও বটেÑ ‘আমাকে গৃহস্থ ভেবে যদি তার আঁচল লুটায়। আমি তার নাভি ছেনে এনে দেই মাটির সুবাস।’ ব্যক্তিগত পরিখা’র কবি ছিঁচকাদুনে নন, তার আছে আত্মবোধ, একান্ত অভীপ্সা এবং বিদ্রƒপ করার সক্ষমতাÑ ‘ফিরিয়ে নিয়েছি মুখ, যতটুকু আলো ও অভীপ্সা/তাকে দেই ছাপচিত্র, অসহ্য রঙিন- আপাতত/ভাঁড়ের পোশাক পরে লাফিয়ে উঠেছি- তুমি নেই/এই বাধ আজ হোক নিগৃহীত, বিদ্রƒপ-ঘুঙুরে।’ স্বল্প সময়ে সম্পন্ন এই কবিতাগুলোকে আপাত বিচ্ছিন্ন মনে হলেও, একই অনুভূতির নানারূপ ঘাত-প্রতিঘাতে গড়া এদের শব্দ-শরীর তাই শেষ অবধি থেকে যায় অপূর্ণতা। উত্তরণপর্বে কবিকে মনে হয়েছে নিমজ্জিত শিলা, আত্মমগ্নতায় সে ঋতুহারা। যেন সে কেবল নিজের কাছে বাধ্য থেকে গেয়ে চলে প্রশান্ত সংগীতÑ ‘নত হয়ে ফের নিজের কাছেই আসা হলো/এখন আমাকে ডেকে তুমি পাবে যে কোনো ঋতুতে’। প্রেমিকের জন্য চিরদিন কোনো না কোনো দুয়ার খোলা থাকে কিন্তু উপযুক্ত শুশ্রƒষা তো আর যত্রতত্র মিলে না তাই গোপনে গোপনে হাহাকার লেগেই থাকেÑ ‘অথচ ঘুমের গর্তে জেগে আছে ক্রোধ ও কামনা/এখন আমাকে বলো চিরায়ত ক্লিনিক কোথায়’। শোকদগ্ধ লোকেরা তলিয়ে যেতে যেতে কেবল পটভূমির স্বরূপটা একবার দেখতে চায়Ñ কতটা নিঠুর স্বভাব, কেমন করাল সেই রূপÑ ‘তুমি অভিজ্ঞান খোলো একবার তোমার স্বরূপে/ ধীরে ধীরে আমি ডুবে যাচ্ছি নৈঃশব্দ্যে তলিয়ে’। প্রতিটি মৃত্যুর মধ্যেই জীবনের সম্ভাবনা নিহিত- এই দার্শনিক সত্য যখন উপলব্ধিকে চরম নাড়া দেয় তখন মুহ্যমান কবিও কিন্তু আবার জেগে ওঠেÑ ‘মরব মরব ভেবে খুঁড়ে চলি নিজের কবর/সেখানে জমেছে দ্যাখো ভাঙা সুর বাঁচার প্রয়াস’। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে লোকে বুঝতে পায়, দেয়াল তো নড়বে না, আর তো পথ নেই খোলা, তখনি বিপন্ন বুক চিরে গান আসে, মরচোপড়া পেরেকের গানÑ ‘তার বুকে গান আছে- হাতুড়ি ঠুকলে তবে বাজে’।

বর্তমানে মর্ডানিটি দেখাতে গিয়ে কথ্য ভাষায় কিছু লোক ‘র’ এবং ‘ড়’ কে ঘুলিয়ে ফেলছে, এ কাব্যর কিছু শব্দে এর প্রতিরূপ লক্ষ করা গেছে অবশ্য শব্দ স্বাধীনতা কবির থাকা চাই। বিনয় মজুমদারের কাব্য-চিন্তা মতো বিষয়কে সাধারণীকরণের দিকে যথেষ্ঠ ঝোঁক লক্ষ্য করা গেলেও গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোর কিছু কবিতা বোধগম্যতার সাধারণ সীমাকে অতিক্রম করেছে। এ কাব্যের কবিতাগুলোতে তিন পর্বে গড়া চরণগুলোর মধ্যে মাত্রাবৃত্তীয় প্রবহমানতা দেখা গেলেও বোধ করি শব্দ বিন্যাসের ক্ষেত্রে কবি সঙ্গতভাবেই মাত্রাগণনার চেয়ে ভাবমুক্তিকে অধিক প্রশ্রয় দিয়েছেন, অবশ্য যে কারণেই হোক কিছু কবিতায় ধ্বনিসাম্য এবং শব্দমিত্রতায় ছেদ পড়েছে। ভাবে, বিষয়ে, উচ্চারণে জাহিদ সোহাগের এ কাব্য প্রেমের; যে প্রেমিক ডুবে আছে নানান প্রশ্নবোধে, যার সাফল্য, বিরহ, ব্যর্থতা সব একাকারÑ ‘ব্যক্তিগত পারিখা’ তারই অর্ঘ্য-আশিস।